
ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় বিদেশে পাঠানোর প্রলোভনে টাকা ও পাসপোর্ট নেয়ার পর ‘নয়ছয়’ করা এক আদম ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগের পর ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মিরপুর বিভাগের সদ্য সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো: মোস্তাক সরকার।
অভিযুক্ত আদম ব্যবসায়ীর সাথে মোবাইফোনে কথা বলে ভুক্তভোগীর পাসপোর্ট ও ৩০ হাজার টাকা দ্রুত ফেরত দেয়ার জন্য তাকে আল্টিমেটাম দেন তিনি।
সম্প্রতি ওই কথোপকথনের একাংশের রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে ওই কথোপকথনের এমন অংশই সামনে আনা হয়েছে, যাতে পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট স্পষ্ট নয় এবং পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। তবে পোস্টটির মন্তব্যের ঘরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে অনেকেই ভুক্তভোগীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে ডিসি মোস্তাক সরকারের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত রাজধানীর পল্লবী থানায় করা একটি লিখিত অভিযোগকে কেন্দ্র করে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) মো: গিয়াস উদ্দিন মোল্লা (৪৭) নামের এক ব্যক্তি মো: সোহেল (৩৫) নামের এক আদম ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অভিযোগটি করেন।
অভিযোগপত্রে গিয়াস উদ্দিন উল্লেখ করেন, পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরে সোহেল তাকে লাওসে ওয়ার্ক ভিসায় পাঠানোর প্রলোভন দেখান। এজন্য সোহেলের অফিস সহকারী ফারহান আহম্মেদের মাধ্যমে তার কাছ থেকে মূল পাসপোর্ট ও ৩০ হাজার টাকা নেয়া হয়। বিদেশে পাঠানোর জন্য তাদের মধ্যে ৪ লাখ ১০ হাজার টাকার মৌখিক চুক্তি হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি।
গিয়াস উদ্দিনের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার (১৪ মে) তাকে ওয়ার্ক ভিসার পরিবর্তে টুরিস্ট ভিসা দেয়া হয়। বিষয়টি জানতে চাইলে সোহেল তাকে ট্যুরিস্ট ভিসায় যাওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। তিনি এতে রাজি না হলে টুরিস্ট ভিসার জরিমানা হিসেবে ১ হাজার ৮০০ ডলার, বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
অভিযোগে ভুক্তভোগী উল্লেখ করেন, বিদেশ যাওয়ার আশায় ওই ব্যক্তির কথায় ভরসা করে তিনি টাকা জোগাড় করতে গিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে তার মূল পাসপোর্টও অভিযুক্তের কাছে রয়ে গেছে। পাসপোর্ট ফেরত চাইলেও তা দেয়া হয়নি। এছাড়া তাকে হয়রানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশ সূত্র জানায়, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় পল্লবী থানার এএসআই ইব্রাহিম খলিলকে। তিনি অভিযুক্ত সোহেলের মোবাইলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তার দেয়া ঠিকানায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
পরে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসিরও অভিযুক্তের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের জানানো হলে ডিসি মো: মোস্তাক সরকার নিজেই সোহেলের সাথে মোবাইলফোনে কথা বলেন।
ওই কথোপকথনে ডিসি মোস্তাক সরকার ভুক্তভোগীর পাসপোর্ট ও ৩০ হাজার টাকা দ্রুত ফেরত দেয়ার জন্য অভিযুক্তকে বলেন। অন্যথায় তার অফিসে তালা দেয়ার কথাও জানান তিনি।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির জানান, পুলিশের এই হস্তক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভুক্তভোগীর অভিযোগের পর আদম ব্যবসায়ীর নিকট তার আটকে থাকা পাসপোর্ট ও টাকা ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করা।
এদিকে সম্প্রতি মোস্তাক সরকার ডিএমপির লালবাগ বিভাগের ডিসি হিসেবে বদলি হওয়ার পর তার সাথে অভিযুক্ত ব্যক্তির সেই মোবাইলফোন কথোপকথনের একটি রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, পুরো কথোপকথনের প্রেক্ষাপট তুলে না ধরে নির্বাচিত অংশ প্রচার করা হয়েছে। তবে ওই পোস্টের মন্তব্যের ঘরে অনেকেই পুলিশের কর্মকর্তার ভূমিকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তাদের বক্তব্য, আদম ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করার পর একজন পুলিশ কর্মকর্তা তার পাসপোর্ট ও টাকা উদ্ধারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন—এতে নেতিবাচক কিছু দেখছেন না তারা। পাশাপাশি ওই আদম ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দাবিও তোলা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ওই রেকর্ডের কমেন্ট বক্সে জিহাদ খান নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, ‘ডিসি তার অবস্থানে শতভাগ সঠিকই রয়েছেন। কথিত টাউট/ব্যবসায়ী সোহেলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়াই শ্রেয়।’
নাজমুল খান নামের আরেকজন লেখেন, ‘ডিসি সাহেব ঠিক করেছেন, দালালকে সায়েস্তা করতে হলে এমন ব্যবহার করতে হয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে।’
মো: ডাব্লিউ নামের একজন লিখেছেন, ‘ভুক্তভোগীর টাকা নিয়েছেন, কাজ করে না দিলে টাকা ফেরত দিবেন না? ডিসি স্যার তো অন্যায় কিছু বলেননি। ভুক্তভোগী থানায় কমপ্লেন করেছে, তার ভিত্তিতে স্যার বলেছেন।’
মো: শামসুদ্দিন সাগর নামের একজন মন্তব্য করেন, বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন ডিসি নিজের জন্য টাকা চাইছেন। তার মতে, একজন ভুক্তভোগীকে সহযোগিতা করতে গিয়ে পুলিশ কীভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, সেটিই ছিল মূল বিষয়।
তিনি আরো বলেন, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট তুলে না ধরে একপাক্ষিক বা বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনা হলে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা ভালো কাজ করতে গিয়ে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
আরিফুল কায়সার নামের একজন লিখেছেন, ডিসি যেটা করেছেন সেটা ১০০% সঠিক কাজ করেছেন। এখানে ট্রাভেল অ্যাজেন্সির পক্ষে যারা রেকর্ড প্রচার করেছে তারা অনৈতিক কাজ করেছেন। এইসব লোকগুলো সহজ সরল মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মাসের পর মাস বছরের পর বছর ঘুরায়।
মনজুর মোরশেদ নামের আরেক ব্যক্তি লিখেছেন, পুলিশ একটুও খারাপ কথা বলে নাই। একদম সরাসরি কথা বলছে। এইসব ব্যবসায়ীদের এভাবে টাইট দিতে হয়। আর সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে পুলিশের যা করণীয় পুলিশ তাই করবে।








