
ইংল্যান্ড হেডিংলিতে শ্রীলঙ্কার কাছে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে হেরে গেছে। ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের সাথে কথা বলছিলেন কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম।
তিনি বলেন, ‘এখন খেলাটা কিছুটা ভিন্ন। বল বড় ভূমিকা রাখছে।’
ম্যাককালাম যে পরিবর্তনের কথা বলেছেন, সেটি হলো রিভার্স সুইং- পুরোনো বল বাতাসে প্রচলিত সুইংয়ের বিপরীত দিকে বাঁক নেয়ার কৌশল।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটের খেলার শর্তে পরিবর্তন আনা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, দুই প্রান্ত থেকে ব্যবহৃত দুটি সাদা বলের মধ্যে কোনটি দিয়ে ইনিংসের বাকি অংশ শেষ করা হবে, তা ৩৪ ওভার শেষে বেছে নিতে পারবেন অধিনায়ক।
এর ফলে নির্বাচিত বলটি আরো পুরোনো ও রুক্ষ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। আর তাতেই রিভার্স সুইংয়ের পুনর্জাগরণ ঘটেছে। এই পরিবর্তন ইতোমধ্যে ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। পরবর্তী বিশ্বকাপের আর এক বছরেরও কম সময় বাকি থাকতে ভবিষ্যৎ ক্রিকেটের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।
কী পরিবর্তন হয়েছে?
গত জুলাইয়ে লর্ডসে ভারতের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতে শেষ দিকে চার উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডকে জিতিয়েছিলেন স্যাম কারান। ইনিংসের শুরুতে যতটা সুইং পেয়েছিলেন, শেষ স্পেলে পুরোনো সাদা বলে তার দ্বিগুণেরও বেশি সুইং পেয়েছেন তিনি।
এর এক বছর আগে কার্ডিফে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডেতে শেষ দিকে সাকিব মাহমুদ ইনিংসের শুরুর তুলনায় অর্ধেকেরও কম সুইং পেয়েছিলেন।
এগুলো ভিন্ন দিন, ভিন্ন খেলোয়াড় ও ভিন্ন পরিস্থিতির দুটি উদাহরণ মাত্র। তবে বিশ্বজুড়েই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
শেষ ১৬ ওভারে একটি বল ব্যবহারের নিয়মটি করা হয়েছিল বোলারদের সহায়তা করার জন্য। পরিসংখ্যান বলছে, পরিবর্তনটি প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে।
নতুন নিয়ম চালুর পর শেষ ১০ ওভারে পেসারদের করা ফুল লেংথের বলের অর্ধেকের ক্ষেত্রেই এক ডিগ্রির বেশি সুইং পাওয়া যাচ্ছে। নিয়ম পরিবর্তনের আগের ১৮ মাসে এই হার ছিল ৩৫ শতাংশ।
এর প্রভাব পড়েছে রান দেয়ার হারেও। নিয়ম পরিবর্তনের আগে শেষ পাঁচ ওভারে পেসারদের ইকোনমি রেট ছিল ওভারপ্রতি ৮.৪০ রান। এখন তা কমে হয়েছে ৭.৯৫। হ্রাসের পরিমাণ খুব বেশি না হলেও তা গুরুত্বপূর্ণ। পেসারদের বোলিং গড়ও প্রতি উইকেটে ১৯.২ রান থেকে কমে ১৮.৩ হয়েছে।
মূল কথা হচ্ছে ইনিংসের শেষ দিকে আগের মতো সহজে বড় শট খেলা যাচ্ছে না।
সবচেয়ে বেশি লাভবান ইংল্যান্ড
রিভার্স সুইং কার্যকর হলে পেসাররা সাধারণত বল আরো ফুল লেংথে করেন এবং ইনসুইংয়ের ব্যবহার বাড়ান। বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
গত মাসে হেডিংলির ওয়ানডেতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই কৌশল বিশেষভাবে কার্যকরভাবে কাজে লাগায় শ্রীলঙ্কা। তাদের বোলারদের করা ৬৯ শতাংশ ডেলিভারি ছিল স্টাম্প থেকে ছয় মিটার দূরত্বের মধ্যে বা তার চেয়ে ফুল লেংথে। এর ফলে ১৬ রানের জয় নিশ্চিত করতে পেরেছিল তারা।
তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিয়ম পরিবর্তন থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ইংল্যান্ড। অবশ্য এ বছর ওয়ানডে ক্রিকেটে দলটি উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। তাই নিয়ম পরিবর্তন না হলেও তাদের পরিসংখ্যান ভালো হতে পারত- এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর ইনিংসের শেষ দিকে ইংল্যান্ডের বোলিং গড় ৩৬.৭৬ থেকে কমে ২০.৯১ হয়েছে। একই সময়ে ইকোনমি রেট ৯.৭৮ থেকে নেমে এসেছে ৭.৫৩-এ।
অন্যদিকে, তাদের ব্যাটিং রান রেট কমেনি; বরং ওভারপ্রতি ৮.০৭ থেকে বেড়ে হয়েছে ৯.১৬।
লিডসে হারের পর ম্যাককালাম খেলোয়াড়দের পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করতে বলেন। নতুন নিয়ম তাদের নিজস্ব পরিকল্পনায় কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা বিবেচনা করার পরামর্শ দেন তিনি। এতে কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।
এর তিন দিন পর দ্য ওভালে শ্রীলঙ্কার পছন্দের বল নির্বাচনের আগের ১০ ওভারে ১০৪ রানে ২ উইকেট থেকে ২১৪ রানে ২ উইকেটে পৌঁছে যায় ইংল্যান্ড।
বিশ্বের অন্য দলগুলোর অবস্থা কী?
নিয়ম পরিবর্তনের পর শেষ ওভারগুলোতে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের রান তোলার গতি কমেছে।
এই সময়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের শেষ দিকের রান রেট ওভারপ্রতি ২.৩৯ রান কমেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বোলারদের মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেসার আলজারি জোসেফ ও দক্ষিণ আফ্রিকার লুঙ্গি এনগিডি শেষ দিকে সুইং পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় উন্নতি করেছেন।
জোসেফের গড় সুইং ৮৪ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে তার বোলিং গড় ২৪.১ থেকে কমে ১৭.৪ হয়েছে।
একইভাবে, এনগিডির সুইং ৬৩.৩ শতাংশ বাড়ার পর তার বোলিং গড় কমে ১৩ হয়েছে। তার ইকোনমি রেটও ৯.৩৪ থেকে নেমে এসেছে ৬-এ।
সুইং পাওয়ার ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে নিউজিল্যান্ডের ন্যাথান স্মিথ, পাকিস্তানের নাসিম শাহ এবং বাংলাদেশের মোস্তাফিজুর রহমানেরও। তবে তাদের ক্ষেত্রে এর ফলাফল এক রকম হয়নি।
এই ত্রিদেশীয় সিরিজে পাকিস্তানের অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদি শেষ ওভারগুলোতে সুইং আদায়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা বোলার। নিয়ম পরিবর্তনের পর তার গড় সুইং ১.৩ ডিগ্রি। তবে পরিবর্তনের আগেও তিনি ভালো সুইং পেতেন, তখন তার গড় ছিল ১.২ ডিগ্রি।
ইংল্যান্ডের বোলারদের মধ্যে শেষ দিকে সবচেয়ে বেশি সুইং পাচ্ছেন জোফরা আর্চার। তার গড় সুইং ০.৯৭ ডিগ্রি, যা আগের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি।
বিশ্বকাপে কী প্রভাব পড়তে পারে
বিশ্বের সব জায়গায় এখনো ওয়ানডে ক্রিকেটে রিভার্স সুইংয়ের প্রভাব সমানভাবে পড়েনি।
এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে ইংল্যান্ডে। সেখানে ইনিংসের শেষ দিকে বলের সুইং ৬৩ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশে এই বৃদ্ধি ৩৩ শতাংশ। আগামী দুই সপ্তাহে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচগুলোতেও আগের তুলনায় শেষ দিকে বলের মুভমেন্ট উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে।
তবে ইংল্যান্ডের পরবর্তী সফর অস্ট্রেলিয়ায় এই বৃদ্ধি তুলনামূলক কম। আগামী বছরের বিশ্বকাপের বেশির ভাগ ম্যাচ দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, সেখানেও সুইং বৃদ্ধির প্রভাব কম।
নিয়ম পরিবর্তনের পর দক্ষিণ আফ্রিকায় মাত্র তিনটি ওয়ানডে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাই আগামী শরতে সেখানে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা এখনই অনুমান করা কঠিন।
নতুন নিয়মের প্রভাব সেখানে খুব বেশি না পড়লেও ইনিংসের শেষ দিকে বলের গতিপথের দিক থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়ানডে ম্যাচগুলো আগে থেকেই বিশ্বের তুলনামূলক এগিয়ে থাকা ম্যাচগুলোর মধ্যে রয়েছে। একইসাথে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে দলগুলো ওভারপ্রতি ৭.৩৫ রান করে তুলেছে, যা তুলনামূলকভাবে বেশি। সেখানে রিভার্স সুইং হঠাৎ বেড়ে গেলে দলগুলোকে আগের তুলনায় ইনিংসের শুরুতেই বেশি রান তুলতে হতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








