
দুই দিনের বিরতির পর রোববার (৮ নভেম্বর) দুপুরে গাজীপুরের কয়েকটি শিল্পকারখানায় বিচ্ছিন্ন শ্রমিক অসন্তোষ ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটলেও সামগ্রিকভাবে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকরা যথারীতি কাজে যোগ দিয়েছেন এবং উৎপাদন কার্যক্রম চলেছে স্বাভাবিক নিয়মে।
তবে পোশাক কারখানার পাশাপাশি জুতার কারখানার শ্রমিকরাও বেতন বৃদ্ধি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দাবিতে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করেন। কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের একটি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
এছাড়া কালিয়াকৈরে এপেক্স ফুটওয়্যারে সাধারণ ছুটি, একই গ্রুপের জেনিথ ফুটওয়্যারে কর্মবিরতি ও কাশিমপুরের ১২টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার সকালে গাজীপুরের অধিকাংশ শিল্পকারখানায় শ্রমিকরা নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দেন। টঙ্গী, বোর্ডবাজার, সাইনবোর্ড, ভোগড়া বাইপাস, চান্দনা চৌরাস্তা, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, মৌচাক, সফিপুর, পল্লী বিদ্যুৎ, মাওনা ও জৈনাবাজারসহ শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকার বেশির ভাগ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। তবে দুপুরের পর কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় মন্ডল গ্রুপের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, দুপুর ৩টার দিকে মন্ডল গ্রুপের কিছু শ্রমিক ইসলাম গ্রুপের স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের জরুন এলাকার একটি কারখানায় গিয়ে সেখানকার শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যোগ দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। এ সময় ওই কারখানার শ্রমিকরা বের হতে না চাইলে, বরং প্রতিবাদ জানালে সেখানে উভয় কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পরে একদল শ্রমিক কারখানাটিতে ভাঙচুর চালান এবং একপর্যায়ে কর্তৃপক্ষের কয়েকজনকে অবরুদ্ধ করে রাখেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে কারখানাটিতে দুই ঘণ্টার জন্য ছুটি ঘোষণা করা হয়।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো: আশিক সাঈদ জানান, রোববার দুপুর ৩টার দিকে জরুন এলাকায় মন্ডল গ্রুপের শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ করেন। এ সময় তারা স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের শ্রমিকদেরও কারখানা থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে কারখানাটিতে দুই ঘণ্টার ছুটি ঘোষণা করা হয়। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। অন্য কারখানায়ও এর প্রভাব পড়েনি।
পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী নাশকতার চেষ্টা করেছিল।
এদিকে কাশিমপুর থানাধীন নয়াপাড়া ও জিতার মোড় এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কায় ১২টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। বন্ধ ঘোষিত কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে— কটন ক্লাব বিডি লিমিটেডের ইউনিট-১ ও ইউনিট-২, এমা সিনটেক্স লিমিটেড, তাসনিয়া ফেব্রিক্স লিমিটেড, মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেড, মুনটেক্স ফেব্রিক্স লিমিটেড, কাইজার নিট ওয়্যার লিমিটেড, আলীম নিট বিডি লিমিটেড, এলিয়েন্ট টেক্স লিমিটেড, মাইমুন কমপ্লেক্স, ইসলাম নিট ওয়্যার লিমিটেড ও ডেলটা নিট কম্পোজিট লিমিটেড। এর মধ্যে কটন ক্লাব বিডি ও আলীম নিট বিডি মন্ডল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে কালিয়াকৈর উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় বেতন বৃদ্ধি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দাবিতে এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের শ্রমিকরা দুপুরের দিকে কাজ বন্ধ করে কারখানার ভেতরে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় কর্তৃপক্ষ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। পরে শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কারখানা ত্যাগ করেন।
এপেক্সে ছুটি ঘোষণার পর একই গ্রুপের ভান্নারা-মৌচাক এলাকার জেনিথ ফুটওয়্যার লিমিটেডের শ্রমিকরাও কর্মবিরতি শুরু করেন। তাদের একাংশ কারখানা থেকে বের হয়ে ভান্নারা-মৌচাক বাজার এলাকায় জড়ো হন। শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধিসহ ১৪ দফা দাবি জানিয়েছেন।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধান, শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার জবাব ও বিচার, শ্রমিকদের মারধর বা নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত হারুন ও মহিবুল্লাহর বিচার এবং তাদের কারখানায় দায়িত্বে না রাখা, কোনো শ্রমিককে ছাঁটাই না করা, কারখানার চিকিৎসাকেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা, এক সপ্তাহের মধ্যে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণকাজ শুরু করা।
এছাড়া ছুটির টাকা পূর্ণ পরিশোধ, ছুটি নিলে হাজিরা বোনাস না কাটা, সুপারভাইজার ও কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহার বন্ধ, হাজিরা বোনাস এক হাজার টাকা ও টিফিন বিল ৪০ টাকা করার দাবিও জানিয়েছেন শ্রমিকরা।
তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের কিছু কর্মকর্তার আচরণ সন্তোষজনক নয়। এসব দাবির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন বন্ধ রাখার কথাও জানিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে এপেক্স ও জেনিথ ফুটওয়্যার কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এছাড়া চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় বেতন বৃদ্ধির দাবিতে একটি কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করলে কর্তৃপক্ষ রোববারের জন্য ছুটি ঘোষণা করে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কয়েকটি কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করেছে। কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ও জরুনসহ বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী কারখানার মজুরি কাঠামো বিজিএমইএ-এর আওতাধীন পোশাক কারখানার মজুরি কাঠামোর সাথে এক নয়। এপেক্স ও জেনিথ ফুটওয়্যারের শ্রমিকরা আগে থেকেই বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন।
গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) মো: আরিফ হোসাইন জানান, শ্রমিক বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, দুপুরের পর কয়েকটি এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ ও কর্মবিরতির ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
উল্লেখ্য, ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মালিক-শ্রমিকের সম্মতির ঘোষণার পর শ্রমিকরা কাজে ফিরলে শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসতে শুরু করে।
রোববার কয়েকটি কারখানায় নতুন করে বিক্ষোভ ও কর্মবিরতির ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন অব্যাহত ছিল। শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া আলোচনার মাধ্যমে সমাধান ও মালিক-শ্রমিকের সহযোগিতা বজায় থাকলে শিল্পাঞ্চলের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও উৎপাদনের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








