
দুই পা অচল, দুই হাতেও পান না পর্যাপ্ত জোর। হুইল চেয়ারই একমাত্র ভরসা। ডানা ভাঙা পাখির মতো সৈয়দ কাঞ্চনের এই জীবনসংগ্রামে পরম আস্থার প্রতীক হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন স্ত্রী আসমা বেগম। দু’জনে মিলে একটু একটু করে স্বপ্ন বুনেছিলেন ছোট একটি মুদি দোকানে। কিন্তু ২০২৩ সালের এক রাতের আগুন নিমিষেই পুড়িয়ে ছাই করে দেয় তাদের জীবনের শেষ অবলম্বন। সবকিছু হারিয়ে যখন চারদিকের অন্ধকার নেমে এসেছিল, তখনও দুই নাবালিকা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাল ছাড়েননি এই বাবা।
স্ত্রীর সহযোগিতায় বাড়িতে বসে উপকরণ নিয়ে হুইল চেয়ারে করে প্রতিদিন বিকেলে বের হন কাঞ্চন। মাদারীপুরের ডাসার সরকারি মহিলা কলেজের পাশে ছোট এক টুকরো জায়গায় জ্বলছে কাঞ্চনের চুলো। দোকান খুলেই স্ত্রী নিজের হাতে তৈরি করেন সিঙ্গাড়া আর পুরি। ফুটন্ত তেলের চেয়েও যেন বেশি পুড়ছে তার জীবন। ১২ আর আট বছর বয়সী দুই মেয়ে মাদরাসায় পড়ে। তাদের খাতা-কলম কেনার খরচ আর প্রতিদিনের চাল-ডাল জোগাতে কাঞ্চনের এই নীরব কান্না আর রক্ত জল করা খাটুনি দেখলে চোখে জল আসে স্থানীয়দেরও।
জানা যায়, ছোটবেলায় টাইফয়েড জ্বর হলে পরিবার থেকে করাতে পারেনি পর্যাপ্ত চিকিৎসা। এরপর পরই চার হাত-পা অকেজো হয়ে প্রতিবন্ধী কাঞ্চনের। এক আত্মীয়ের মাধ্যমে কাঞ্চনের সাথে পরিচয় আসমার। জীবনের প্রতিকূলতা আর শারিরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আসমাকে পাশে পেয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন কাঞ্চন। ভালোবাসা আর নির্ভরতার সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখে ২০১০ সালে বিয়ে হলেও স্বামীর প্রতি ভালবাসায় তাকে ছেড়ে যাননি আসমা।
সংসারজীবনের নানা প্রতিকূলত পেরিয়ে আজও তিনি চান, স্বামীর সাথে বাকি জীবনটা কাটাতে। ডাসার উপজেলার বেতবাড়ি গ্রামের সৈয়দ সোহবার হোসের ছেলে কাঞ্চন। পরিবারে স্ত্রীর পাশাপাশি মা ও দুই মেয়ে রয়েছে বলেও জানা গেছে।
স্থানীয়রা জানায়, ‘কাঞ্চন অসহায় হলেও ভিক্ষাবৃত্তি করেননি। তার পাশে সরকার দাঁড়ালে জীবনে একটু পরিবর্তণ আসতো। এক্ষেত্রে একটি আধুনিক হুইল চেয়ার ও ঋণ একান্তই প্রয়োজন।’
সৈয়দ কাঞ্চন বলেন, ‘মানুষ জন্ম নিলে একদিন মরবেই, কিন্তু যতদিন বেঁচে আছি মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই। আমার দুইটা পা অচল, আমি হাঁটতে পারি না। কিন্তু আল্লাহ তো আমাকে একটা সুস্থ বিবেক আর দুইটা হাত দিয়েছেন। সেই হাতও প্রায় অচল। সেই বিবেক থাকতে আমি মানুষের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করতে পারব না। ভিক্ষা করলে হয়তো সহজে টাকা পাওয়া যায়, কিন্তু নিজের আত্মসম্মানটা ধুলোয় মিশে যায়।’
তিনি বলেন, ‘আমার একমাত্র আয়ের পথ ছিল ওই ছোট্ট মুদি দোকানটা। কিন্তু আগুনে পুড়ে আমার শেষ সম্বলটুকু যখন ছাই হয়ে গেল, আমি পুরো দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। তবে আমি হাল ছাড়িনি। আমি কারও করুণা চাই না, শুধু একটু সুযোগ চাই যেন নিজের পরিশ্রম দিয়ে আমার পরিবার আর দুই মেয়ের মুখে দুবেলা অন্ন তুলে দিতে পারি।’
সৈয়দ কাঞ্চনের স্ত্রী আসমা বেগম বলেন, ‘বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছি তিনি কতটা কষ্ট করেন। শরীরটা অচল হলেও ওনার মনের জোর আমাদের সবার চেয়ে বেশি। সরকারীভাবে একটু সহযোগিতা পেলে ঘুরে দাঁড়াতে পারব।’
মাদারীপুর জেলার সহকারি সমাজসেবা কর্মকর্তা আফজাল হোসাইন জানান, এরইমধ্যে অসহায় এই কাঞ্চনকে ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। তাকে সাবলম্বী করতে পাশে থাকা হবে। প্রয়োজনে তাকে ক্ষুদ্র ঋণও দেয়া হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








