কর্মসংস্থান তৈরি ও কারখানা সচলে বিশেষ প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে হবে
মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন গভর্নর মো: মোস্তাকুর রহমান। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো: মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, ‘দেশে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, বন্ধ কলকারখানা পুনরুজ্জীবিত করা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন প্যাকেজে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ প্যাকেজের সুবিধা যেন প্রকৃত উদ্যোক্তারা দ্রুত পান, তা নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।’

Advertisement

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংক সিলেট অফিসের সম্মেলন কক্ষে অংশীজনদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

এ বৃহৎ প্যাকেজের ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে এবং বাকি ৪১ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে দেয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

Advertisement

সভায় সিলেটের স্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকসমুহের আঞ্চলিক প্রধান, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃবৃন্দ, নারী উদ্যোক্তা এবং কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে গভর্নর এ অর্থায়ন প্যাকেজের মাঠপর্যায়ের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

সভায় গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে ব্যাংক ঋণের ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সাধারণ সুদের হার ব্যবসা পরিচালনার জন্য একটি বড় চাপ। এই চাপ থেকে উদ্যোক্তাদের স্বস্তি দিতে এবং থমকে যাওয়া শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে ৪ থেকে ৮ শতাংশের মতো বিশেষ কম সুদে এই প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ সরবরাহ করা হচ্ছে।’

সিলেট অঞ্চলের বন্ধ থাকা উৎপাদনমুখী শিল্প ও সেবা খাতকে পুনরায় সচল করার ওপর জোর দিয়ে গভর্নর বলেন, এ প্যাকেজের সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ ২০ হাজার কোটি টাকা বন্ধ শিল্প পুনর্গঠনে ব্যয় করা হবে।

এছাড়া, কৃষি ও পল্লী অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং বেকার যুবকদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তরুণদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, ‘বেকার যুবসমাজকে দেশের মূল অর্থনৈতিক ধারায় যুক্ত করতে চলতি মাস (নভেম্বর) থেকেই ‘উদ্যোগ’ নামের একটি প্রকল্প শুরু হয়েছে। এর আওতায় দেশের প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে মোট পাঁচ হাজার তরুণকে বাছাই করে নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হবে।’

এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক বা আমলাতান্ত্রিক কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারিদের ঋণ প্রাপ্তি সহজ করার বিষয়ে গভর্নর জানান, ১০ হাজার কোটি কোটি টাকার কৃষি পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় কৃষকরা এখন প্রথাগত জমির পরিবর্তে বিকল্প জামানত ব্যবহার করে সহজেই ঋণ সুবিধা পাবেন।

তবে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে গভর্নর বলেন, ‘প্রকৃত ও যোগ্য উদ্যোক্তাদের ঋণ নিশ্চিত করা হবে। চলতি বছরের মধ্যে সুযোগ পাওয়ার পরও যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করবে না, আগামী বছর থেকে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 এই প্যাকেজটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশে ২৫ লাখের বেশি মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিলেট অফিসের নির্বাহী পরিচালক খালেদ আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার শুরুতে প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন প্রধান কার্যালয়ের ব্যাংকিং রেগুলেশন পলিসি ডিপার্টমেন্টের অতিরিক্ত পরিচালক সালাউদ্দিন তাপাদার। 

আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক নওশাদ মোস্তাফা ও আব্দুস সালাম মাহমুদ, সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস উন নূর, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সাবেত নাঈম চৌধুরী, সানজিদা খাতুন, হিজকিল গুলজার, ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ, আলিমুল এহসান চৌধুরী, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহবুব উল হাকিম, প্রফেসর ড. শহিদুল হক, নারী উদ্যোক্তা অনিতা দাশ গুপ্তা।

অংশীজনরা, সিলেট অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন সমস্যা ও ঋণ প্রাপ্তির জটিলতা গভর্নরের সামনে তুলে ধরেন এবং গভর্নর তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সেসব সমস্যা সমাধানের তাগিদ দেন। 

গভর্নর নগদ লেনদেনের পরিবর্তে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে বিনা খরচে ক্যাশলেস ব্যাংকিং করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান। 

গভর্নর বলেন, বিগত সময়ে ব্যাংকিং সেক্টরে যে লুটপাট হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে আট বছর সময় লাগতে পারে। তিনি ব্যাংকার কাস্টমার সম্পর্কের ভিত্তিতে ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে ওয়ান টাইম এক্সিট সুবিধা গ্রহণ করতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানান। 

তিনি করপোরেট ঋণ কমিয়ে বেশি করে রিটেইল, এসএমই, কৃষি ঋণ বিতরণ করতে ব্যাংকারদের আহ্বান জানান।