
দীর্ঘদিন বিলুপ্ত থাকার পর দেশে নীলগাই সংরক্ষণ ও বংশবিস্তারের উদ্যোগে নতুন আশার খবর এসেছে গাজীপুরের সাফারি পার্ক থেকে। পার্কের কোর সাফারিতে নীলগাইয়ের পরিবারে যুক্ত হয়েছে নতুন চার শাবক। ঠিক কবে তাদের জন্ম হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে পারেনি পার্ক কর্তৃপক্ষ। তবে কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রায় এক মাস আগে শাবকগুলোর জন্ম হয়েছে। বেশির ভাগ সময় বনের ভেতরে অবস্থান করায় তাদের নিয়মিত দেখা যায় না। সম্প্রতি মা নীলগাইয়ের সাথে চার শাবককে বনের একপাশে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। নতুন চার সদস্য যুক্ত হওয়ায় পার্কে নীলগাইয়ের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩।
পার্ক প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কোর সাফারির হরিণ সাফারি এলাকায় নীলগাইয়ের বিচরণস্থলে শাবক চারটির দেখা মিলেছে। দিনের বেশির ভাগ সময় তারা মায়ের কাছাকাছি থাকে। মায়ের দুধ পান করার পাশাপাশি বনের বিভিন্ন অংশে ঘুরে বেড়ায়। কখনো ছোটাছুটি ও খেলাধুলায় মেতে ওঠে। তবে শাবকদের নিরাপত্তার বিষয়ে মা নীলগাই বেশ সতর্ক। মানুষের উপস্থিতি কিংবা অপরিচিত কোনো শব্দ টের পেলেই শাবকদের নিয়ে দ্রুত বনের গভীরে চলে যায়।
সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) তারেক রহমান বলেন, ‘চারটি শাবকের ঠিক কবে জন্ম হয়েছে, তা তাদের জানা নেই। তবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় এক মাস আগে শাবকগুলোর জন্ম হয়েছে। নীলগাই সাধারণত বনের ভেতরেই থাকে, বাইরে খুব কম আসে। মাঝে মধ্যে তাদের দেখা গেলেও সম্প্রতি চার শাবক নিয়ে মা নীলগাইকে বনের একপাশে পায়চারি করতে দেখা যায়। এরপর থেকেই শাবকগুলোর প্রতি বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘শাবকগুলোর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হরিণ সাফারি এলাকায় সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য একজন কর্মীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বর্তমানে চারটি শাবকই সুস্থ রয়েছে। বয়স কম হওয়ায় এখনো তাদের লিঙ্গ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কাছাকাছি গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করা হচ্ছে না।’
পার্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, চার শাবককে একসাথে ঘুরে বেড়াতে ও খেলাধুলা করতে দেখে দর্শনার্থীদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোররা নতুন অতিথিদের দেখে আনন্দ পাচ্ছে। শাবকগুলোর স্বাভাবিক চলাফেরা ও বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে পার্কের কর্মীরা দূর থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন।
ঢাকা অঞ্চলের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী জানান, নতুন চার শাবকের জন্মের বিষয়টি জানার পর পার্ক কর্তৃপক্ষকে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। শাবকগুলোর সুরক্ষা, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখতে বলা হয়েছে।
পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক জানান, বিভিন্ন সময়ে দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে উদ্ধার করা নীলগাই গাজীপুর সাফারি পার্কে আনা হয়েছে। পরে পার্কেই কয়েকটি শাবকের জন্ম হয়। সর্বশেষ চারটি শাবক জন্ম নেয়ার আগে পার্কে নীলগাই ছিল ১১টি। এর মধ্যে দুটি কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে স্থানান্তর করা হয়েছে। নতুন চার শাবক যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে গাজীপুর সাফারি পার্কে নীলগাইয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩টিতে।
উল্লেখ্য, একসময় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নওগাঁ ও জয়পুরহাটের সমতল ভূমি ও ঝোপঝাড়পূর্ণ এলাকায় প্রচুর নীলগাই বিচরণ করত। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক দশক আগে প্রাণীটি বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে কয়েকটি নীলগাই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রবেশ করলে বন বিভাগ সেগুলো উদ্ধার করে। পরে উদ্ধার করা প্রাণীগুলোর মাধ্যমে দিনাজপুরের রামসাগর জাতীয় উদ্যানসহ বিভিন্ন সংরক্ষিত এলাকায় নীলগাই সংরক্ষণ ও বংশবিস্তারের উদ্যোগ নেয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গাজীপুর সাফারি পার্কেও প্রাণীটি সংরক্ষণের কার্যক্রম শুরু হয়।
নীলগাই এশিয়ার বৃহত্তম অ্যান্টিলোপ বা হরিণজাতীয় বন্যপ্রাণী। হিন্দি ‘নীল’ ও ‘গাই’ (গাভী) শব্দ থেকে প্রাণীটির নামকরণ হয়েছে। পূর্ণবয়স্ক পুরুষ নীলগাইয়ের শরীরের রং কালচে নীলচে-ধূসর হওয়ায় এর নাম হয়েছে নীলগাই।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








