শ্রমিক বিক্ষোভ
বিএনপির মিছিল। নয়া দিগন্ত

পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে চলমান আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিকে পুঁজি করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নাশকতা ও সহিংসতা সৃষ্টি করে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

Advertisement

সোমবার (২ নভেম্বর) ভোরে টঙ্গীর স্টেশন রোড এলাকায় অবস্থান কর্মসূচী ও বিক্ষোভ মিছিল করেন স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরে সেখান থেকে বের হওয়া মিছিলটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট প্রদক্ষিণ করে। এ সময় শিল্পাঞ্চলে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং যেকোনো ধরনের নাশকতা প্রতিরোধে সতর্ক অবস্থানে থাকার ঘোষণা দেন তারা।

এ পরিস্থিতিতে শিল্পাঞ্চলে নাশকতা প্রতিরোধ ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিএনপিসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি মাঠে নামতে শুরু করেছে। এতে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ক্রমেই রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে।

মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বিএনপি নেতা সরকার শাহনূর ইসলাম রনি বলেন, ‘শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন ও দাবিদাওয়ার প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে। তবে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে কেউ নাশকতা বা সহিংসতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে যেকোনো মূল্যে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।’

কর্মসূচীতে উপস্থিত ছিলেন যুবদল নেতা রেজাউল করিম সেন্টু, তারেক জিয়া পরিষদের সদস্য সচিব বীর রহমান, তাঁতীদল নেতা রনি দে, সাদি আব্দুল্লাহ, আশরাফুল আলম সানি, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ফারুক মৃধাসহ স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

অপরদিকে বাসন থানা বিএনপির সভাপতি তানভীর সিরাজের নেতৃত্বে মহানগরীর ভোগড়া বাইপাসসহ ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আওয়ামী নাশকতাবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। 

এদিকে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী শ্রমিকদের সাথে মিশে আন্দোলনকে উসকে দেয়ার চেষ্টা করছেন। 

বিভিন্ন ভুয়া ও বেনামি ফেসবুক আইডি থেকে উসকানিমূলক পোস্ট ছড়িয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার অভিযোগও উঠেছে। গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির মোড়লের নামেও উসকানিমূলক স্ট্যাটাস দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। 

গত রোববার গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শতাধিক কারখানা ছুটি ঘোষণা করে। চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় দীপ্ত টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলমের ওপর হামলা চালিয়ে ক্যামেরাসহ ব্যাগে থাকা মালামাল ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠে। 

একই দিন সংঘর্ষে পুলিশের আট থেকে ১০ জন সদস্য আহত হন বলে জানান শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার। কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে পুলিশের বক্সে আগুন দেয়া এবং আনসার অ্যাকাডেমির সামনে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।

এদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিকে সমর্থন জানিয়ে আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি মো: সালাহ উদ্দিন সরকার। 

তিনি বলেন, ‘পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি যৌক্তিক। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান করতে হবে। তবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে পুঁজি করে কোনো মহল যেন শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, কারখানা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও দাবি আদায়ের অধিকার রয়েছে; একই সাথে শিল্পকারখানা, কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে সহিংসতা পরিহার করতে হবে। শ্রমিকদের বিভ্রান্ত না হয়ে সতর্ক থাকার এবং কোনো উসকানিতে পা না দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

শ্রমিকদের দাবি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও ওভারটাইমের সুযোগ কমে যাওয়ায় বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে তারা আন্দোলন করছেন। সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিলেও আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। শ্রমিকদের এই ন্যায্য দাবির সাথে রাজনৈতিক কর্মসূচী ও নাশকতার অভিযোগ মিশে যাওয়ায় শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।