বিজিবি, দুর্গাপূজা
বিজিবি মোতায়েন। নয়া দিগন্ত

রংপুরে একটি অস্থায়ী মন্দির দখল নিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুইপক্ষের মধ্যে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও হাতাহাতির ঘটনায় তুমুল উত্তেজনার ঘটনায় বিজিবি মোতায়েন করেছে জেলা প্রশাসন। জমির মালিক দাবিদার পক্ষের অভিযোগ, জেলা কৃষকলীগ সভাপতি প্রাণকৃষ্ণ গোস্বামী প্রান্নু মন্দিরের নামে জায়গাটি দখলের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে কমিটির অভিযোগ জায়গাটি বিক্রির জন্য বায়না হলেও রেজিস্ট্রি না হওয়ায় মালিকপক্ষ দখলে রাখার চেষ্টা করছে।

Advertisement

লগ্ন চলেও গেলেও বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুর সোয়া ১টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মন্দিরটির দুর্গার প্রতিমা বিসর্জন হয়নি। পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিমা বিসর্জনের নির্দেশ দেয়া হলেও মানছে না কমিটি। ফলে ওই এলাকায় ব্যপক উত্তেজনা চলছে।

এর আগে, সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে মন্দিরটি প্রতিমাসহ পাহাড়া দিচ্ছে বিজিবি। তাদের সাথে আছে পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা। 

ঘটনাস্থলে বিজিবির ৫১ এর পাহারায় থাকা প্লাটুন কমান্ডার নায়েক সুবেদার রিয়াজুল ইসলাম জানান, রাতে তিন প্লাটুন (৬০ জন) ঘটনাস্থল রেকে করে ছিলাম। সকাল থেকে এক প্লাটুন (২০ জন) মোতায়েন আছে। বর্তমানে কোনো উত্তেজনা নেই।   

এর আগে, বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যা থেকে নগরীর ঠিকাদারপাড়া অস্থায়ী মন্দির এলাকায় এই উত্তেজনা চলছে। নগরীর সবগুলো মন্দির থেকে প্রতিমা মুলাটোল পুকুরে বিসর্জন দেয়া হলেও এ মন্দিরটি থেকে প্রতিমা বিসর্জনের জন্য নেয়া হয়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যায় ওই মন্দির কমিটি বিসর্জনের জন্য প্রতিমা না সরিয়ে সেখানে কালিমন্দির স্থাপন করতে গেলে তাতে বাঁধা দেয় জমির মালিক দাবিদার রীতা রানী রায়ের পক্ষের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে জেলা কৃষকলীগ সভাপতি প্রাণকৃষ্ণ গোস্বামী প্রান্নুর নেতৃত্বাধীন মন্দির কমিটি সমর্থিত হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। অন্যদিকে মন্দির এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে অপরপক্ষ। পরে সেখানে ছুটে যান পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ডা: নিখিলেন্দু গুহের নেতৃত্বে হিন্দু নেতারা। আগেই সেখানে উপস্থিত হয় মহানগর পুলিশ। মন্দির কমিটি কালিমন্দির স্থাপন না করে দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের জন্য নেয়া থেকে বিরত থাকে। অপরদিকে জমির মালিক দাবিদার পক্ষ কোনোভাবেই সেখানে কালি প্রতিমা স্থাপন করতে না দেয়ার দাবিতে অনড় থাকে। ফলে সেখানে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। রাত ১১টা ২০ মিনিটে সেখানে বিপুল পরিমান বিজিবি মোতায়েন করে জেলা প্রশাসন। বিজিবি এখন মন্দিরটির আশেপাশ ঘিরে রেখেছে। অন্যদিকে দুই পক্ষই দুই দিকে অবস্থান নেয়। রাতে আবারো দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উভয়পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। পরে সেখানে এসআরবি সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়। 

জমির মালিক রীতা রানী রায়ের অভিযোগ, ‘ঠিকাদার পাড়ার ঘটনাস্থলে তাদের পারিবারিক নিজ জমিতে থাকা স্বামীর নামের দশরথ গ্যারেজে প্রতিবছর পূজার সময় গ্যারেজ সরিয়ে অস্থায়ীভাবে এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য দুর্গাপূজার আয়োজন করে এবং পূজার পর তা সরিয়ে নিয়ে আবার গ্যারেজ চালু করে। আওয়ামী লীগ আমলে অস্থায়ী ওই মন্দির কমিটির সভাপতি ও জেলা কৃষকলীগ সভাপতি প্রাণকৃষ্ণ গোস্বামী জমিটি মন্দিরের নামে আমার স্বামী দশরথ রাউতের কাছ থেকে একটি ফাঁকা স্ট্যাম্পে সই নিয়ে সেটি দিয়ে দখল করার চেষ্টা করতে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেটা না পেয়ে আবারো এই সরকারের আমলে সেটা করছে। বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ আমলে অনেক জুলুম নির্যাতন করেছে। এখনো অত্যাচার করছে।’  

অন্যদিকে মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমল গোস্বামীর দাবি, ওইখানে দীর্ঘ ৩৭ বছর থেকে অস্থায়ীভাবে পূজা হতো। পরবর্তীতে জমির মালিক মন্দিরের সভাপতি জেলা কৃষকলীগ সভাপতি প্রাণকৃষ্ণ গোস্বামীর নামে বিক্রির জন্য বায়না করেন। তিনি জমিটি কিনে মন্দিরের নামে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তারা রেজিস্ট্রি দিচ্ছিল না। আমরা আদালতের অনুমতি নিয়ে এবারো পূজা করছি। আমরা কালির মূর্তি বসাতে গেলে বাধা পাওয়ায় অবরোধ করতে বাধ্য হয়েছে। সমাধান না হওয়া পর্যন্ত প্রতিমা বিসর্জন দিবো না। 

এদিকে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ ও পুলিশ মন্দির কমিটিকে দ্রুত প্রতিমা বিসর্জন দেয়ার নির্দেশ দিলেও মানছে না কমিটি। উল্টো মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক মহানগর অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার তোফায়েল আহমেদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং বলেন কোনোভাবেই কালিমূর্তি না বসানো পর্যন্ত প্রতিমা বিসর্জন দিবো না। 

জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি ডা. নিখিলেন্দু গুহ জানান, ‘আমরা আদালতের আদেশ অনুযায়ী দুর্গা মন্দিরটি বিসর্জনের জন্য কমিটিকে বলেছি। কিন্তু তারা সেটা করছে না। এদিকে লগ্ন চলে যাচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি, বিষয়টি সমাধানের জন্য। ‘

এ ব্যাপারে মহানগর অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘এই মন্দিরটি অস্থায়ী। মন্দির কমিটি জমির আইনত মালিক নন। এ বিষয়ে আদালতে মামলা আছে। তারপরেও আদালত পূজা করার পর প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে জায়গা ছেড়ে দেয়ার নির্দেশনা দেয়। বিষয়টি নিযে কমিশনার অফিসে রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে বৈঠক হয়েছে কমিটির সাথে। কিন্তু তারা প্রতিমা বিসর্জন না দিয়ে সেখানে স্থায়ীভাবে মন্দির স্থাপনের দাবিতে বিক্ষোভ অবরোধ এবং দফায় দফায় উস্কানীমূলক কর্মকাণ্ড করছে। আমরা সজাগ আছি। বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।’

বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেখানে বিপুল পরিমান বিজিবি, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন মোতায়েন ছিল। এছাড়াও দুর্গা প্রতিমাটি অস্থায়ী মন্দিরেই স্থাপিত আছে। বিসর্জনের জন্য নেয়া হয়নি। মূতির পেছনেই কালিমূর্তিসহ বিভিন্ন মূর্তি রাখাও আছে।