
কৃষি খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গতিশীলতা আনতে সাফল্যের পথে এগিয়ে যাচ্ছে জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা। উপজেলা প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতা এবং উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে তৈরি ফার্টিলাইজার ডিস্ট্রিবিউশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডিএমএস) ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ইতিমধ্যে সার বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর এ উদ্যোগের সুফল বিবেচনায় নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেওয়ানগঞ্জ উপজেলাও ওয়েবসাইটটি সংগ্রহ করে কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহার করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এফডিএমএস ওয়েবসাইট চালুর ফলে সার বিতরণ, মজুত ও সরবরাহ-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ে সার বিতরণ কার্যক্রম তদারকি, মজুতের হিসাব রাখা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত যাচাই করার প্রক্রিয়া আরো সহজ ও সুশৃঙ্খল হচ্ছে।
জানা গেছে, বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুরাদ হোসেনের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আমিনুল ইসলামের পরিকল্পনা ও অর্থায়নে ওয়েবসাইটটি তৈরি করা হয়। এর ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টের দায়িত্ব পালন করেন বকশীগঞ্জের তরুণ এইচএসসি পড়ুয়া হৃদয় হাসান রাফি।
কৃষকদের কাছে সঠিক সময়ে সার পৌঁছে দেওয়া এবং সার বিতরণ কার্যক্রমে শৃঙ্খলা বজায় রাখা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার সার ব্যবস্থাপনার তথ্য সংরক্ষণ, সরবরাহের হিসাব রাখা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
বকশীগঞ্জে চালু হওয়া এফডিএমএস ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সার বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় প্রচলিত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে সার বিতরণ-সংক্রান্ত তথ্য আরো সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। একই সাথে সার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বকশীগঞ্জে তৈরি এফডিএমএস ওয়েবসাইটের ব্যবহার শুধু একটি উপজেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পার্শ্ববর্তী দেওয়ানগঞ্জ উপজেলাও ওয়েবসাইটটি সংগ্রহ করে কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহার করছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি একটি প্রযুক্তিগত উদ্যোগ অন্য উপজেলাতেও কাজে লাগার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি সেবা ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় পর্যায়ে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির এমন ব্যবহার প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরো আধুনিক করার পাশাপাশি অন্যান্য উপজেলাকেও ডিজিটাল পদ্ধতি গ্রহণে উৎসাহিত করতে পারে। তবে এ উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ, কার্যকর তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাযথ ব্যবহারের ওপর।
কৃষক শরিফ বলেন, ‘আগে সার নিতে গেলে অনেক সময় সার আছে কি না, কখন পাওয়া যাবে—এসব নিয়ে চিন্তায় থাকতে হতো। এখন সার বিতরণের হিসাব ঠিকভাবে রাখা হলে আমাদের মতো কৃষকদের সুবিধা হবে। সময়মতো সার পেলে জমিতে ফসল ফলানোও সহজ হয়। আমরা চাই, এই ব্যবস্থা যেন ভালোভাবে চালু থাকে এবং সবাই যেন ঠিকমতো সার পায়।’
কৃষক সালাম মিয়া বলেন, ‘আমরা গ্রামের মানুষ, এত প্রযুক্তি বুঝি না। তবে সার যদি সময়মতো পাই, আর সার নিয়ে কোনো ঝামেলা না হয়, তাহলেই আমাদের উপকার।’
সার ডিলার ধন মিয়া বলেন, ‘আগে সার বিতরণ ও মজুতের হিসাব রাখতে অনেক সময় খাতায়-কলমে কাজ করতে হতো। এখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংরক্ষণ করা, হিসাব রাখা ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা সহজ । এতে সার বিতরণের কাজে শৃঙ্খলা আসবে এবং কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহের বিষয়টিও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে। এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু থাকলে কৃষক ও ডিলার—দুই পক্ষেরই সুবিধা হবে।’
এফডিএমএস ওয়েবসাইটটির ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টের হৃদয় হাসান রাফি বলেন, ‘সার বিতরণ ব্যবস্থাপনাকে সহজ, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যেই এ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সার বিতরণ, মজুত ও সরবরাহ-সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি অফিসের সহযোগিতায় জনকল্যাণমূলক এ প্রযুক্তিগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে যুক্ত হতে পেরে তিনি সন্তুষ্ট।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আমিনুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানান, এ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়ানো এবং সার বিতরণ-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনাকে আরো সুশৃঙ্খল করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
বর্তমানে কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষি উপকরণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার সময় ও শ্রম সাশ্রয়ের পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে।
তিনি আরো বলেন, বকশীগঞ্জে এফডিএমএস ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সার বিতরণ কার্যক্রম শুরু হওয়া কোন কৃষক যদি ভুল তথ্য দিয়ে সার উত্তোলন করে তার তথ্য আমাদের ওয়েব সাইটে ধরতে পারছি। এটি শুধু বকশীগঞ্জেই না পাশ্ববর্তী উপজেলা দেওয়ানগঞ্জেও এর ব্যবহার সম্প্রসারণ হচ্ছে। এটা যদি যথাযথ তদারকি, নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এ উদ্যোগ সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষিসেবার মানোন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








