দর্শনা রেলবন্দরে ২ বছরে রাজস্ব কমেছে ৪৮ কোটি টাকা

মনিরুজ্জামান সুমন দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)
ভারত থেকে পণ্য আমদানি কমে যাওয়ায় চুয়াডাঙ্গার দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলবন্দরে রাজস্ব আদায়ে বড় ধস নেমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আয় কমেছে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা। একই সময়ে পণ্য আমদানির পরিমাণও অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে বন্দরকেন্দ্রিক শ্রমিক, সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী ও পরিবহন মালিক-শ্রমিকসহ স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে।
তবে দীর্ঘ মন্দার পর পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। ডলার সঙ্কট ও এলসি জটিলতা কাটিয়ে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে দর্শনা রেলপথ দিয়ে ভারতীয় পণ্য আমদানিতে আবারো গতি ফিরেছে। মালবাহী ট্রেন বা রেক বাড়ায় রেল ইয়ার্ডে কর্মচাঞ্চল্য বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে রাজস্ব আয় ও কর্মসংস্থান- দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দর্শনা রেলপথ দিয়ে ৯ হাজার ৭৪৯টি ওয়াগনে পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৫৫৯ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি করা হয়। ওই অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয় ২৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। পরের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি নেমে আসে চার হাজার ৪৮৬টি ওয়াগনে, যার পণ্যের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৫২ হাজার ১০১ মেট্রিক টন। ফলে রাজস্ব আদায় কমে দাঁড়ায় ১১ কোটি ৪০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব কমে ১৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
এর আগের ২০২২-২৩ অর্থবছরে দর্শনা রেলপথ দিয়ে পণ্য আমদানি ও রাজস্ব আদায় ছিল অনেকটাই বেশি। ওই অর্থবছরে রাজস্ব এসেছিল ৫৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ফলে ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ৪৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আমদানি কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বন্দরকেন্দ্রিক শ্রমজীবী মানুষেরা। পণ্যবাহী ট্রেন এলে ওয়াগন থেকে পণ্য খালাস, ট্রাকে লোড করা ও পরিবহনের কাজে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়। আমদানি কমে যাওয়ায় তারা কাজ হারান। ২০২৫ সালের শুরুতেও দর্শনা রেলইয়ার্ডে শ্রমিকদের কর্মহীনতা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম স্থবিরতা দেখা যায়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের শেষ দিকে দর্শনা রেলপথে আলু ও পেঁয়াজসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের আমদানি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় শ্রমিক, সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারী, ট্রাকচালক ও তাদের সহযোগীদের কাজ অনেকটাই কমে গিয়েছিল।
দর্শনা রেল ইয়ার্ডের ব্যবসায়ী রানা খান বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে দর্শনা রেলপথ আমদানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাময়িক সঙ্কট কাটিয়ে আমদানি স্বাভাবিক হলে পরিবহন খাতের পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বাড়বে। কাস্টমস ও প্রশাসনিক সহযোগিতা এবং ব্যাংকিং সুবিধা জোরদার করা গেলে এ রুটে বাণিজ্য আরো বাড়বে।
মেসার্স কাজী কার্গো প্রাইভেট লিমিটেডের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, গত অর্থবছরে বাণিজ্য দুর্বল থাকলেও চলতি অর্থবছরে আমদানির গতি বাড়ছে। গত কয়েক মাসের তুলনায় ইদানীং পণ্য খালাস বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারের চাহিদা ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি করেন। সামনে বাণিজ্য আরো বাড়বে বলে আশা করা যায়। ব্যবসায়ীদের মতে, দর্শনা রেলবন্দরের বর্তমান গতি ধরে রাখতে নিয়মিত পণ্য আমদানি ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
দর্শনা সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাজী খন্দকার শওকত আলী বলেন, দর্শনা রেলবন্দরে গতি ফেরাটা ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পরিবহন খাতের জন্য আশাব্যঞ্জক। তবে আমদানি আরো গতিশীল করতে ব্যাংকিং সুবিধা, সহজ শর্তে এলসি খোলার সুযোগ, কাস্টমস ও রেলওয়ের সমন্বয় এবং দ্রুত পণ্য খালাসের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলস্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার মামুনুর রশিদ জানান, গত তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব কমলেও এখন উন্নতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব কিছুটা বাড়বে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আমদানি কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ রূপ পেলে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।