
বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, ‘চা শ্রমিকদের মজুরি কত টাকা হবে শুধু সেটিই মূল বিষয় নয়; একজন চা শ্রমিক যাতে স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারেন, সে অনুযায়ী মজুরি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সাথে চা বাগানগুলোকে লাভজনক ও টেকসই করতে সরকার কাজ করছে।’
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সিলেটের লাক্কাতুরা চা বাগান মাঠে সরকারের সিএসআর তহবিলের সহযোগিতায় চা শ্রমিকদের মধ্যে রেইনকোট বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবির বিষয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘চা শিল্পের প্রকৃতি অন্য শিল্পের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। দেশের অনেক চা বাগান দীর্ঘদিন আর্থিক সঙ্কটে রয়েছে এবং কোনো কোনো বাগানে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় চা বাগানগুলোকে টেকসই ও লাভজনক করে তোলার পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘যেসব চা বাগানে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও সরবরাহ অবকাঠামোর সুযোগ রয়েছে, সেখানে চা গাছের ক্ষতি না করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বাগানের আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। পাশাপাশি মসলা জাতীয় গাছ, টিম্বারসহ অন্য উপযোগী সম্পদ ব্যবহারের বিষয়েও কাজ করা হচ্ছে।’
চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রয়োজন অনুযায়ী চা বাগানগুলোতে প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করা হবে। বাগানের রাস্তাঘাট উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট দফতরের সাথে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হবে। শ্রমিক পরিবারের নতুন প্রজন্ম যাতে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষা নেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক পেশায় যেতে পারে, সে সুযোগও তৈরি করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘চা শিল্পকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে সরকার কাজ করছে। বাগানের আয় বৃদ্ধি, উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ শিল্পকে টেকসই করার লক্ষ্য রয়েছে।’
জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশে সরকার নির্ধারিত মূল্যে জ্বালানি বিক্রি হওয়ায় মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি সরাসরি মানুষের নজরে আসে। তবে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব যাতে অন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অস্বাভাবিকভাবে না পড়ে, সে জন্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক ও নির্বিঘ্ন রাখার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।’
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি ওই আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সাথেও সম্পর্কিত।’
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো ঠেকাতে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা করতে না পারেন।’
জ্বালানি তেল পাচারের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সীমান্ত রক্ষী বাহিনী এ বিষয়ে সচেতন রয়েছে ও জেলা পর্যায়েও প্রশাসন নজরদারি করছে। পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে জ্বালানি তেলের মূল্যের পার্থক্য বিবেচনা করেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’ বর্তমানে বড় ধরনের মূল্যপার্থক্যের কারণে জ্বালানি তেল পাচারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না।
বিরোধী দলের সমালোচনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রয়েছে। মানুষের প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও বিশ্লেষণ যেন গঠনমূলক এবং জনস্বার্থে কার্যকর হয়, সে প্রত্যাশা করেন তিনি।
সরকারি-বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সমন্বয় না হওয়ায় পর্যায়ক্রমে বেতন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একবারে বড় ধরনের বৃদ্ধি না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বেসরকারি খাতে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা মূলত বাজারের চাহিদা ও শ্রমবাজারের পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে মালিকপক্ষ নির্ধারণ করে থাকে। কোনো প্রতিষ্ঠান বাজারের তুলনায় কম মজুরি দিলে সেখানে প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়।’ শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন কিছু প্রতিষ্ঠানও ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতের উদ্যোগের আওতায় আসবে বলে জানান তিনি।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসেইন, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী, সদরের ইউএনও খোশনূর রুবাইয়াতসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তা এবং চা বাগানের শ্রমিকরা উপস্থিত ছিলেন।








