
যুক্তরাজ্যে মর্যাদাপূর্ণ ‘ইউকে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড’ প্রাপ্ত বাংলাদেশী বিখ্যাত চিত্রশিল্পী মুহাম্মদ ফখরুজ্জামানকে নিয়ে এক মনোমুগ্ধকর রাতের আড্ডায় মেতে উঠেছিলেন সিলেটের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের বিশিষ্টজন।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে সিলেটের প্রাচীন সাহিত্য-সংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ - কেমুসাসের অফিস কক্ষে এই আড্ডায় সুধীজন তার চিত্রকর্ম নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন। অনেকেই শিল্পীর বিমূর্ত ক্যানভাসের আবরণে লুকিয়ে থাকা তার সাধনার জগৎ সম্পর্কে জানতে প্রশ্ন করেন।
কেমুসাসের সাধারণ সম্পাদক, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক সেলিম আউয়ালের সঞ্চালনায় আড্ডার শুরুতে চিত্রশিল্পী মুহাম্মদ ফখরুজ্জামানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরেন দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরোচিফ সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদার।
তিনি বলেন, চিত্রশিল্পী ফখরুজ্জামান তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে লন্ডনকে কেন্দ্র করে প্রাচ্য, পাশ্চাত্য ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চারুকলার মেলবন্ধন গড়ে তুলেছেন। তার শিল্পচর্চা এখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে লন্ডনের গুইল্ডহল ইউনিভার্সিটি থেকে চারুকলায় উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে পেশাদার চিত্রশিল্পী হিসেবে দেশে-বিদেশে কাজ করছেন।
আড্ডায় সিলেটের সুধীজন চিত্রশিল্পী ফখরুজ্জামানের পেশাদারি জীবনের নানা দিক তুলে ধরে বলেন, তার বিমূর্ত চিত্রকর্মে প্রকৃতি, জীবন ও মানুষের অন্তর্লোকের সঙ্গে শিল্পের এক গভীর সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। রঙের বৈচিত্র্য, রেখার সাবলীলতা এবং কম্পোজিশনের সুষম বিন্যাস চিত্রগুলোকে করে তোলে আকর্ষণীয়। কখনো উজ্জ্বল রঙের তীব্রতা, কখনো কোমল রঙের আবেশ—চিত্রের ভেতর দিয়ে প্রকাশ পায় শিল্পীর নিজস্ব ভাবনা, অনুভূতি ও সৌন্দর্যচেতনা।
তারা বলেন, মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের শিল্পকর্ম শুধু চোখের সৌন্দর্যতৃষ্ণা মেটায় না; বরং দর্শকের মনে জাগিয়ে তোলে নানা প্রশ্ন, অনুভূতি ও কল্পনার জগৎ। তার বিমূর্ত চিত্রে প্রত্যেক দর্শক নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি অনুযায়ী ভিন্ন অর্থ খুঁজে নিতে পারেন। এ কারণেই তার শিল্পকর্মের আবেদন ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি সর্বজনীনতাও ধারণ করে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সিলেটের সুধীজন বলেন, শিল্পীর সৃষ্টিশীলতা, রঙের সাহসী ব্যবহার এবং বিমূর্ত শিল্পভাবনার সমন্বয়ে তার চিত্রকর্ম বাংলা চিত্রকলার পরিসরে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি লাভের সম্ভাবনা বহন করে। শিল্পের ভাষায় দৃশ্যমান বাস্তবতার বাইরে অনুভূতি ও চিন্তার প্রকাশই তাঁর চিত্রকর্মের প্রধান আকর্ষণ।
তারা বলেন, বিমূর্ত চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের চিত্রকর্মে রং, রেখা, আকার ও বিন্যাসের মাধ্যমে অনুভূতি, চিন্তা এবং কল্পনার এক অনন্য প্রকাশ ঘটেছে। তার শিল্পে বাস্তব জগতের সরাসরি অনুকরণের পরিবর্তে রূপ, রং ও রেখার স্বাধীন ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সৌন্দর্য ও ভাবনার বহুমাত্রিকতা ফুটে ওঠে। প্রতিটি চিত্র দর্শকের মনে সৃষ্টি করে অনুভূতির নতুন দিগন্ত।
নিজের শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত সিলেটের মাটিতে এ ধরনের আয়োজনে আবেগাপ্লুত চিত্রশিল্পী ফখরুজ্জামান কেমুসাস ও আয়োজনকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, পাশ্চাত্যে বা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিত্রশিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকার যেরকম পৃষ্ঠপোষকতা করে বাংলাদেশে এরকম করা হয় না। বাংলাদেশে সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তেমন আর্থিক বরাদ্দ চোখে পড়ে না। তিনি আমাদের দেশে সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সরকারের আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর দাবি জানান।
আড্ডায় সুধীজনের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন কেমুসাসের সাধারণ সম্পাদক সেলিম আউয়াল, সত্তর দশকের শক্তিমান কবি ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল সৈয়দ আলী আহমদ, সত্তর দশকের কবি সালেহ আহমদ, প্রখ্যাত ভ্রমণকাহিনী লেখক মোয়াজ আফসার, কেমুসাসের সহ-সাধারণ সম্পাদক কবি আবদুল মুকিত অপি, কেমুসাসের সাহিত্য ও গবেষণা সম্পাদক ছড়াকার কামরুল আলম, প্রভাষক ও বিশিষ্ট কবি মামুন সুলতান, চৈতন্য প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী লেখক রাজীব চৌধুরী, কেমুসাসের সহ-লাইব্রেরি সম্পাদক ও সিলেট লেখিকা সংঘের সাধারণ সম্পাদক ইশরাক জাহান জেলী, কবি নিশাত ফাতেমা মেহের ও আবু তালহা মাহী।
উল্লেখ্য, চিত্রশিল্পী ফখরুজ্জামান কবি ইশরাক জাহান জেলীর চাচা এবং সিনিয়র সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদারের চাচাশ্বশুর।







