মাঝি-জেলেদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা বিতরণ
মাঝি-জেলেদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা বিতরণ নয়া দিগন্ত

রাতের অন্ধকারে হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠে পদ্মা। তীরের কাছে বাঁধা নৌকাগুলো দুলতে শুরু করলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে নদীপাড়ে। নৌকা রক্ষায় ছুটে যান মাঝি ও জেলেরা।

ঢেউয়ের ধাক্কায় একটি নৌকা ভেসে যায়, আরেকটি তলিয়ে যায় নদীতে। পানিতে ডুবে যায় মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম। নৌকা রক্ষার চেষ্টা করতে গিয়ে আহত হন রিমোন হোসেন ও তার স্ত্রী। নৌকা হারিয়ে কয়েকটি পরিবারের সামনে এখন জীবিকা চালানোর অনিশ্চয়তা।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টার দিকে রাজশাহীর টি-বাঁধ সংলগ্ন পদ্মায় এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় মাঝি ও জেলেদের ভাষ্য, ওই রাতে হঠাৎ নদীতে বড় বড় ঢেউ উঠতে শুরু করে। তীরের কাছে বাঁধা নৌকাগুলো ঢেউয়ের সাথে দুলতে থাকলে তারা সেগুলো রক্ষার চেষ্টা করেন। এ সময় একটি নৌকা ভেসে যায় এবং আরেকটি তলিয়ে যায়। নৌকায় থাকা মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জামও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

ভেসে যাওয়া নৌকাটি রক্ষার চেষ্টা করতে গিয়ে আহত হন রিমোন হোসেন ও তার স্ত্রী। নৌকার ধাক্কায় রিমোনের পা ভেঙে যায়। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। আহত হওয়ার পর থেকে তিনি কাজ করতে পারছেন না।

রিমোন হোসেন বলেন, ‘রাত ১০টার দিকে হঠাৎ দেখি, পদ্মায় সমুদ্রের মতো বড় বড় ঢেউ উঠছে। বাড়ির সামনে শাহজামাল মাঝির নৌকা ছিল। নৌকাটি ভেসে যেতে দেখে আমি আর আমার স্ত্রী সেটি আটকানোর চেষ্টা করি। তখন নৌকার ধাক্কায় আমার পা ভেঙে যায়। আমি ঘটনাস্থলেই অজ্ঞান হয়ে পড়ি।’

তিনি আরো বলেন, ‘পায়ের এই অবস্থায় কোনো কাজ করতে পারছি না। সংসার কিভাবে চলবে, সেটাই বুঝতে পারছি না।’

ওই রাতের ঢেউ দেখে আতঙ্ক হয়ে পড়েছিলেন মাঝি শাহজামালও। তার নৌকাটি ভেসে যাওয়ার উপক্রম হলেও শেষ পর্যন্ত সেটি রক্ষা করা সম্ভব হয়। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ এত বড় ঢেউ উঠবে, আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। আমার নৌকা ভেসে যাচ্ছিল। রিমোন ও তার স্ত্রী সেটি বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়েছেন। কোনোভাবে নৌকাটি রক্ষা পেয়েছে।’

তবে জারজিস মাঝির একমাত্র নৌকাটি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বাড়ির সামনের বাঁধে বেঁধে রাখা নৌকাটি ঢেউয়ের পানিতে তলিয়ে যায়। একইসাথে পানিতে ডুবে যায় মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম।

জারজিস মাঝি বলেন, ‘একটি নৌকাই ছিল আমার পরিবারের আয়ের পথ। নৌকাটি ডুবে যাওয়ার সাথে মাছ ধরার জালও গেছে। প্রায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এক রাতেই আমার পরিবারের জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।’

নদীপাড়ের মানুষের উদ্বেগ শুধু নৌকা ডোবা কিংবা আহত হওয়ার ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। পদ্মার পানি ও ঢেউয়ের চাপ বাড়লে তীরবর্তী এলাকা, বাঁধ ও বসতভিটা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়। নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে এমন পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে টি-বাঁধের বটতলা এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলো পরিদর্শন করেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) কাজী শহিদুল ইসলাম। তিনি পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে তাদের দুর্ভোগের কথা শোনেন।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘গত বুধবার রাতে হঠাৎ ঢেউয়ের কারণে পদ্মার টি-বাঁধ এলাকার মাঝি ও জেলে পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের সার্বিক খোঁজখবর নিতে এসেছি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য খাদ্যসামগ্রী ও চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘পদ্মার পানি বৃদ্ধি ও চরাঞ্চলের পরিস্থিতি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পবা উপজেলার মধ্যচরে ক্ষতিগ্রস্ত ২০০ পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।’

এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: সবুর আলী ও নেজারত ডেপুটি কালেক্টর মো: আরিফ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।