
সোহেল মিয়া দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ)
বছরের প্রায় আট মাস পানিতে ডুবে থাকা সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার হাওরপাড়ের মানুষের ভাগ্য বদলে গেছে। পুরো আট মাস পানিতে ডুবে থাকা এ অঞ্চলের মানুষের আয়ের একমাত্র উৎস ছিল বছরে মাত্র একবার বোরো ধানের চাষ। বাড়তি কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় দারিদ্র্য ও বেকারত্ব ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। কাজের সন্ধানে গ্রামের পুরুষদের ছুটতে হতো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
তবে সম্প্রতি পুকুরে মাছ চাষ করে ভাগ্য বদলে ফেলেছেন তারা। মাছ চাষ ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নতুন নতুন কর্মসংস্থান। বেড়েছে তাদের সামগ্রিক আয়। স্বাবলম্বী হয়েছেন কৃষক ও বেকার যুবকরা।
উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত আলীপুর গ্রামের চিত্রই এর বড় উদাহরণ। গত সোমবার সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার আলীপুর, বরকতনগর, গিরিশনগর, টেংরা, মহব্বতপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি এনেছে মাছ চাষ। বাড়ির আঙিনায় পুকুর খনন করে কিংবা খাল-বিল ও জলাশয় লিজ নিয়ে মাছ চাষ করছেন অনেকে। কৃষিকাজের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন তারা।
স্থানীয়রা জানান, একসময় কাজের অভাবে গ্রামের অনেক মানুষকে বছরের বড় একটি সময় বাইরেই থাকতে হতো। এখন মাছ চাষ, মাছ আহরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন এসব এলাকার বিভিন্ন ধরনের শত শত মণ মাছ স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে চাষিদের পাশাপাশি মাছ ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরাও আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
আলীপুর গ্রামের মৎস্য উদ্যোক্তা আশিস রহমান বলেন, ‘বেকারত্ব দূর করার লক্ষ্যে কয়েক বছর আগে বাড়ির আঙিনায় আমাদের নিজস্ব পুকুরে মাছ চাষ শুরু করি। প্রথম বছর লাভবান হওয়ায় পরের বছর খামারের পরিধি সম্প্রসারণ করি। বর্তমানে আমার খামারে রুই, কাতল, মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উৎপাদিত হচ্ছে।’ তিনি আরো জানান, এ অঞ্চলের মাছ এখন স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। মাছ চাষের মাধ্যমে নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদেরও কাজের সুযোগ হয়েছে বলে জানান আশিস রহমান।
তিনি আরো বলেন, তাকে দেখে এলাকার অনেকেই মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। প্রতি বছর মৎস্য চাষে রাষ্ট্রীয় ও জেলাপর্যায়ে বিভিন্ন পুরস্কার ও স্বীকৃতিও পাচ্ছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। তবে এ খাত আরো সম্প্রসারণে সহজ শর্তে সরকারি ঋণ ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশীদ জানান, ইউনিয়নের বেকার যুবকদের অনেকে মাছ চাষ ও ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। মাছ চাষে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এলাকার কয়েকজন খামারি একাধিকবার জেলাপর্যায়ে শ্রেষ্ঠ মৎস্যচাষির পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। আলীপুর ছাড়াও নূরপুর, টেংরাটিলা, বৈঠাখাই, সোনাপুর, নন্দীগ্রাম, কনছখাই ও কানলার হাওরপাড়ে গড়ে উঠেছে শত শত বাণিজ্যিক মাছের পুকুর। এসব পুকুরে পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, কাতলা ও বিভিন্ন প্রজাতির কার্পজাতীয় মাছের চাষ হচ্ছে। গ্রামের সড়ক ও হাওরের পাশে একের পর এক পুকুর দেখে মনে হয় অনেক গ্রামই যেন এখন পুকুরবেষ্টিত।
দোয়ারাবাজার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরেফিন মাহমুদ বলেন, মাছ চাষ হচ্ছে এমন প্রায় পাঁচ হাজার পুকুর রয়েছে এ উপজেলায়। এ ছাড়াও হাওরপাড়ে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের জন্য পুকুরের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া মাছ চাষের উপযোগী হওয়ায় উৎপাদনও ভালো হচ্ছে। চাষিদের উৎসাহিত করতে পরামর্শসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে মৎস্য অফিস থেকে।







