
জাহাঙ্গীর আলম হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ)
‘বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই- কুঁড়েঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই। আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে- তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।’ কবি রজনীকান্ত সেনের কালজয়ী ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতার এই চরণগুলো এবং বাবুই পাখির শৈল্পিক নিপুণতা ও স্বাধীন জীবনের যে জয়গান গাওয়া হয়েছে, বাস্তবে সেই দৃশ্য এখন বিরল। সুন্দর ঘর বুননেন ফলে বাবুই পাখিকে তাঁতি পাখি বলা হয়। কিন্তু কালের বিবর্তন, মানুষের অসচেতনতা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলায় দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে শিল্পোত্তীর্ণ বাবুই পাখি এবং তাদের প্রধান আশ্রয়স্থল তালগাছ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বয়োবৃদ্ধদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক-দেড় দশক আগেও হোসেনপুরের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলসহ গ্রামগঞ্জের তাল, নারিকেল, খেজুর ও সুপারিগাছে ঝুলন্ত অজস্র বাবুই পাখির বাসা চোখে পড়ত। দল বেঁধে বাবুই পাখির কিচিরমিচির শব্দ এবং তাদের খড়কুটো দিয়ে বোনা দৃষ্টিনন্দন ঝুলন্ত বাসা একসময় গ্রামের মানুষকে আনন্দ দেয়ার পাশাপাশি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় অনন্য ভূমিকা রাখত। কিন্তু সময়ের আবর্তে গ্রামীণ সড়ক সম্প্রসারণ, আবাসন তৈরি ও কাঠের দরকারে উজাড় হয়েছে বহু পুরনো তালগাছ। তালের সারি কমার সাথেই দ্রুত বিলুপ্ত হতে বসেছে কাচশিল্পের কারিগর হিসেবে পরিচিত এই পাখি।
পাখি ও পরিবেশপ্রেমীদের মতে, বাবুই পাখির বোনা বাসা দেখতে যেমন সুদৃশ্য, প্রকৌশলগত দিক থেকে তেমনি মজবুত। কালবৈশাখীর ঝোড়ো হাওয়ায় গাছ দুললেও সাধারণত ঝুলন্ত এই বাসাগুলো খসে পড়ে না। খড়ের ফালি, ধানের পাতা, তালের কচি পাতা, কাশবনের লতাপাতা ও ঘাস দিয়ে গাছের উঁচু ডালে বাসা বুনে থাকে এরা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা উজ্জ্বল হোসাইন জানান, একটি পূর্ণাঙ্গ বাসা তৈরি করতে বাবুই পাখির কমপক্ষে দুই সপ্তাহ সময় লাগে। সাধারণত এপ্রিলের শেষ থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। প্রজনন সময় ছাড়া অন্য সময় পুরুষ ও স্ত্রী পাখির পিঠ তামাটে বর্ণের এবং গায়ে কালো দাগ থাকে। ঠোঁট মোচাকৃতি ও লেজ হয় চৌকা। তবে প্রজনন মৌসুমে পুরুষ পাখির গায়ের রঙ গাঢ় বাদামি হয় এবং বুকের দিকটা ফ্যাকাসে রূপ নেয়।
তিনি আরো জানান, প্রজনন মৌসুমে একটি পুরুষ বাবুই ছয়টি পর্যন্ত বাসা বুনতে পারে। স্ত্রী পাখি ডিম দেয়ার প্রায় দুই সপ্তাহের মাথায় বাচ্চা ফোটে এবং তিন সপ্তাহের মধ্যে ছানাগুলো স্বাধীনভাবে উড়তে শেখে। এই সময়টা পাকা ধানের মৌসুম হওয়ায় স্ত্রী পাখি ধান ও দুধধান সংগ্রহ করে বাচ্চাদের খাওয়ায়।
স্থানীয় হোসেনপুর সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এ বি এম ছিদ্দিক চঞ্চল বলেন, বিশ্বজুড়ে বাবুই পাখির ১১৮টির বেশি প্রজাতি থাকলেও বাংলাদেশে প্রধানত তিন প্রজাতির বাবুই দেখা যায়- বাংলা বাবুই, দাগি বাবুই ও দেশী বাবুই। চমৎকার ঝুলন্ত বাসা তৈরির পারদর্শিতার জন্য এরা ‘তাঁতি পাখি’ হিসেবে পরিচিত।
এ ছাড়া কৃষিজমিতে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহার, খাদ্যসঙ্কট এবং উঁচু তাল, খেজুর ও নারিকেলগাছ নিধনের ফলেই হোসেনপুর থেকে বাবুই পাখি বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। সমন্বিত উদ্যোগ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাবুই পাখি ও তার শৈল্পিক বাসা শুধু রূপকথার গল্প আর মিউজিয়ামেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।







