জনবল সঙ্কটে কুষ্টিয়ায় ব্যাহত হচ্ছে সরকারি পোনা উৎপাদন

আ ফ ম নুরুল কাদের কুষ্টিয়া
চাষিদের কাছে সহজলভ্য ও সুলভমূল্যে মানসম্মত মাছের রেণু ও পোনা সরবরাহের লক্ষ্যেই দেশে গড়ে উঠেছিল সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার। নদী-নালা ও প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে মাছের ডিম ও ধানি সংগ্রহের পুরনো ব্যবস্থার পর সময়ের সাথে যুক্ত হয়েছে আধুনিক হ্যাচারি প্রযুক্তি। তবে দীর্ঘদিন পার হলেও কুষ্টিয়ার সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারগুলো কাক্সিক্ষত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। জেলায় চারটি সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার থাকলেও জনবলসঙ্কট, অবকাঠামোর দুরবস্থা, পর্যাপ্ত ব্রুড মাছের ঘাটতি, পুকুর ব্যবস্থাপনার জটিলতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাবের কারণে কাক্সিক্ষত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
কুষ্টিয়া সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৬ সালে। প্রায় ১০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই খামারে ছোট ও বড় মাছের জন্য ১১টি পুকুর, দু’টি ব্রুড পুকুর, একটি স্পন ফিশ পুকুর, ছয়টি নার্সারি পুকুর এবং দু’টি পোনা উৎপাদন পুকুর রয়েছে। শুরুর দিকে নদী ও প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু সংগ্রহ করে ধানি তৈরি করা হতো। পরে তা স্থানীয় মাছচাষিদের কাছে বিক্রি করা হতো। আশির দশকে পোনার চাহিদা বাড়তে শুরু করলে কুষ্টিয়ার এই খামার থেকে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলার চাষিরা রেণু ও পোনা সংগ্রহ করতেন।
তবে সময়ের পরিবর্তনে এখন প্রাকৃতিক উৎসের বদলে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কার্পজাতীয় মাছের প্রণোদিত প্রজননের মাধ্যমে রেণু উৎপাদন করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে কুষ্টিয়া সরকারি খামারে কার্প রেণুর লক্ষ্যমাত্রা ১১১ কেজি, চাইনিজ কার্প ৭ কেজি, শিং মাছের রেণু ৭ কেজি, কার্পজাতীয় পোনা এক হাজার ৮৫ কেজি, গলদা চিংড়ির জুভেনাইল ১০ হাজার কেজি এবং অন্যান্য পোনা ১০ হাজার কেজি নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে কুষ্টিয়া সদর, পোড়াদহ, কুমারখালী ও ভেড়ামারায় চারটি সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার চালু রয়েছে। তবে এসব খামারে প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবলের অভাব রয়েছে। একই সাথে যুক্ত হয়েছে পুকুর ব্যবস্থাপনা, ব্রুড মাছ সংরক্ষণ ও অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতা।
কুষ্টিয়া সদর সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের ব্যবস্থাপক ড. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রায় ১০ একর আয়তনের এই প্রতিষ্ঠানে পুকুর রয়েছে প্রায় ১.৮ হেক্টর। অনুমোদিত জনবল চারজন হলেও বর্তমানে কর্মরত মাত্র তিনজন। খামারে পাম্প অপারেটর ও নিরাপত্তাপ্রহরী থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ ‘ফ্যাসিলিটি টেকনিশিয়ান’-এর পদটি শূন্য রয়েছে। ফলে কারিগরি কাজে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
ড. আবুল কালাম আজাদ জানান, জনবলসঙ্কটের কারণে স্বাভাবিক উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা কম হওয়ায় অনেক সময় তাকেই রাত পর্যন্ত পাহারা ও দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ ছাড়া আশপাশে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠায় পুকুরে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পৌঁছায় না। বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘিœত হওয়ায় সমস্যা আরো বাড়ে। খামারে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করে পুকুরে এয়ারেটর স্থাপন করা গেলে পানির গুণগত মান ও পোনা উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি মনে করেন।
অন্য দিকে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, খামারের পুকুরের পাড়, সীমানাপ্রাচীর ও হ্যাচারি সংস্কারসহ কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই খামার থেকে আট লাখ টাকার বেশি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি খামারের উৎপাদিত পোনার গুণগত মান নিয়ে চাষিদের আস্থা এখনো বজায় রয়েছে। সদর উপজেলার দহকোলা গ্রামের মৎস্যচাষি শরিফুল ইসলাম বলেন, সরকারি খামারের রেণুর মান তুলনামূলক অনেক ভালো। আগে বাজার থেকে নিম্নমানের রেণু কিনে বেশি খাবার দিয়েও কাক্সিক্ষত বৃদ্ধি পাইনি, এতে লোকসান হয়েছে। জাত ভালো না হলে যত খাবারই দেয়া হোক না কেন, ভালো ফল পাওয়া যাবে না।
তবে অবকাঠামোগত সঙ্কটের পাশাপাশি মাছের পোনার ‘জেনোটাইপ’ বা জেনেটিক মান টিকিয়ে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবেশবিজ্ঞানী গৌতম কুমার রায় বলেন, প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে পাওয়া পোনার জোগান দিন দিন কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম হ্যাচারিতে উৎপাদিত পোনার গুণগত মান নিশ্চিত করা না গেলে দেশের মৎস্য খাত বড় সঙ্কটে পড়বে।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে দেশে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০টি হ্যাচারি রয়েছে। কিন্তু একই বংশের মাছের মধ্যে বারবার প্রজনন বা ‘ইনব্রিডিং’ হলে পোনার স্বাভাবিক বৃদ্ধি থমকে যায় এবং দুর্বল পোনা তৈরি হয়। মা মাছের সাথে পোনার কিংবা ভাই-বোনের মধ্যে সঙ্করায়ণের ঝুঁকি এড়াতে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
তবে পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে নিয়মিত তদারকি সম্ভব হচ্ছে না বলে স্বীকার করেছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। প্রাকৃতিক উৎসের জোগান কমে আসায় দেশের মৎস্য খাত এখন কৃত্রিম রেণুর ওপর নির্ভরশীল। এ অবস্থায় সরকারি খামারগুলোর অবকাঠামো ও জনবলসঙ্কট দ্রুত নিরসন না করলে মাছের মান ও উৎপাদন উভয়ই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।