সীমান্ত
ইয়াবার চালান ছিনতাই ঘিরে উখিয়া সীমান্তে গোলাগুলি ছবি: নয়া দিগন্ত

কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী সীমান্তে ২০ হাজার ইয়াবার একটি চালান ছিনতাইকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। গত রোববার রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত পালংখালী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ফারিরবিল মাদরাসার সামনে এ ঘটনা ঘটে। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট ধরে একের পর এক গুলির শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েকজনের দাবি, তারা অন্তত ২০ থেকে ২৫ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গোলাগুলির সময় ফারিরবিল কবরস্থানসংলগ্ন এলাকায় দুই পক্ষের লোকজনকে অবস্থান নিতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে কয়েকজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। তবে গোলাগুলিতে কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

রাতের ওই ঘটনায় সীমান্তবর্তী জনপদে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক পাচার ও চালান ছিনতাইকে কেন্দ্র করে পালংখালীর সীমান্ত এলাকায় মাঝেমধ্যেই সশস্ত্র বিরোধের ঘটনা ঘটে। মিয়ানমার থেকে আসা মাদকের সাথে ভারী আগ্নেয়াস্ত্রও ঢুকছে বলে তাদের দাবি। এসব অস্ত্রের ব্যবহার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

রোববার রাত ১১টার দিকে পালংখালী স্টেশন থেকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন স্থানীয় এক বাসিন্দা। 

তিনি বলেন, পালংখালী উচ্চবিদ্যালয়ের গেট পার হওয়ার পরপরই গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে মোটরসাইকেল রেখে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। প্রায় ৩০ মিনিট পর পরিস্থিতি শান্ত হলে বাড়িতে ফেরেন তিনি।

ফারিরবিলের বাসিন্দা ফরিদ বলেন, ‘রাত ১১টার দিকে ফারিরবিল কবরস্থানসংলগ্ন এলাকায় দুই পক্ষের লোকজনকে অবস্থান নিতে দেখা যায়। তার দাবি, দুই পক্ষ মিলিয়ে সেখানে প্রায় ৮০ জন লোক ছিল। এরপরই গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।

স্থানীয় কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গুলির শব্দে আশপাশের বাড়িঘরের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকেই দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরের ভেতরে অবস্থান নেন। সীমান্তবর্তী এলাকায় এ ধরনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

২০ হাজার ইয়াবা ছিনতাইয়ের অভিযোগ

স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, সীমান্ত থেকে ইয়াবার একটি চালান বাংলাদেশে আনার সময় সেটি ছিনতাইকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধের সূত্রপাত হয়। 

সূত্রটি জানায়, নলবনিয়া এলাকার মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত রুবেল ওরফে ‘ডাকাত রুবেল’-এর সহযোগীরা ওই চালান নিয়ে আসছিলেন। এ সময় পালংখালী ইউনিয়নের ছাত্রদল নেতা খাইরুল বশর ও তার সহযোগীরা ২০ হাজার ইয়াবা ছিনিয়ে নেন বলে অভিযোগ ওঠে।

ওই সূত্রের ভাষ্য, চালান ছিনতাইয়ের পর রুবেল তার সহযোগীদের নিয়ে খাইরুল বশরকে খুঁজতে বের হন। একপর্যায়ে খাইরুল বশর পালংখালী স্টেশন হয়ে বটতলীর দিকে যাচ্ছেন—এমন খবর পেয়ে রুবেলের পক্ষের লোকজন ফারিরবিল মাদরাসার সামনে অবস্থান নেন। পরে সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয় বলে সূত্রটি দাবি করেছে।

তবে ইয়াবা ছিনতাইয়ের অভিযোগ, দুই পক্ষের লোকজনের উপস্থিতি এবং গোলাগুলিতে ব্যবহৃত অস্ত্রের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

যাদের ঘিরে অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, গোলাগুলিতে রুবেল ওরফে ‘ডাকাত রুবেল’ নেতৃত্ব দেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে একাধিক মাদক ও অস্ত্র মামলা রয়েছে। তার ভাই ইরান মাঝিও মাদক ও অস্ত্র মামলার আসামি। গত ৪ সেপ্টেম্বর ভোরে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ ইরান মাঝিকে গ্রেফতার করে বিজিবি। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।

অন্যদিকে, খাইরুল বশরের পক্ষ হয়ে গোলাগুলিতে ছৈয়দুল বশর ওরফে ‘ছিছি বশর’ অংশ নেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। তার বিরুদ্ধেও একাধিক মাদক ও অস্ত্র মামলা রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, এর আগে একটি গোলাগুলির ঘটনায় ভারী আগ্নেয়াস্ত্রসহ ছিছি বশরকে র‍্যাব আটক করেছিল। তবে সে সময় তার ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রটি উদ্ধার করা যায়নি বলে জানা গেছে। রোববার রাতের গোলাগুলিতেও তাকে ভারী অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা গেছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে এ দাবিরও স্বাধীন কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, ‘গোলাগুলির খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়।’ প্রাথমিকভাবে রুবেল পক্ষের লোকজন গোলাগুলিতে জড়িত ছিল বলে জানা গেছে।

ওসি বলেন, ‘রুবেলের বাড়িতে একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। গোলাগুলির ঘটনায় তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পালংখালীর সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচার ও চালান ছিনতাইকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা নতুন নয়। মাদক কারবারিদের হাতে মিয়ানমার থেকে আসা ভারী আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বলেও তারা দাবি করেন। এসব অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার ঠেকানো না গেলে সীমান্তবর্তী জনপদে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, মাদকের চালান ঘিরে সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনায় কারা জড়িত, তাদের হাতে কী ধরনের অস্ত্র রয়েছে এবং সীমান্তপথে মাদক ও অস্ত্রের প্রবেশ কীভাবে ঠেকানো হবে? তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করে গ্রেফতার এবং সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।