দখল দূষণে হুমকির মুখে চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী
দখল দূষণে হুমকির মুখে চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী

 এস এম রহমান পটিয়া চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)


জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়, তোমার সলিলে পড়েছিল কবে কার কানফুল খুলি, তোমার স্রোতের উজান ঠেলিয়া কোন তরুণী, কে জানে সাম্পান নায়ে ফিরেছিল তার দয়িতের সন্ধানে। আনমনে তার খুলে গেলো খোঁপা, কান-ফুল গেল খুলি। সে ফুল যতনে পরিয়া কর্ণে, হলে কি কর্ণফুলী? 
অপর দিকে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক গানের কিংবদন্তি শিল্পী প্রয়াত শেফালী ঘোষের গাওয়া, ওরে কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে অভাগিনীর দুঃখের কথা কবি বন্ধুরে। এরকম হাজারো কবিতা আর গানের সাথে মিলে মিশে আছে চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী নদী। বর্তমানে বিশ্বজলবায়ুর প্রভাব ছাড়াও আজ দখল দূষণে চরম অস্তিত্ব সঙ্কটে রয়েছে চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী নদী। সহসা আন্তঃমন্ত্রণালয় যৌথ উদ্যোগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এক দিকে যেমন দখল দূষণ হ্রাস পাবে। অন্যদিকে নদী তার চেনারূপে ফিরবে। পাশাপাশি স্থায়ীভাবে নদীর দুই তীরে গড়ে উঠতে পারে বিশাল পর্যটন স্পট।
কর্ণফুলী নদীর উৎপত্তি : ভারতের মিজোরাম রাজ্যের লুসাই পাহাড় (বা মিজো পাহাড়) থেকে এ নদী পাহাড়ি পথ পেরিয়ে  রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পতেঙ্গার মোহনা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এ নদীর মোট দৈর্ঘ্য ২৭০ কিলোমিটার আর প্রশস্ততা বর্তমানে স্থানভেদে সাড়ে ৬০০ মিটার থেকে সাড়ে ৪০০ মিটার।
চট্টগ্রামের প্রাণ এবং দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কর্ণফুলী নদী বর্তমানে মারাত্মক অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে পড়েছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে মানুষের তৈরি নানা ধরনের দূষণ ও দখলের কারণেই এ নদী হুমকির মুখে পড়েছে। কর্ণফুলী নদীর সবচেয়ে বড় সঙ্কটগুলোর একটি হলো প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য। চট্টগ্রাম মহানগরীর ৫২টি খাল ও নালার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ মেট্রিক টন প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য নদীতে এসে মিলছে। এসব পলিথিন নদীর তলদেশে জমা হয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় বন্ধ করছে এবং ড্রেজিং কাজেও বিঘœতা দেখা দেয়। 
মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভয়াবহতা : সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্ন ভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কর্ণফুলী নদীর পানি ও এর তলদেশে পলিতে মারাত্মক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক (৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা) ছড়িয়ে পড়েছে। এই কণাগুলো নদীর মাছ ও জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করছে, যা পুরো নদী এবং ওপর নির্ভরশীল মানবদেহের চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। 
শিল্প-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য : নদীর দুই তীরে অবস্থিত কয়েক শ’ ছোট-বড় শিল্প-কারখানা (যেমন- গার্মেন্টস, ট্যানারি, কেমিক্যাল ও ডাইং ফ্যাক্টরি) কোনো ধরনের শোধন ছাড়াই তাদের বিষাক্ত রাসায়নিক ও তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলছে। 
ফলে পানিতে অ্যামোনিয়াম ও ফসফেটের মাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গিয়ে পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। 
এ ছাড়া, চট্টগ্রাম নগরীর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ মানুষের দৈনন্দিন গৃহস্থালি ময়লা এবং হাজার হাজার গ্যালন অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য প্রতিদিন নালা-নর্দমা হয়ে এই নদীতে গিয়ে মিশছে। অবৈধ দখল ও ভরাটের কারণে কর্ণফুলীর প্রশস্ততা ক্রমান্বয়ে কমে আসায় নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে। 
মালবাহী জাহাজ ও নৌযান থেকে তেল নিঃসরণ : চট্টগ্রাম বন্দরে আসা শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ, লাইটারেজ জাহাজ এবং ট্রলার থেকে নির্গত পোড়া তেল ও মবিল সরাসরি কর্ণফুলীর পানিতে মিশে জলজ পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। এসব বহুমুখী দূষণের কারণে কর্ণফুলী নদীর জীববৈচিত্র্য চরমভাবে বিপন্ন। ইতোমধ্যে নদী থেকে প্রায় ৩৫ প্রজাতির মাছ  বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং নদীর তীরবর্তী প্রায় ৮১ প্রজাতির উদ্ভিদ বিলুপ্তির পথে রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা উঠে এসেছে। এক সময় কর্ণফুলীর অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাণী  ডলফিনের বিচরণও এখন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কর্ণফুলী নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী। কর্ণফুলী নদীর তীরে উপনদী: কাচালং, চেঙ্গী, হালদা এবং ধুরুং নদী। (এর মধ্যে হালদা নদী বিশ্বের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে অত্যন্ত বিখ্যাত)। বাম তীরের উপনদী: থেগা, সাবালং, কাপ্তাই, রিক্ষ্যং এবং ফুয়াইরং নদী।
জানা গেছে, দখল উচ্ছেদ এবং নদীকে দূষণমুক্ত করতে বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশ ও সরকারি উদ্যোগ নেয়া হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। কর্ণফুলী নদী দখল ও দূষণ বর্তমানে চট্টগ্রামের পরিবেশ এবং দেশের অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ড খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য একটি অন্যতম বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও বর্জ্য ফেলার কারণে কর্ণফুলী আজ মৃতপ্রায়। 
স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সচেতন মহল মনে করে চট্টগ্রামের প্রাণ এবং দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কর্ণফুলী নদী রক্ষায় আন্তঃমন্ত্রণায় যৌথ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে এই রাঙ্গুনিয়া বোয়ালখালী হয়ে নগরীর পতেঙ্গা পর্যন্ত দুই তীরে স্থায়ীভাবে ফাড ওয়াল স্থাপন এবং এর সাথে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হলে গড়ে উঠবে নয়নাভিরাম ইকো ট্যুরিজম স্পট। অন্যদিকে  চিরতরে নদীতীর দখলও বন্ধ হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।