আড়াই লাখ কোটি টাকার মেট্রোরেল

 বিশেষ সংবাদদাতা

নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুরে প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেনের উদ্যোগ; তিন মেট্রোরেলের ব্যয় ও সময় বেড়েছে- সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা, দেশের পরিবহন অবকাঠামোয় একই দিনে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) একনেক সভায় ১২টি প্রকল্প অনুমোদনের পাশাপাশি ঢাকার গণপরিবহন ও জাতীয় রেলওয়ের জন্য একসাথে তিনটি মেট্রোরেল এবং প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। তিন মেট্রোরেলের সম্মিলিত ব্যয় প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর সাথে  নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর করিডোরে তিন হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকার বৈদ্যুতিক রেল প্রকল্প যুক্ত হওয়ায় পরিবহন খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ আরো বাড়ছে।
একদিকে এটি দেশের রেল ও গণপরিবহন ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বড় উদ্যোগ; অন্য দিকে বিপুল ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ, প্রকল্পের সময় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা- সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, এসব প্রকল্প শেষ পর্যন্ত কতটা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হবে।
৫২ কিলোমিটারে বৈদ্যুতিক রেল
তিন হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকার প্রকল্পের আওতায় নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটের ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে ওভারহেড ক্যাটেনারি বা বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি পাঁচ কোচের ১৬ সেট ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) সংগ্রহ এবং জয়দেবপুরে রক্ষণাবেক্ষণ কারখানা নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত। অর্থাৎ এটি শুধু কয়েকটি বৈদ্যুতিক ট্রেন কেনার প্রকল্প নয়; ট্রেন, বৈদ্যুতিক লাইন, রক্ষণাবেক্ষণ কারখানা ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো মিলিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য একটি নতুন ট্র্যাকশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ।
তবে এখানেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। ৫২ কিলোমিটার রেলপথে বৈদ্যুতিক অবকাঠামো নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে প্রকৃত ব্যয় কত? ১৬ সেট ইএমইউর ক্রয়মূল্য কত? ওয়ার্কশপ, বৈদ্যুতিক অবকাঠামো ও অন্যান্য ব্যবস্থার পেছনে কত অর্থ যাচ্ছে? ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থা চট্টগ্রামসহ অন্যান্য ব্যস্ত রুটে সম্প্রসারণের সুযোগ কতটা রাখা হয়েছে?
তিন-চতুর্থাংশ অর্থই বৈদেশিক ঋণ
প্রকল্পটির আর্থিক কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। মোট তিন হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকার মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৯৪২ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং এডিবি ও ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) থেকে প্রকল্প ঋণ হিসেবে দুই হাজার ৮৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা জোগানের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশই বৈদেশিক ঋণনির্ভর।
ইলেকট্রিক ট্রেন প্রকল্প একনজরে
* মোট ব্যয় : ৩,৮২২.৫১ কোটি টাকা
* সরকারি অর্থায়ন : ৯৪২.০৯ কোটি টাকা
* বৈদেশিক ঋণ : ২,৮৮০.৪২ কোটি টাকা
* বৈদ্যুতিক রেলপথ : ৫২.৩২ কিলোমিটার
* ইএমইউ : ১৬ সেট
* প্রতি সেটে কোচ : ৫টি
* রক্ষণাবেক্ষণ কারখানা : জয়দেবপুর
এখানে প্রকল্পের মূল ব্যয়ের পাশাপাশি ঋণের সুদ, মুদ্রা বিনিময় ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও হিসাবের মধ্যে রাখা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ থাকবে তো?
বৈদ্যুতিক রেলকে পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী পরিবহন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু বৈদ্যুতিক রেলের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর।
ট্রেন চলাচলের পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা কত হবে? রেলের জন্য আলাদা সাবস্টেশন বা নির্দিষ্ট সরবরাহব্যবস্থা থাকবে কি না? জাতীয় গ্রিডে সঙ্কট দেখা দিলে ট্রেন চলাচল কিভাবে সচল রাখা হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই স্পষ্ট হওয়া দরকার।
একইভাবে শুধু ডিজেলের ব্যয় কমলেই বৈদ্যুতিক রেল অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী হয়ে যায় না। বিদ্যুৎ খরচ, ট্র্যাকশন অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ, ওভারহেড লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ, ইএমইউর মেরামত এবং নতুন কারিগরি জনবল- সব মিলিয়ে জীবনচক্রের মোট ব্যয় কত দাঁড়াবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
একদিনে তিন মেট্রোরেল
বৈদ্যুতিক ট্রেনের পাশাপাশি একই একনেক সভায় অনুমোদিত হয়েছে এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুট, এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুট। এর মধ্যে সাউদার্ন রুট নতুন প্রকল্প; অপর দু’টি সংশোধিত প্রকল্প। বর্তমান হিসাবে এমআরটি লাইন-১-এর ব্যয় প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা, লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের ব্যয় প্রায় ৮৯ হাজার ৮০০ কোটি এবং সাউদার্ন রুটের ব্যয় ৪৫ হাজার ৫০৩.৭৭ কোটি টাকা। ফলে তিন প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।
এত বিপুল বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশ্ন শুধু প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; বরং এগুলো পরস্পরের সাথে কতটা সমন্বিত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাস, প্রচলিত রেল, মেট্রোরেল, সড়ক, নৌপথ ও অন্যান্য গণপরিবহনকে একীভূত করে একটি কার্যকর নগর পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে- তার উত্তর প্রয়োজন।
ব্যয় বাড়ার অভিজ্ঞতা
মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। এমআরটি লাইন-১-এর প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা; সংশোধিত ব্যয় প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা, যা এখন প্রায় ৮৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, কর ও নকশা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণ ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সংশ্লিষ্ট বলে সরকারি পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। কিন্তু এখানেই প্রকল্প ব্যবস্থাপনার বড় প্রশ্ন- প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির সময় দীর্ঘ বাস্তবায়নকাল, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য নকশা পরিবর্তন কতটা বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল?
প্রকল্পের ব্যয় একবার দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়ে গেলে তার অর্থ শুধু অতিরিক্ত নির্মাণ ব্যয় নয়; এর সাথে বাড়ে ঋণের পরিমাণ, সুদের দায় এবং ভবিষ্যৎ বাজেটের চাপও।
সাউদার্ন রুটে ইতিবাচক রিটার্নের পূর্বাভাস
এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুটের বর্তমান ব্যয় ৪৫ হাজার ৫০৩.৭৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটির ব্যয় কয়েক দফা পর্যালোচনার পর কমানো হয়েছে। ফিজিবিলিটি স্টাডিতে প্রকল্পটিকে কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে সম্ভাব্য বলা হয়েছে। ১২ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেট ধরে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে নিট বর্তমান মূল্য (এনপিভি) ৩৫ হাজার ১৬১ কোটি টাকা, বেনিফিট-কস্ট রেশিও (বিসিআর) ২.৪১ এবং অভ্যন্তরীণ রিটার্ন হার (আইআরআর) ১৮.৮ শতাংশ ধরা হয়েছে।
তবে এগুলো প্রকল্পের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক রিটার্নের হিসাব, বাস্তবায়নের পর অর্জিত রিটার্ন নয়। যাত্রীসংখ্যা, ভাড়া, পরিচালন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়কাল- সবকিছুর ওপর প্রকৃত ফল নির্ভর করবে।
রেল কি শুধু ট্রেন কেনা?
ইলেকট্রিক ট্রেন প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। ১৬ সেট ইএমইউ সংগ্রহ করলেই রেলব্যবস্থার সক্ষমতা কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়বে না। ট্র্যাকের ধারণক্ষমতা, সিগন্যালিং, স্টেশন সক্ষমতা, লেভেল ক্রসিং ব্যবস্থাপনা, সময়সূচি, ডিপো, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং রক্ষণাবেক্ষণ- সবকিছুকে একই সাথে আধুনিক করতে হবে।
বিশেষ করে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর করিডোরে বিদ্যমান অবকাঠামোর প্রতিবন্ধকতা যদি বহাল থাকে, তাহলে শুধু ডিজেলচালিত ট্রেনের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করলেই যাত্রী পরিবহনের সামগ্রিক সক্ষমতা কতটা বাড়বে, সেটি একটি মৌলিক প্রশ্ন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিদ্যমান লোকোমোটিভ সঙ্কট ও মেরামত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার খবরও সাম্প্রতিক সময়ে এসেছে। ফলে নতুন প্রযুক্তির সাথে নতুন রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলা কতটা জরুরি, সেটিও প্রকল্প মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত।
বিনিয়োগের প্রকৃত পরীক্ষা
মেট্রোরেল ও বৈদ্যুতিক রেল- দুই ধরনের প্রকল্পই বাংলাদেশের পরিবহনব্যবস্থাকে আধুনিক করার সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয় করলেই উন্নত পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত হয় না।
প্রথম পরীক্ষা হবে- প্রকল্পের জীবনচক্র ব্যয় কত? দ্বিতীয়ত- বৈদেশিক ঋণের মূল ও সুদসহ প্রকৃত আর্থিক দায় কত? তৃতীয়ত- একাধিক মেট্রোরেল ও জাতীয় রেলকে কি একটি সমন্বিত পরিবহন নেটওয়ার্কে যুক্ত করা সম্ভব হবে?
শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের সাফল্যের মাপকাঠি হবে না শুধু কত কিলোমিটার লাইন নির্মিত হলো বা কতটি ট্রেন কেনা হলো। বরং একজন সাধারণ যাত্রী কত কম সময়ে, কত কম খরচে, কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারছেন- সেটিই হবে এই বিপুল বিনিয়োগের সবচেয়ে বাস্তব পরীক্ষা।
একনেকের অনুমোদন প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা মাত্র। প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো বাস্তবায়ন, ঋণের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত যাত্রীর জন্য কার্যকর, সাশ্রয়ী ও সমন্বিত গণপরিবহন নিশ্চিত হওয়ার মাধ্যমে।
ব্যয় তুলনার জন্য শক্তিশালী কাঠামো
তিন মেট্রোরেল প্রকল্পে মোট প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বুঝতে হলে শুধু বর্তমান ব্যয়ের অঙ্ক দেখলে হবে না; দেখতে হবে প্রকল্পগুলোর প্রাথমিক ব্যয় বনাম সংশোধিত ব্যয়। এই তুলনাতেই উঠে আসে ব্যয় পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। সংশোধিত হিসাবে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬১ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা- প্রাথমিক অনুমানের চেয়ে প্রায় ১১৭ শতাংশ বেশি।
এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুটেও একই ধরনের চিত্র। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ৪৮ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা, যা প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১১৮ শতাংশ বেশি।
দু’টি প্রকল্পের ক্ষেত্রেই অর্থাৎ প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এই অঙ্কটি নিজেই একটি স্বতন্ত্র প্রশ্ন তৈরি করে- প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির সময় এত বড় ব্যয়ের ঝুঁকি কেন যথাযথভাবে ধরা পড়েনি?
অবশ্য ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে ডলারের বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি, কর ও শুল্ক পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রকল্পের নকশা বা বাস্তবায়ন কাঠামোর পরিবর্তনের মতো কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সেখানেই প্রকল্প মূল্যায়নের আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। দীর্ঘমেয়াদি মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকি কি শুরুতেই পর্যাপ্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল?
সাউদার্ন রুটে ভিন্ন চিত্র
এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুটের ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। প্রকল্পটির সর্বশেষ ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩.৭৭ কোটি টাকা। এর আগের পর্যায়ে প্রস্তাবিত ব্যয় ছিল ৪৭ হাজার ৬৪৪.৮১ কোটি টাকা; তারও আগে ৪৭ হাজার ৭২১.৪৪ কোটি এবং ৫৪ হাজার ৬১৮.৯৬ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের প্রস্তাব ছিল। অর্থাৎ এই প্রকল্পে একাধিকবার পর্যালোচনার পর ব্যয় কমানো হয়েছে। এটি ইতিবাচক ব্যয়-সংযমের উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু একই সাথে প্রশ্ন থাকে- একটি মেগা প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণে কেন এতগুলো পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন হলো?
এখানে প্রকল্পের ব্যয় কমার বিষয়টির পাশাপাশি প্রকল্পের আওতা, নকশা, স্টেশন সংখ্যা, রুটের দৈর্ঘ্য, নির্মাণপদ্ধতি এবং বৈদেশিক ঋণের শর্ত কিভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিন মেট্রোরেলের সাথে বৈদ্যুতিক রেলের তুলনা
এই বিপুল অঙ্কের বিপরীতে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর ৫২.৩২ কিলোমিটার রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৮২২.৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মেট্রোরেলে যেখানে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা, সেখানে জাতীয় রেলওয়ের ৫২.৩২ কিলোমিটার অংশ বৈদ্যুতিকীকরণ, ১৬ সেট ইএমইউ এবং জয়দেবপুরে রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামোর জন্য ব্যয় তিন হাজার ৮২২.৫১ কোটি টাকা।
তবে এই দুই অঙ্ককে সরাসরি ‘একই ধরনের প্রকল্পের ইউনিট কস্ট’ হিসেবে তুলনা করা যাবে না। মেট্রোরেলের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক মনো ও পাতাল অবকাঠামো, স্টেশন, ডিপো, সিগন্যালিং ও অন্যান্য নগর অবকাঠামো; অন্যদিকে বৈদ্যুতিক রেল প্রকল্পের বড় অংশ বিদ্যমান রেলপথের ওপর বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা স্থাপন ও রোলিং স্টক সংগ্রহকেন্দ্রিক।
তবু তুলনাটি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে- বাংলাদেশের পরিবহন খাতে বিনিয়োগের অগ্রাধিকার কি শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, নাকি বিদ্যমান রেল অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়িয়েও একই ধরনের যাত্রী পরিবহন সুবিধা তৈরি করা সম্ভব?
ঋণের অঙ্কও তুলনার বাইরে রাখা যাবে না
বৈদ্যুতিক রেল প্রকল্পের তিন হাজার ৮২২.৫১ কোটি টাকার মধ্যে দুই হাজার ৮৮০.৪২ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ বিদেশী ঋণনির্ভর। তাই প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণে শুধু ‘কত টাকা খরচ হচ্ছে’ প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। জানতে হবে- কত টাকা ঋণ, কী শর্তে ঋণ, সুদ ও অন্যান্য চার্জ কত, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা কত এবং প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় বা অর্থনৈতিক সুবিধা সেই দায়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। বড় প্রকল্পের ব্যয় যখন প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, তখন অতিরিক্ত অর্থের উৎস, বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ এবং ভবিষ্যৎ ঋণসেবা ব্যয় আলাদা করে হিসাব করা জরুরি।
কোয়ালিটি সেবা প্রদানে বদ্ধপরিকর সরকার : প্রতিমন্ত্রী
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধান গুরুত্বের জায়গা হচ্ছে যে আমরা বিপুল অর্থ ব্যয় করছি। এই কোয়ালিটি সার্ভিসটা মেইনটেইন করার ক্ষেত্রেও যারা অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান এবং যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান তাদেরকে এখানে একটা কমপ্লায়েন্সে আনা হবে। আন্ডারগ্রাউন্ড জায়গা আছে যেটা হিসাবটা আগে ধরা হয়নি। ঝুঁকি যতটুকু আন্ডারগ্রাউন্ড আছে সেই আন্ডারগ্রাউন্ডের উপরে যে আমাদের স্থাপনা বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে অফিস বিল্ডিং রাস্তাঘাট সব কিছু ওইখানে যদি কোনো অংশে ফাটল ধরে কোনো কিছু ঘটনা হয় তা হলে এসব প্রতিষ্ঠান কিন্তু সেটার ক্ষতিপূরণ শুধু না ওটার রিপেয়ারমেন্ট থেকে সমান সব কিছু দায় নেবে। এটি তিন বছরব্যাপী এই জিনিসটা তাদের থাকবে। 
সেপ্টেম্বরের পর সুদহার পরিবর্তন হবে : সাকি 
প্রতিমন্ত্রী সাকি বলেন, বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিকভাবে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সব দেশ পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারণ করার জন্য সচেষ্ট অঙ্গীকারবদ্ধ। জাপানের সাথে যে সরকারের দীর্ঘদিনের মানে বাংলাদেশের নানা প্রকল্প নানা যে সহায়তা এবং ইতোমধ্যে বহু ক্ষেত্রে চলমান যেসব প্রকল্প আছে এটি তো একটা পারস্পরিক দীর্ঘকালের সম্পর্কের একটা প্রক্রিয়া। যখন চলমান একটা প্রকল্পে যখন আপনি ঢুকে পড়েন, তখন সেই প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়াটাও কিন্তু খুব সহজ হয় না। এর মধ্যে অনেক আর্বিট্রেশন অনেক কিছুর ঝুঁকি তৈরি হয়। সেগুলোর প্রভাব সে জায়গায় পড়ে। ফলে সরকার যখন একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন তার মধ্যে একটা ধারাবাহিকতার প্রশ্ন থাকে। তিনি বলেন, যে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই সরকারকে রাজনৈতিকভাবে আপনি যতই গণবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করেন তার বিচার করেন, সেটিতে একটা অবস্থা। যেটা আমরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। কিন্তু সরকার হিসেবে যেসব সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিকভাবে নেয়া হয়েছে, সেগুলোর আবার কতগুলো আন্তর্জাতিক বিধিবিধান আছে। সেই বিধিবিধানকে বিবেচনায় তো নিশ্চিত করতে হয়। 
তিনি বলেন, এই সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে যদি আমরা যে চুক্তিটা আশা করতেছি ৩.০৫ জায়গার সাথে এটি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একটা। এটি যদি অক্টোবরে যায় তাহলে অক্টোবর থেকে আবার হবে ৩.৫০ শতাংশ। আমাদের স্বার্থে এই কারণে একই মিটিংয়ে এই দুটো উঠিয়েছে। 
সচিব জানান, এখানে এডিবির সুদের হার ৩.৮ শতাংশ থেকে মানে এর সাথে আরো একটা যুক্ত হবে প্রায় ফাইভ এ পৌঁছাবে। ৪.৩৩ শতাংশ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ক্ষেত্রে। তিনি বলেন তারা রিভাইজ করছে। তাদের এই বিদ্যমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে তারাও সুদের হার রিভাইজ করবে। এখানে এই নেগোসিয়েশনটা কমপ্লিট হওয়ার পরে প্রক্রিয়াটা শুরু হবে।  
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইনে খরচ দ্বিগুণ 
চার হাজার ৬৬৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ে ‘বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ (১ম সংশোধিত)’। প্রকল্পটি ২০১৮ সালে পাঁচ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুনে সমাপ্ত করার কথা ছিল। কিন্তু অগ্রগতি ঢিমেতালে। এখন ব্যয় চার হাজার ৬৬৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি ২৯ হাজার টাকা করা হয়েছে। আগামী ২০৩০ সালে প্রকল্পটি সমাপ্ত করতে হবে। 
খরচ বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলছেন, আগে কোনোমতে একটা ব্যয় দেখিয়ে প্রকল্প অনুমোদন করা হতো। পরে যখন বিস্তারিত সমীক্ষা করা হয় তখন দেখা যায় কাজের নকশার পরিবর্তন। আর তখন খরচ বাড়ে। এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে সেটিই হয়েছে।