
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়ায় মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এশিয়ার শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল, জাপানের টোকিও ও তাইওয়ানের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বেশি পতন দেখা গেছে।
এদিকে, গুরুত্বপূর্ণ করপোরেট আয় প্রতিবেদন ও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে ব্যাপক বিক্রির চাপের মধ্যে এ দরপতন ঘটে। এর ফলে তেলের দাম কমার বিষয়টিও বাজারের উদ্বেগ প্রশমিত করতে পারেনি। ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবে হামলা জোরদার করায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। এতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারসূচক কসপি ৬ শতাংশের বেশি কমেছে। চীনের সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠান সিএক্সএমটি মেমোরি চিপের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর নতুন প্রযুক্তিতে অগ্রগতি অর্জন করেছে— এমন খবরের পর দেশটির চিপ নির্মাতা জায়ান্ট এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাংয়ের শেয়ারে বড় দরপতন ঘটে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি সার্ভার মেমোরির একটি পণ্য চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে সিএক্সএমটি।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান পেপারস্টোনের বিশ্লেষক ক্রিস ওয়েস্টন বলেন, ‘এআই মডেল, মানবসদৃশ রোবট, মেমোরি চিপসহ প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীন মার্কিন কোম্পানিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতার ব্যবধান ক্রমেই কমিয়ে আনছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘কম খরচে ক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক পণ্য তৈরি করার সক্ষমতা বাজারের অংশীদারত্ব, মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা ও মুনাফার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।’
জাপানের শেয়ারবাজারেও বড় দরপতন হয়েছে। দেশটির প্রধান সূচক নিক্কেই ২২৫ প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে। চিপ নির্মাতা কিওক্সিয়ার শেয়ারের দাম ১২ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সময়ে টোকিও ইলেকট্রন ও অ্যাডভানটেস্টের শেয়ারের দাম কমেছে ৬ শতাংশেরও বেশি।
তাইওয়ানের প্রধান চিপ নির্মাতা টিএসএমসির শেয়ারের দাম ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমায় তাইপের শেয়ারবাজারের সূচক ২ শতাংশের বেশি নেমে যায়।
এছাড়া হংকং, সাংহাই, সিডনি, ওয়েলিংটন ও ম্যানিলার শেয়ারবাজারেও উল্লেখযোগ্য দরপতন হয়েছে।
গ্রীষ্মকালে বড় ধরনের দরপতনে বিশ্ববাজার থেকে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য হারিয়ে যাওয়ার পর বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাত ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। তখন শেয়ারের উচ্চমূল্য ও বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে কোম্পানিগুলো কখন পর্যাপ্ত আয় করতে পারবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
এর আগে, নিউইয়র্কের শেয়ারবাজারেও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ দেখা যায়। সেখানে স্যানডিস্কের শেয়ারের দাম ৬ শতাংশ ও মাইক্রন টেকনোলজির শেয়ারের দাম ৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমে।
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে ব্রডকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হক ট্যানের মন্তব্য। তিনি এআই খাতে বিনিয়োগকারীদের সাম্প্রতিক উন্মাদনাকে জুয়া খেলার সাথে তুলনা করেছেন।
ট্যান বলেন, ‘অনেক বিনিয়োগকারীই জানেন না, তারা আসলে কিসে বিনিয়োগ করছেন।’
তার ভাষায়, বিনিয়োগকারীরা অত্যন্ত উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি করছেন, কিন্তু পরে বুঝতে পারছেন যে তারা যেন ক্যাসিনোতে বাজি ধরেছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এআই শিল্প এখনো টেকসই ব্যবসায়িক মডেল খুঁজে পায়নি।
চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের বিপুল অঙ্কের লোকসানের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
ট্যান বলেন, ‘প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে বিপুল অর্থ ব্যয় করায় প্রতিষ্ঠানটি এখনো লোকসান করছে। তাই এই মুহূর্তে এটি শুধু এটাই বোঝায় যে উন্নত প্রজন্মের এআই মডেল সরবরাহের মাধ্যমে আয়ের প্রবৃদ্ধির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।’
সেপ্টেম্বরে ওপেনএআইয়ের বার্ষিকীকৃত আয় ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর তথ্য থেকে ব্যবসায়িক মডেলটির কার্যকারিতার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সাফল্য নিশ্চিত নয়।
পেপারস্টোনের বিশ্লেষক ওয়েস্টন বলেন, ‘এআই অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এখন বিনিয়োগকারীদের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বিপুল মূলধন ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা ও ভবিষ্যতে বিনিয়োগের বিপরীতে কী পরিমাণ আয় আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।’
চলতি মাস ও আগামী মাসে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আয় প্রতিবেদন প্রকাশের দিকে নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা। ঋণ নেয়ার ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারের সাম্প্রতিক অস্থিরতার মধ্যে এআই খাতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে এসব প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বিনিয়োগকারীরা। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হাউছিদের ধারাবাহিক হামলার পর সোমবার রাতে শহরটিতে কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এসব হামলায় কমপক্ষে ১৮ জন নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সোমবার হাউছি বিদ্রোহীদের এক কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইয়েমেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়লে ওয়াশিংটনকে ‘যন্ত্রণাদায়ক জবাব’ দেয়া হবে।
এর আগে সৌদি আরব হাউছিদের মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়।
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে ইরান-সমর্থিত হাউছিদের বিরুদ্ধে দেশটির সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট।
বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে গত জুলাইয়ে ইয়েমেনে যুদ্ধ নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠে। এতে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কট আরো গভীর হয়েছে।
হাউছিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও পরিবহনকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। বিশ্বের শীর্ষ তেল রফতানিকারক দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর এসব হামলা বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
তবে মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের প্রধান দুই ধরনের দামই ১ শতাংশের বেশি কমেছে। যদিও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে রয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ বজায় রাখছে।
সূত্র : বাসস
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








