
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে বিস্তীর্ণ ঘাসভূমিকে নিজেদের আবাস বলে জানেন, সেখানে এখন গড়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি প্রযুক্তি উদ্যোগের বড় প্রকল্প। আর সেই প্রকল্পের কারণে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ফিলিপাইনের আদিবাসী নেতা পেত্রোনিলা মুনোজ।
তার ভাষ্য, পর্যাপ্ত তথ্য না দেয়া এবং আগে থেকে কোনো পরামর্শ না করার কারণে তার নেতৃত্বাধীন আয়েতা হুনগেই আদিবাসী জনগোষ্ঠী জানে না, তাদের কতটুকু জমি প্রকল্পের আওতায় পড়বে কিংবা ওই জমির ওপর নির্ভরশীল জীবিকা ও ভবিষ্যতের কী হবে।
আদিবাসী গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী সভাস্থলে মুনোজ বলেন, এখনো বিষয়টি পরিষ্কার নয়। আমাদের কী হবে- এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে, ফিলিপাইন ‘প্যাক্স সিলিকা’ নামের একটি উদ্যোগে যোগ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সেমিকন্ডাক্টর ও বিরল মৃত্তিকা খনিজের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো।
এই উদ্যোগের আওতায় ফিলিপাইন রাজধানী ম্যানিলার উত্তরে তারলাক প্রদেশের নিউ ক্লার্ক সিটিতে এক হাজার ৬২০ হেক্টর (প্রায় চার হাজার একর) জমি নির্ধারণ করেছে। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ডেটা সেন্টারে ব্যবহারের জন্য উচ্চমানের যন্ত্রাংশ তৈরির একটি শিল্পকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফিলিপাইন সরকার ধারণা করছে, এই উদ্যোগে সর্বোচ্চ ৭০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আসতে পারে এবং প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
৩০ লাখেরও বেশি বেকার মানুষের দেশে এটি অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতি আনতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগবে এবং এখনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে সেখানে জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়নি।
দেশের নিজস্ব খনিজ সম্পদ প্রক্রিয়াজাত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে আরো সময় লাগতে পারে। কিন্তু প্রায় এক হাজার আয়েতা জনগোষ্ঠীর জন্য সম্ভাব্য উচ্ছেদের আশঙ্কা ইতোমধ্যেই বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে।
গত জুলাইয়ে তারা বেসেস কনভার্সন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিসিডিএ) থেকে একটি চিঠি পায়। সেখানে বলা হয়, প্রকল্পটি তাদের দখলে থাকা জমির ওপর ‘প্রভাব ফেলতে পারে’।
মুনোজ বলেন, বিসিডিএর কর্মকর্তারা তাদের সাথে দেখা করে জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের বর্তমান আবাস ছেড়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরের একটি এলাকায় চলে যেতে হবে।
কিন্তু তাদের পূর্বপুরুষদের জমির কোন কোন অংশ প্রকল্পের আওতায় পড়বে, তা দেখানো কোনো বিস্তারিত পরিকল্পনা তাদের দেয়া হয়নি।
মুনোজের দাবি, বিসিডিএ তাদের জমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে মাত্র ৩০ পেসো (প্রায় ৪৮ সেন্ট) দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে গোষ্ঠীর সবাই সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মুনোজ বলেন, ‘আমাদের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতি এই পূর্বপুরুষদের জমির সাথে জড়িয়ে আছে। জমিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। টাকা একসময় শেষ হয়ে যায়।’
আয়েতা জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি নিয়ে নির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব দিতে বিসিডিএ অস্বীকৃতি জানিয়েছে। প্রকল্প এলাকার সরকারি সীমানার মানচিত্র ও ভৌগোলিক তথ্য চেয়ে করা তথ্য অধিকার আবেদনেরও অনুমোদন দেয়া হয়নি।
সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রকল্প-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এসব তথ্য ‘সাময়িকভাবে গোপন রাখা হচ্ছে’।
গত মাসে সিনেটের এক শুনানিতে বিসিডিএর প্রেসিডেন্ট জোশুয়া বিংক্যাং বলেন, আয়েতা জনগোষ্ঠী যে জমিতে বসবাস করছে, সেটি সরকারি জমি। ফিলিপাইনের অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মতো তাদেরও ওই জমির মালিকানার কোনো সরকারি দলিল নেই।
নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনও প্রকল্পটির পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে পানি ও বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ ফিলিপাইন দীর্ঘদিন ধরে খরা এবং বিভিন্ন এলাকায় পালাক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার সমস্যায় ভুগছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর বার্তাসংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, প্রকল্পের নকশা তৈরির সময় পরিবেশ, পানি, জ্বালানি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন সমীক্ষার ফল বিবেচনা করা হবে।
দফতরের এক মুখপাত্র বলেন, ‘কোনো বড় ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প শুরুর আগে আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে কঠোর মূল্যায়ন করা হবে।’
বিংক্যাং সিনেটকে জানিয়েছেন, প্রকল্পে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
সরবরাহব্যবস্থা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়ে কাজ করা একটি এআই প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক আলভিন কাম্বা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফিলিপাইনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যুৎসংক্রান্ত উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীদের দেশটিতে কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করতে পারে।
গত মাসে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াশিংটন এমন দেশগুলোকে সতর্ক করার পরিকল্পনা করছে, যারা বেইজিং-সমর্থিত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী কাঠামোতে যোগ দেবে। এতে তারা প্যাক্স সিলিকা থেকে বাদ পড়তে পারে।
কাম্বা এএফপিকে বলেন, ‘এখানেই ফিলিপাইনের সুবিধাটা আসে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনা পুঁজির প্রভাব সবচেয়ে কম এমন দেশগুলোর একটি ফিলিপাইন।’
তার মতে, এর ফলে বিদেশী কোম্পানিগুলোর জন্য চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফিলিপাইনে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ক্যালিক্সতো চিকিয়ামকো প্যাক্স সিলিকাকে ফিলিপাইনের জন্য ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন।
তার মতে, এর মাধ্যমে দেশটি শুধু মাইক্রোচিপ পরীক্ষা ও প্যাকেজিংয়ের মতো প্রচলিত কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরো উন্নত প্রযুক্তি খাতে যেতে পারে।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘প্রযুক্তি যাতে ফিলিপাইনে স্থানান্তরিত হয়, সে জন্য আমাদের বিদেশী বিনিয়োগের জন্য আরো উন্মুক্ত হতে হবে।’
সূত্র : বাসস







