বিক্ষোভ
প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরে সমবেত বিক্ষোভকারীরা। নয়া দিগন্ত

ইউরোপজুড়ে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সঙ্কট, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে বড় ধরনের গণআন্দোলনের প্রস্তুতি চলছে। এ লক্ষ্যে ইউরোপের সাতটি দেশের শ্রমিক সংগঠন, নাগরিক অধিকারকর্মী ও আবাসন অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন আগামী ২০, ২১ ও ২২ নভেম্বর একযোগে বিক্ষোভ কর্মসূচী পালনের ঘোষণা দিয়েছে। 

Advertisement

ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, যুক্তরাজ্য, পর্তুগাল, গ্রিস ও বেলজিয়ামের সংগঠনগুলো এই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, তিন দিনের এই সমন্বিত কর্মসূচীতে ইউরোপের বিভিন্ন শহরের রাজপথে কয়েক মিলিয়ন মানুষ সমবেত হবেন।

ফরাসি গণমাধ্যম ‘ল‍্য মোঁদ’ - এর সূত্র অনুযায়ী, গত ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার প্যারিসে সাত দেশের প্রতিনিধিদের এক বৈঠক শেষে এ কর্মসূচীর ঘোষণা দেয়া হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শ্রমিক ও নাগরিক সংগঠনগুলোর মধ্যে এই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগকে ব্যাপক পরিসরের একটি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি কোনো একটি দেশের বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; বরং এটি গোটা ইউরোপের সাধারণ মানুষের জীবনকে সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাই জাতীয় সীমানার বাইরে গিয়ে সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

Advertisement

স্পেনের ভাড়াটিয়া অধিকার সংগঠনগুলোর কনফেডারেশনের মুখপাত্র কারমে আরকারাজো, যিনি প্যারিসের বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগে ছিলেন- তিনি বলেন, ‘আমরা একসাথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তার মতে, সাধারণ মানুষের আবাসন, খাদ্য, জ্বালানি ও ন্যায্য মজুরির প্রশ্নে ইউরোপের সরকারগুলোর আরও কার্যকর ভূমিকা নেয়া জরুরি।

এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি হচ্ছে আবাসনের অধিকার নিশ্চিত করা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাড়ি ও ফ্ল্যাটের দাম এবং বাড়িভাড়া সাধারণ মানুষের আয়ের তুলনায় অনেক দ্রুত বেড়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য উপযুক্ত আবাসন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারকে আয়ের বড় অংশ বাড়িভাড়া ও আবাসন ব্যয়ে ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ, শিক্ষার্থী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষেরা এই সংকটে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আবাসনের দাম ৬০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। একই সময়ে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৬ দশমিক ৫ মিলিয়নের বেশি পরিবার তাদের মোট আয়ের ৪০ শতাংশেরও বেশি আবাসন খাতে ব্যয় করেছে। অর্থনীতিতে এই পরিস্থিতিকে অতিরিক্ত আবাসন ব্যয়ের চাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আন্দোলনকারীদের দাবি, আবাসনকে কেবল মুনাফা অর্জনের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। প্রত্যেক মানুষের নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ, আবাসন বাজারে কার্যকর সরকারি নজরদারি এবং সরকারি উদ্যোগে সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে।

আবাসন সঙ্কটের পাশাপাশি খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ সাধারণ মানুষের পারিবারিক বাজেটকে সংকুচিত করছে। শ্রমজীবী মানুষের অভিযোগ, আয় ও মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ছে না। ফলে মাসের শেষে অনেক পরিবারকে আর্থিক সঙ্কটে পড়তে হচ্ছে।

আন্দোলনকারীরা খাদ্য, আবাসন ও জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তাদের মতে, মৌলিক চাহিদার পণ্য ও সেবার মূল্য সম্পূর্ণভাবে বাজারের মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেয়া হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। তারা শ্রমিকদের মজুরি এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পেনশন বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আন্দোলনটি শুধু অর্থনৈতিক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক দাবি। আন্দোলনকারীরা ধনীদের ওপর অধিক হারে কর আরোপ, অভিবাসীদের বাদ না দিয়ে সবার জন্য কাজের অধিকার নিশ্চিত করা এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সামরিক পুনঃসস্ত্রীকরণ এবং প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির নীতির বিরোধিতা করেছেন তারা। 

তাদের দাবি, সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিবর্তে সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করা উচিত। একই সাথে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

ফ্রান্সের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনের সমন্বয়ক বেঞ্জামিন বল প্যারিসের বৈঠকে বলেন, ‘লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজপথে নামবে এবং দেখিয়ে দেবে যে জনগণই দেশ পরিচালনা করবে, বিলিয়নিয়াররা নয়।’ ফ্রান্সের শ্রমিক সংগঠন সিজিটি, সলিডেয়ার এবং আবাসন অধিকার সংগঠন ডিএএল এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

সাত দেশের এই আন্দোলনের পেছনে স্পেনের আবাসন সঙ্কট একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে এসেছে। গত সেপ্টেম্বরে মাদ্রিদে ৮৭ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত নারী মারিকারমেন আবাসকালকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদের জন্ম দেয়। উচ্ছেদের কয়েক দিন পর তার মৃত্যু সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করে। আবাসন অধিকার, বাড়িভাড়া এবং বয়স্ক মানুষের সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।

এই পরিস্থিতিতে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সমাজতান্ত্রিক নেতা পেদ্রো সানচেজ ২৯ নভেম্বর আগাম সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আবাসন ও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে দেশটির প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলো ১১ নভেম্বর সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। নির্বাচনের আগে শ্রমিক সংগঠনগুলোর এই কর্মসূচী দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

স্পেনের প্রতিবাদের প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী পর্তুগালেও। অক্টোবর মাসে রাজধানী লিসবন ও পোর্তো শহরের বিভিন্ন স্থানে আবাসন সঙ্কটের প্রতিবাদে অবস্থান কর্মসূচী ও অস্থায়ী শিবির গড়ে তোলেন আন্দোলনকারীরা। বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী আবাসনের অভাব নিয়ে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

এদিকে আগামী ২০ নভেম্বর জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধের দাবিতে ২০টি দেশের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ‘যুব ধর্মঘট’ কর্মসূচী পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। পর্তুগালের একটি শিক্ষার্থী সংগঠন এই আন্তর্জাতিক কর্মসূচীর সমন্বয় করছে। ফলে ইউরোপের শ্রমিক আন্দোলনের পাশাপাশি পরিবেশবাদী ও শিক্ষার্থী আন্দোলনও একই সময়ে নতুন গতি পেতে পারে।

ইউরোপের অন্যান্য দেশেও জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বাড়ছে। গ্রিসের বিভিন্ন শহরে ১০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। তাদের হাতে থাকা বিভিন্ন ব্যানারে গ্রিক ও ফরাসি ভাষায় লেখা ছিল, ‘জনগণের সংগ্রামেই আশা।’ জার্মানিতেও কয়েক দশ হাজার তরুণ বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচীতে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের আন্দোলনে অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলবায়ু সঙ্কট ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে।

ইতালিতে আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বন্দরশ্রমিক, ট্রাকচালক ও কৃষকরা। শ্রমিক সংগঠন ইউএসবি-এর প্রতিনিধি চিয়ারা কাপ্রেত্তি সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেছেন, সরকার কারও দাবির প্রতিই কার্যকর সাড়া দিচ্ছে না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পেশার মানুষের অসন্তোষ এখন একটি বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। গত ৩০ অক্টোবর ইউএসবির উদ্যোগে দেশটিতে সাধারণ ধর্মঘটও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ইউরোপের বিভিন্ন সরকার জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সমস্যা মোকাবিলায় যথেষ্ট কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বিশেষ করে আবাসন বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য, জ্বালানি ব্যয় এবং শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাব রয়েছে। 

তাদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বাজারের মুনাফা বৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। বরং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। একদিকে সম্পদশালী গোষ্ঠীর সম্পদ বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

এ কারণে আন্দোলনকারীরা শুধু সাময়িক আর্থিক সহায়তা নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, আবাসন, খাদ্য, জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়; এগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই এসব মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

আগামী ২০ থেকে ২২ নভেম্বরের সমন্বিত বিক্ষোভ ইউরোপের শ্রমিক, শিক্ষার্থী, কৃষক ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে। সাত দেশের সংগঠনগুলোর এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক কর্মসূচীর পথ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আবাসন সঙ্কট, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমিকদের মজুরি, পেনশন এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নে বিভিন্ন দেশের মানুষের দাবিগুলোকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে আয়োজকরা।

এখন দেখার বিষয়, নভেম্বরের শেষভাগে ইউরোপের রাজপথে এই সমন্বিত আন্দোলন কতটা ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো আন্দোলনকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।