
ফ্রান্সের প্যারিসের রাজপথ থেকে নোত্র-দামের প্রার্থনাস্থল-সর্বত্র এখন পোপ লিও চতুর্দশকে ঘিরে মানুষের উচ্ছ্বাস। ফ্রান্স সফরে এসে একের পর এক ধর্মীয়, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক কর্মসূচীতে অংশ ও ঐতিহাসিক নোত্র-দাম ক্যাথেড্রালে প্রার্থনা করেছেন ক্যাথলিক বিশ্বের এই ধর্মগুরু। তাকে স্বাগত জানাতে প্যারিস ও নোত্র-দামে জড়ো হয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হওয়া চার দিনের ফ্রান্স সফরের প্যারিস পর্বে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সাথে সাক্ষাৎ, ইউনেসকো সফর এবং তরুণদের সাথে স্টাদ দ্য ফ্রান্সে প্রার্থনা অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার কর্মসূচী ছিল।
প্যারিসে পৌঁছানোর পর থেকেই পোপকে ঘিরে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। তার যাত্রাপথে রাস্তার দুই পাশে নিরাপত্তাবেষ্টনীর পেছনে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। বিশেষ ‘গাড়িপোপমোবিলে’ চড়ে প্যারিসের পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় লিওঁ চতুর্দশ ভক্তদের দিকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। অনেকেই তাকে এক নজর দেখার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন। তার পোপমোবিল যাত্রাপথের একটি অংশ সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থেকে তাকে দেখার সুযোগ দেয়ার জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এই সফরের অন্যতম আবেগঘন দৃশ্য ছিল শিশু ও নবজাতকদের পোপের কাছে নিয়ে আসা। পোপের পথের পাশে অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানদের কোলে নিয়ে অপেক্ষা করেন, যাতে পোপ তাদের আশীর্বাদ করতে পারেন। প্যারিসে আসার আগেই এ ধরনের সাক্ষাতের প্রত্যাশা নিয়ে অনেক পরিবার প্রস্তুতি নিয়েছিল।
শিশুদের মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে প্রায় দুই বছর বয়সী অক্টাভের ঘটনা। জন্মের পর থেকে প্রায় ৭০০ দিন প্যারিসের নেকের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা শিশুটির জন্য পোপের সাথে দেখা করাই হয়ে ওঠে হাসপাতালের বাইরে তার প্রথম বিশেষ বের হওয়া। শুক্রবার নোত্র-দামের সামনে পোপ লিওঁ চতুর্দশ অক্টাভের সাথে দেখা করেন এবং তাকে আশীর্বাদ করেন। শিশুটির মা এই সাক্ষাৎকে অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
পোপের প্যারিস সফরের আরেকটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল নোত্র-দাম ক্যাথেড্রালে তার উপস্থিতি। ২০১৯ সালের অগ্নিকাণ্ডের পর পুনরায় খুলে দেয়া নোত্র-দামে এটি ছিল কোনো পোপের প্রথম সফর। সেখানে লিওঁ চতুর্দশ বিশপ, পুরোহিত, ডায়াকন, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও সেমিনারিয়ানদের উপস্থিতিতে সন্ধ্যার প্রার্থনা বা ভেসপারস পরিচালনা করেন।
প্যারিস সফরের পরদিন প্লাস দ্য লা কঁকর্দ ও শঁজেলিজে এলাকায় অনুষ্ঠিত হয় পোপের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে অংশ নেন। ভ্যাটিকান নিউজের হিসাবে, প্রায় সাত লাখ মানুষ এই উন্মুক্ত প্রার্থনা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন; কঁকর্দ থেকে প্লাস দ্য লেতোয়াল পর্যন্ত দীর্ঘ এলাকাজুড়ে মানুষ বড় পর্দায় অনুষ্ঠান অনুসরণ করেন।
কঁকর্দের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে লিওঁ চতুর্দশ মানুষের জীবনে অর্থ, আশা ও আধ্যাত্মিকতার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন। তার বক্তব্যে হতাশা ও আধ্যাত্মিক শূন্যতার মধ্যেও আশা ধরে রাখার আহ্বান উঠে আসে। তিনি খ্রিস্টীয় বিশ্বাসকে মানুষের অন্তর্গত তৃষ্ণা ও শান্তির সাথে যুক্ত করে বক্তব্য দেন।
প্যারিস সফর শেষ করে লিওঁ চতুর্দশ ফ্রান্সের অন্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মসূচীতে অংশ নিতে লুর্দ ও মেত্জের উদ্দেশে যাত্রা করেন। চার দিনের এই সফরে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াও তরুণ সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইউরোপ, শান্তি ও সামাজিক নানা বিষয় তার কর্মসূচীতে স্থান পেয়েছে।
লিওঁ চতুর্দশের প্যারিস সফর তাই শুধু একটি ধর্মীয় সফরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। নোত্র-দামের ঐতিহাসিক প্রার্থনা, পোপমোবিলে করে জনতার কাছাকাছি যাওয়া, শিশুদের আশীর্বাদ এবং কঁকর্দে বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ; সব মিলিয়ে ফ্রান্সের রাজধানীতে তার সফরটি হয়ে উঠেছে ব্যাপক জনআগ্রহের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।








