স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, রাজধানীর বিভিন্ন সংস্থা ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণেই নগর ব্যবস্থাপনায় কাক্সিক্ষত অগ্রগতি করা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী সমন্বিত ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘নগরের যেকোনো সমস্যার জন্য সবাই সিটি করপোরেশন বা প্রশাসককে দায়ী করেন। অথচ ট্রাফিক পুলিশ, ওয়াসা, রাজউক কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলো সিটি কর্পোরেশনের অধীন নয়। এসব প্রতিষ্ঠান একীভূত করে সিটি গভর্নমেন্ট গঠন করা গেলে শতভাগ না হলেও অন্তত ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।’
বুধবার (১৫ জুলাই) ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) আয়োজিত ‘নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: আমার-আপনার সকলের দায়িত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে বর্তমানে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সভা করতে হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের আহ্বানে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে বাধ্যতামূলকভাবে একত্র করা সম্ভব হয় না। ফলে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নগর ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা, সবুজায়ন, খাল-লেক পুনরুদ্ধার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক। গত চার বছর চার মাসে তিনি এসব বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ২০টি বৈঠক করেছেন এবং অনেক সময় নিজেই নগর পরিদর্শন করে সমস্যা চিহ্নিত করেছেন।
মীর শাহে আলম বলেন, পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তুলতে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। তিনি বলেন, ‘ডাস্টবিন থাকার পরও অনেকেই যত্রতত্র ময়লা ফেলেন। দীর্ঘদিনের এই অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সব জায়গা থেকেই পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি জানান, আগামী বছরের নতুন পাঠ্যপুস্তকে প্রাথমিক স্তর থেকেই পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নৈতিকতা ও সামাজিক আচরণ বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে সরকার একাধিক ওয়েস্ট টু এনার্জি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
তিনি জানান, আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে একটি চীনা কোম্পানির সাথে করা চুক্তির আওতায় ২০২৮ সালের জুলাই-আগস্টের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ৪৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিন বছর স্থগিত থাকার পর প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে প্রকল্পটির কার্যক্রম আবারো চালু হয়েছে।
তিনি বলেন, আমিনবাজারে বর্তমানে এক কোটি ২০ লাখ টনের বেশি বর্জ্য জমে আছে। এ বিপুল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিলকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব অর্থায়নে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, জৈব সার, মাছ ও মুরগির খাদ্য, প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি তেল এবং নির্মাণসামগ্রী তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।
তিনি বলেন, এ প্রকল্পে সরকারের কোনো বিনিয়োগ থাকবে না। বরং কোম্পানিটি জমি ব্যবহারের জন্য ভাড়া দেবে এবং বর্জ্য ব্যবহারের জন্য দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে প্রতি কেজিতে ১০ পয়সা পরিশোধ করবে।
তিনি জানান, এ প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনায় আগামীকাল স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে পরিবেশ, বিদ্যুৎ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ১০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে একটি উপস্থাপনাও করা হবে।
মীর শাহে আলম বলেন, গুলশান, বনানী, বারিধারা ও হাতিরঝিল এলাকার লেকগুলো দূষিত হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে সুয়ারেজ লাইনের মুখ সরাসরি লেকে গিয়ে পড়া।
তিনি বলেন, দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার (এসটিপি) দেশের সবচেয়ে বড় সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট হলেও সেখানে ঢাকা শহরের প্রয়োজনীয় সুয়ারেজ লাইন সংযুক্ত না হওয়ায় বর্তমানে এর সক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে।
তিনি জানান, গুলশান, বনানী, বারিধারা ও হাতিরঝিল এলাকার সুয়ারেজ লাইন দাশেরকান্দি প্ল্যান্টের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্ল্যান্টটির সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং খাল-লেকের দূষণও কমবে।
প্রতিমন্ত্রী অ্যাপার্টমেন্ট ভবনগুলোতে নিজস্ব ক্ষুদ্র সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এতে পরিশোধিত পানি বাগান পরিচর্যা, গাড়ি ধোয়া ও অন্যান্য কাজে পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে মালিকানা ও দায়িত্বের জটিলতা দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ধানমন্ডি লেক ৫০ বছরের জন্য দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। লেকটি খনন, সৌন্দর্যবর্ধন, আলোকসজ্জা ও জনবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। বাসস



