রুকন সম্মেলন, জামায়াতে ইসলামী, ডা: শফিকুর রহমান
ঢাকা মহানগরী উত্তরের জামায়াতের রুকন সম্মেলনের বক্তব্য প্রদান করছেন জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান (এমপি) বলেছেন, জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে, কিন্তু তা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। জনগণ আমাদের বলে, ভোট আপনাদের দিয়েছিলাম, কিন্তু আপনারা তা রক্ষা করতে পারলেন না। তখন আমাদের বলতে হয়, আমাদের দুর্বলতা ছিল।

Advertisement

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তরের রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 

এ সময় জামায়াত আমির আরো বলেন, আমাদের মূল টার্গেট হলো আল্লাহর জান্নাতে যাওয়া। আমি বিশ্বাস করি, যারা দিন আনে দিন খায়, আল্লাহর পথে তাদের অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ৭০ ভাগ মানুষ অংশগ্রহণ করেছে, যারা দিন আনে দিন খায়।

তিনি রুকনদের উদ্দেশে অতীত সময়ে সংগঠনের দায়িত্বশীলদের সংগঠন পরিচালনায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার বিষয়টি তুলে ধরেন। একইসাথে বর্তমান সময়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে নসিহতমূলক বক্তব্য দেন।

তিনি বলেন, আল্লাহ আমাদের যাদের সম্পদ দিয়েছেন, আমরা যেন তার নিয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা আদায় করি। জান্নাতের জন্য নিজেদের ঠিকানা তৈরি করতে হবে।

জামায়াত আমির কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে রুকনদের উদ্দেশে আলোচনা করেন। এ সময় তিনি মৃত্যু ও পরকালীন জীবন নিয়েও আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, আমার চেয়ে কে দুর্বল, তা জ্ঞান ও সম্পদের দিক থেকে বিবেচনা করতে হবে। মহান আল্লাহর দেয়া নিয়ামতের জন্য চোখের পানি ফেলে তার শুকরিয়া আদায় করতে হবে এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।

তিনি নবী ইবরাহিম আ: ও নবী ইসমাইল আ:-এর ওপর আল্লাহর পরীক্ষা এবং তাদের ত্যাগের বিষয়েও আলোচনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারব না। তাই প্রতি মুহূর্তে মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে।

একটি সার্থক জীবন গড়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার তাওফিক কামনা করে তিনি বলেন, মহান আল্লাহ যেন আমাদের সেই তাওফিক দান করেন।

ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণের অতীত সাংগঠনিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় দুই মহানগরীর অবস্থাই অনেক দুর্বল ছিল। আমাদের ভাই-বোনদের ত্যাগ, কোরবানি ও পরিশ্রমের মাধ্যমে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।

জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে, কিন্তু তা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। জনগণ আমাদের বলে, ভোট আপনাদের দিয়েছিলাম, কিন্তু আপনারা তা রক্ষা করতে পারলেন না। তখন আমাদদের বলতে হয়, আমাদের দুর্বলতা ছিল।

তিনি বলেন, আল্লাহর শুকরিয়া যে মানুষ তাদের এত ভালোবাসা দিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনে নিজেদের ভুলত্রুটি ও দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা গেছে। ভবিষ্যতে যেন একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।

আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যাদের প্রার্থী করা হয়েছে, তাদের মধ্যে আল্লাহর দেয়া জ্ঞানের বড় নিয়ামত রয়েছে। জনগণকে সাথে নিয়ে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে প্রাচীর গড়ে তুলতে হবে। কোনো চোরকে আর ছাড় দেয়া হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

‘আমরা থামবো না, আমাদের থামার সুযোগ নেই। সামনে সিটি নির্বাচনে আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে ও দিনরাত একাকার করে কাজ করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের ভুলগুলো নিয়ে পর্যালোচনা হয়েছে। এবার এগুলোর আলোকে কাজ করলে আশা করি আর ভুল হবে না,’ যোগ করেন জামায়াত আমির।

তিনি বলেন, এই দেশের জনগণই ঠিক করবে, দেশ কারা পরিচালনা করবে। 

সমাজ পরিবর্তনের গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আমরা বসে বসে আর তামাশা দেখব না। আমরা সংগতভাবেই প্রতিবাদ করব এবং যেখানে আমাদের সামর্থ্য হবে, সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।

তিনি আরো বলেন, এই দেশ কোরআনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ যেন তার রহমতের চাদরে আমাদের আবৃত রাখেন এবং আমাদের সহযোগিতা করেন।

আসন্ন নির্বাচনে সৎ, যোগ্য ও খোদাভীরু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করার জন্য তিনি রুকনদের প্রতি আহ্বান জানান। 

এ সময় তিনি ঢাকা মহানগরী উত্তরের উদ্যোগে তৈরি ‘নাগরিক সেবা’ নামের একটি অ্যাপ উদ্বোধন করেন। অ্যাপটিতে নাগরিকদের জন্য ৫০টিরও বেশি সেবামূলক সুবিধা পাওয়া যাবে বলে কর্তৃপক্ষ জানায়। 

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রুকনিয়াত কোনো পদ-পদবি নয়, এটি একটি মান। তাই এটিকে ক্ষমতা মনে করলে আমরা ভুল করব।

তিনি আরো বলেন, রুকনিয়াত হলো জীবনের নীতি-নৈতিকতার মান বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রুকন হিসেবে আমাদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। আমাদের মান-রূহানিয়াত যত শক্তিশালী হবে সংগঠন তত শক্তিশালী হবে। আগামীর মেয়র নির্বাচনে আমাদের শক্তিশালী ভূমিকা পালনের মাধ্যমে আমাদের ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রমাণ দিতে হবে। তাহলে আমরা মেয়র এবং কাউন্সিলর নির্বাচনে যথাযথ সফলতা অর্জন করতে পারবো।

ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, রুকন সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি আমাদের মানের দিক থেকেও ভালো, উন্নত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হবে। আমরা আস্থাভাজন নেতৃত্ব গড়ে তুলব। একইসাথে একটি মজবুত সংগঠন গড়ে তোলা হবে, ইনশাআল্লাহ।

সম্মেলন দুই ভাগে বিভক্ত ছিলো। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিট থেকে ১১টা পর্যন্ত নির্বাচনী সেশন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৭-২০২৮ সেশনের জন্য ঢাকা মহানগরী উত্তর আমির নির্বাচনে রুকনরা ভোট দেন। নির্বাচন পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন। তাকে সহায়তা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আ: সবুর ফকির। ১৩ সহস্রাধিক সদস্য (রুকন) এতে ভোট দেন।

সকাল ১১টা থেকে সাংগঠনিক সেশন অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও মহানগরীর সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান, বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এমপি। বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন ও নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি।