লিগ্যাল অফিসার
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটা ‘হিট’ বনাম ‘লিগ্যাল’ নয়। লেখক

আজ একটি প্রশ্ন চোখে পড়ল। সাংবাদিক মাকসুদ কামাল ভাই প্রশ্ন করেছেন— ‘লিগ্যাল অফিসার’ আর ‘হিট অফিসারের’ মধ্যে মিল বা অমিল কতটুকু?

প্রশ্নটি ছোট। কিন্তু এর মধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, পারিবারিক পরিচয়, যোগ্যতা এবং নিয়োগের ন্যায্যতা, চারটি বড় প্রশ্ন একসাথে এসে গেছে।

তাই উত্তরটাও শব্দ দিয়ে নয়, তথ্য দিয়ে খোঁজা যাক।

ব্যারিস্টার জাইমা রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা, এটি সত্য। কিন্তু তার আরেকটি পরিচয়ও সত্য। তিনি আইন নিয়ে পড়েছেন, আইন পেশার জন্য প্রশিক্ষিত হয়েছেন এবং আইন ও নীতিসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কাজ করেছেন।

জাতিসঙ্ঘের নিজস্ব ওয়েবসাইটে বর্তমানে তাকে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির কার্যালয়ের লিগ্যাল অফিসার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, একজন লিগ্যাল অফিসারের জন্য যে শিক্ষাগত ও পেশাগত ভিত্তি প্রত্যাশিত, জাইমা রহমানের সেটি আছে কি? 

তথ্যের দিকে তাকাই।

তিনি কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইন ও রাজনীতি বিষয়ে এলএলবি করেছেন। তিনি ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে যোগ্য ব্যারিস্টার ও ইনার টেম্পলের সদস্য। যুক্তরাজ্যে আবাসন, জনকল্যাণ ও কর্মসংস্থান আইন নিয়ে কাজ করেছেন। স্বাস্থ্য খাতে আইনি পরামর্শের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং সমাজকল্যাণ ও শিক্ষা আইন নিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে আইনি কাজও করেছেন।

বাংলাদেশেও তার আইনি কাজের অভিজ্ঞতা আছে। জাতিসঙ্ঘের প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, তিনি সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের সাথে সাংবিধানিক, করপোরেট ও বাণিজ্যিক আইন, সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং করসংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করেছেন।

অর্থাৎ পদের নাম ‘লিগ্যাল অফিসার’। তার শিক্ষা আইন, পেশাগত প্রশিক্ষণ আইন এবং পূর্ববর্তী কাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও আইন। এটি মতামত নয়, প্রকাশ্য নথিতে থাকা তথ্য।

এবার মাকসুদ কামাল ভাইয়ের প্রশ্নের দ্বিতীয় শব্দ- ‘হিট অফিসার’।

এখানে ইতিহাসটিও নির্ভুলভাবে বলা জরুরি। ২০২৩ সালে বুশরা আফরিনকে ঢাকার চিফ হিট অফিসার হিসেবে সামনে আনার পর তার পারিবারিক পরিচয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু সমসাময়িক তথ্য অনুযায়ী, পদটি ডিএনসিসির নিয়মিত সাংগঠনিক পদ ছিল না এবং তাকে সরাসরি ডিএনসিসি নিয়োগ দেয়নি। উদ্যোগটির সাথে আন্তর্জাতিক সংস্থা আর্শট রকফেলার ফাউন্ডেশন রেজিলিয়েন্স সেন্টার যুক্ত ছিল।

সুতরাং দুই ঘটনাকে শুধু দুই ব্যক্তির পারিবারিক পরিচয়ের ভিত্তিতে এক করে ফেললেও পূর্ণাঙ্গ ছবি পাওয়া যায় না।

জাইমা রহমানের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন করা অবশ্যই যাবে এবং করা উচিত। প্রধানমন্ত্রীর কন্যা কোনো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পেলে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠা গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক।

কিন্তু প্রশ্নের সাথে তথ্যটিও বলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব বাসসকে বলেছেন, জাইমা রহমানের ক্ষেত্রে জাতিসঙ্ঘের বিদ্যমান নিয়ম ও নিয়োগপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। প্রকাশ্য জাতিসঙ্ঘের নথিতে তার পদ, শিক্ষা ও পেশাগত অভিজ্ঞতাও উল্লেখ রয়েছে।

আর একটি বিষয় আমার কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

একজন প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হওয়া যেমন কোনো চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা নয়, তেমনি প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হওয়াটাই কোনো যোগ্য ব্যক্তির অযোগ্যতার প্রমাণ হতে পারে না।

একজন চিকিৎসকের সন্তান চিকিৎসাবিদ্যা পড়ে চিকিৎসক হলে আমরা প্রথমে তার ডিগ্রি দেখি। একজন প্রকৌশলীর সন্তান প্রকৌশলী হলে তার প্রকৌশল শিক্ষা দেখি। তাহলে একজন প্রধানমন্ত্রীর কন্যা কোনো পদে গেলে শুধু তার বাবার পরিচয় দিয়ে তার নিজের শিক্ষা ও পেশাগত অর্জনকে মুছে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

এখানেই আমাদের রাজনৈতিক আলোচনার একটি মৌলিক দুর্বলতা আছে। আমরা অনেক সময় ‘কে কার সন্তান’ এই প্রশ্নটি আগে করি; ‘তিনি নিজে কী অর্জন করেছেন’ এই প্রশ্নটি পরে করি।

জাইমা রহমানের পরিচয় থেকে তারেক রহমানের নাম সরিয়ে দিলে কী থাকে?

থাকে আইন ও রাজনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ব্যারিস্টার হিসেবে যোগ্যতা, যুক্তরাজ্যে আইনসংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশে সাংবিধানিক ও বাণিজ্যিক আইন নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা এবং এখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে আইনসংশ্লিষ্ট দায়িত্ব।

তাই মাকসুদ কামাল ভাইয়ের প্রশ্নের উত্তর আমি আরেকটি প্রশ্ন দিয়ে দিতে চাই।

‘লিগ্যাল অফিসার’ আর ‘হিট অফিসারের’ মধ্যে মিল খুঁজব কেন শুধু তাঁদের বাবার পরিচয়ে? পদের প্রকৃতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও নিয়োগপ্রক্রিয়ার মধ্যেও কি তুলনাটা করা উচিত নয়?

সাংবাদিকতার সৌন্দর্য প্রশ্নে। আর উত্তরের সৌন্দর্য তথ্যে।

রাজনীতিতে আত্মীয়তার পরিচয় অবশ্যই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু যোগ্যতাও যেন আত্মীয়তার পরিচয়ের নিচে চাপা না পড়ে।

কারণ ন্যায্যতার অর্থ শুধু ক্ষমতাবানের সন্তানকে বিশেষ সুবিধা না দেয়া নয়, যোগ্য হওয়ার পরও কেবল ক্ষমতাবানের সন্তান বলে কাউকে পূর্বধারণার কাঠগড়ায় না দাঁড় করানোও ন্যায্যতার অংশ।

শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটা ‘হিট’ বনাম ‘লিগ্যাল’ নয়।

প্রশ্নটা আরো গভীর।

আমরা কি একজন মানুষকে তার বংশপরিচয় দিয়ে বিচার করব, নাকি তার শিক্ষা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কাজ দিয়ে?

লেখক : প্রেসিডেন্ট, ব্রামা