একটি নির্মাণাধীন চার্চের ক্রুশ ভেঙে ফেলে 'হিন্দুত্ববাদী' দুষ্কৃতকারীরা
একটি নির্মাণাধীন চার্চের ক্রুশ ভেঙে ফেলে 'হিন্দুত্ববাদী' দুষ্কৃতকারীরা। সংগৃহীত ছবি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টান ধর্মের মানুষের ওপর একের পর এক হামলার অভিযোগ উঠছে। 

Advertisement

পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ায় এক খ্রিস্টান পরিবারের অভিযোগ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সদস্য বলে পরিচয় দেয়া একদল ব্যক্তি তাদের ওপর হামলা চালান এবং তাদের সরকারি পরিষেবা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার হুমকি দেন।

হামলায় আক্রান্ত পার্বতী হেমব্রম সোরেন জানান, পরিবারের সবাই মিলে গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে প্রার্থনা শুরু করতে যাচ্ছিলেন। সেই সময় ৩০ জনেরও বেশি ব্যক্তি মদ্যপ অবস্থায় তাদের বাড়িতে জোর করে ঢুকে পড়ে এবং হামলা করে।

তিনি বলেন, ‘চুলের মুঠি ধরে মেরেছে আমাকে। বলেছে আমাদের বাড়িতে থাকতে দেবে না। আমার স্বামীকে অকত্থ্য ভাষায় গালাগাল করছিল। আমাদের সাথে আমাদের আত্মীয়রাও ছিলেন, আমার ননদের গায়েও হাত তুলেছিল তারা। আমাদের ফোন ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিল।’

কয়েক দিন আগে দুর্গাপূজার সময় পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায় বজরং দলের সদস্য বলে পরিচয় দেয়া একদল ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক খ্রিস্টান পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছিল।

চলতি বছরের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ওপর একাধিক হামলার অভিযোগ উঠেছে। ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’ নামে একটি গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৩ মে থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজ্যের ১৩টি জেলায় খ্রিস্টানদের ওপর মোট ৬০টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

হামলার সময়ে কী ঘটেছিল?
পাঁশকুড়ার বাসিন্দা পার্বতীর দাবি, এই ‘দুষ্কৃতকারীরা’ এর আগেও তাদের পরিবারকে হুমকি দিয়েছিল। তার কথায়, গত ১১ অক্টোবর একই ব্যক্তিরা তাদের বাড়িতে এসে খ্রিস্টধর্ম পালন করার কারণে হুমকি দেন।

তিনি বলেন, ‘গতকাল রাতে ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে তারা মদ্যপান করে চোরের মতো আমাদের বাড়ি আসেন। এমন সময়ে এসেছে অন্ধকারে যে বাইরের লোক যে ভিডিও করবে সেটাও সম্ভব ছিল না। আমার মোবাইলে আমি ভিডিও করেছিলাম, সেটাও তারা আমার ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ডিলিট করে দিয়েছেন। অবশেষে পুলিশের থেকে আমি আমার ফোন ফেরত পেয়েছি।’

পার্বতী আরো বলেন, ‘তারা আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যাতে আমরা খ্রিস্টধর্ম ছেড়ে হিন্দু ধর্মে ফিরে আসি। আমরা ওদের বলেছি, আমরা নিজে থেকে খ্রিস্টান ধর্ম বেছে নিয়েছি, আমরা পালন করছি। তাই আমাদের মারধর করা হচ্ছে।’

‘বঙ্গীয় খ্রিস্ট্রীয় পরিষেবা’ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা হেরোদ মল্লিকের দাবি, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সংস্থার এক আইনজীবী অভিযোগকারীকে ফোন করেছিলেন। সেই ফোনালাপ চলাকালীনই আক্রমণকারীরা তার ফোন কেড়ে নেন।

তাদের বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ, ফোনে নিজেদের বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সদস্য বলে পরিচয় দিয়ে আইনজীবীকে হুমকি দেন তারা। আইনজীবীর সাথে কথা বলা হচ্ছে বুঝতে পেরে ফোনের সংযোগও কেটে দেন।

দুষ্কৃতকারীরা খ্রিস্টধর্মকে ‘আমেরিকান ধর্ম’ বলে উল্লেখ করে পরিবারটিকে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করতে বলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পার্বতী বলেন, ‘তারা আমাদের উঠোনে তুলসি মঞ্চ এবং মনসা মন্দির তৈরি করতে বাধ্য করছিল। আমরা তাদের বলেছিলাম, আমরা খ্রিস্টান, আমরা তা করব না। এখন তারা লোকজনকে আমাদের কাজ দিতে বারণ করছে। তারা আমাদের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ কেটে দেয়ার, রেশন এবং আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দিয়েছে। আমাদের কেউ যাতে সাহায্য না করে, তার জন্য সবাইকে হুমকি দিচ্ছে তারা।’

গতকাল রাতের ঘটনার সময়ে বাড়িতে ছিলেন অভিযোগকারী নারী, তার স্বামী এবং তাদের দুই ছোট সন্তান। এছাড়া তার তিনজন আত্মীয়ও সেখানে ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের আরাধনার স্থানটি পুড়িয়ে ফেলা হয়, ছিঁড়ে ফেলা হয়, আমাদের টেনে বের করে মারধর করা হয়। আমার ওপর হামলা করেছে, সাথে আমার ননদকেও চড়-থাপ্পড় মেরেছে। আমার স্বামীকে অনেক গালাগালি দিয়েছে।’

পার্বতী হেমব্রম আরো বলেন, ‘তারা আবার ফিরে এসে আমাদের ওপর হামলা করার হুমকি দিয়েছে। বলেছে, এবার ৫০ থেকে ১০০ জনকে নিয়ে আসবে। আমরা অভিযোগ দায়ের করলেও পুলিশ এখনো কোনো মামলা শুরু করেনি।’

নিরাপত্তার কারণে তিনি ও তার পরিবার এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

পার্বতী বলেন, ‘আমার স্বামী টোটো চালান, আমাদের টোটো কিনতে দুই লাখ টাকার লোন নিতে হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে কী করে নিরাপদ থাকব, বা লোনটি শোধ করব বুঝতে পারছি না।’

ধর্মান্তর করার চাপ তৈরির অভিযোগ
এই ঘটনার কয়েক দিন আগে, ১৮ থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায় একাধিক পরিবার বজরং দলের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তোলে। তাদের অভিযোগ, এক নারীকে যৌন হয়রানি করা হয়, তার পোশাক ছিঁড়ে দেয়া হয় এবং ধর্মান্তরিত করার উদ্দেশ্যে তাদের জোর করে একটি পূজোমণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়।

বিবিসি বাংলা চন্দ্রকোনার এই ঘটনার মূল অভিযোগকারী নারীকে ফোন করলে তিনি জানান, হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে তিনি গুরুতর অসুস্থ এবং চিকিৎসাধীন।

পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগে তিনি লেখেন, ‘১৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বজরং দলের সাথে যুক্ত একদল ব্যক্তি আমার বাড়িতে আসে। সেই সময় আমি আমার পরিবারের সদস্যদের সাথে বাড়িতে উপস্থিত ছিলাম। তারা আমাদের প্রভু যিশু খ্রিস্টের প্রতি আমাদের বিশ্বাস পরিত্যাগ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে এবং আমাদের ভয় দেখায় ও শারীরিক নির্যাতন করে।’

তার অভিযোগ, ওই দিন ‘দুষ্কৃতকারীরা’ তার মাথায় এবং কানের নিচে আঘাত করে, এরপর তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সেই অবস্থায় তার পোশাক ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং শাড়ি খুলে দেয়া হয়।

অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ‘পরবর্তীতে আমাকে তথাকথিত শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে জোরপূর্বক তারা আমাকে স্নান করায় সবার সামনে। আমার সম্মতি ছাড়া আমার পোশাক খুলে দেয়া হয় এবং আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাকে ওই আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়।’

অভিযোগকারী নারী আরো জানান, ২০ অক্টোবর তাকে এবং তার স্বামীসহ মোট চারজন খ্রিস্টানকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গ্রামের একটি পূজোমণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের ‘নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে বাধ্য করা হয়’।

অভিযোগে তিনি লেখেন, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এখনো আমাকে হুমকি দিয়ে বলছে যে আমি যদি পুলিশের সাথে যোগাযোগ করি এবং অভিযোগ দায়ের করি, তাহলে তারা আমাকে বাঁচতে দেবে না। আমি অত্যন্ত আতঙ্কিত ও মানসিকভাবে বিপর্যন্ত। আমার আশঙ্কা, যেকোনো সময় আমার বা আমার পরিবারের সদস্যদের সাথে গুরুতর কোনো অঘটন ঘটতে পারে।’

‘পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব’, বলছে পুলিশ
দুই ঘটনার ক্ষেত্রেই অভিযোগ উঠেছে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার। পাঁশকুড়া থানার এক পুলিশ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তারা লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন, তবে এখনো এফআইআর (ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট) দায়ের করা হয়নি।

তিনি বলেন, ‘অভিযোগ জমা পড়লেই যে এফআইআর দায়ের হয়, এমন নয়। আমার তদন্তকারী অফিসার বর্তমানে বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। এই মুহূর্তে আমরা এর বেশি তথ্য দিতে পারব না।’

অন্যদিকে, পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনার ঘটনার ক্ষেত্রে ২০ অক্টোবর এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল। হত্যার চেষ্টা, একজন নারীকে বিবস্ত্র করার উদ্দেশ্যে হামলা, বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ, ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করা, অপরাধমূলক ভয় দেখানো এবং নারীর শ্লীলতাহানির মতো একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।

তবে ওই মামলার তদন্তের সাথে যুক্ত এক পুলিশ অফিসার জানান, তদন্ত চলছে, কিন্তু এখনো কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। 

তার দাবি, এর কারণ পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব।

তিনি বলেন, ‘বয়ান, মেডিক্যাল রিপোর্ট বা অন্য কোনো জমা দেয়া নথিতে আমরা এখনো পর্যন্ত এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ পাইনি, যার ভিত্তিতে কাউকে গ্রেফতার করা যায়।’

তিনি জানিয়েছেন, এফআইআরে নাম থাকা ১৩ জন অভিযুক্তই স্থানীয় বাসিন্দা।

‘যতজন খ্রিস্টান আছেন, তাদের হিন্দু বানিয়ে দেবো’
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পশ্চিমবঙ্গসহ কয়েকটি রাজ্যের অন্যতম একজন নেতা চন্দ্রনাথ দাস জানান, বজরং দল এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর আক্রমণ করার যে অভিযোগ উঠে এসেছে, তা মিথ্যে। 

তার দাবি, তারা কোনো আক্রমণ করেন না বা আইন নিজেদের হাতে তুলে নেন না।

তবে তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে এই সংগঠনটি ‘ধার্মিক শিক্ষার মাধ্যমে খ্রিস্টান এবং মুসলিমদের হিন্দু ধর্মে ফেরানোর অভিযান চালাচ্ছে’।

উল্লেখ্য, বজরং দল হল বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সাথে যুক্ত একটি যুব সংগঠন।

চন্দ্রনাথ দাস বলেন, ‘পুরো ভারতে আমাদের এই কাজ চলে, কেবল চন্দ্রকোনা বা মেদিনীপুরে নয়। পুরো পশ্চিমবঙ্গেও। আমাদের লক্ষ্য, যতজন খ্রিস্টান আছেন, তাদের হিন্দু বানিয়ে দেবো। আর তারা হয়েও যান। কেউ খ্রিস্টান হবে না, এটাই আমাদের লক্ষ্য।’

তিনি জানান, ১৯৬৪ সালে যখন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেদিন থেকে এই সংগঠনের লক্ষ্য, ‘ধর্মান্তর রোধ করা, আমার ধর্ম থেকে কেউ চলে গেলে আমার ধর্মে ফিরিয়ে নিয়ে আসা’।

তার দাবি, তারা প্রতি বছর পশ্চিমবঙ্গে হাজার হাজার ভিন্ন ধর্মের মানুষকে ‘হিন্দু করেছেন’, ‘প্রকাশ্যে, দিবালোকে, পুলিশকে জানিয়ে’।

‘বঙ্গীয় খ্রিস্ট্রীয় পরিষেবা’ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা হেরোদ মল্লিক বলেছেন, ‘একের পর এক এই ধরনের হামলা হচ্ছে। যারা আক্রমণ করছে তারা ক্রমশ আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না বলে হয়তো আরো বেশি করে হচ্ছে। কোথা থেকে ওরা এতো সাহস পাচ্ছে, কেন বেপরোয়া হচ্ছে বুঝতে পারছি না।’

তিনি অভিযোগ করেন, সরকার তাদের আবেদনে কোনো সাড়া দিচ্ছে না বা ঘটনাগুলোতে ঠিকঠাক তদন্তও করছে না। এই লোকগুলো যারা এই ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।

এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, বিজেপি বিধায়কদের দ্বারা পরিচালিত নতুন সরকার যেকোনো অন্যায়, যেকোনো অত্যাচারের প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে।

তিনি বলেছেন, ‘যারা অত্যাচারিত মনে করছেন তারাও আইনি ব্যবস্থায় আসুন, অভিযোগ করুন, আইন আইনের পথে চলবে। আমরা কাউকে কোনো রকম সাম্প্রদায়িক ‘ইমিউনিটি’ দেবো না, সাম্প্রদায়িক ‘লেভারেজ’ও আমরা কারুর কাছ থেকে চাই না। কে কী আচার আচরণ করবেন, কে কী ধর্ম পালন করবেন, কে কোন সম্প্রদায়ে থাকবেন, কে কোন সম্প্রদায়ে থাকবেন না, সেটা আমরা ঠিক করিনা। ধর্মান্তকরণ আমাদের রাষ্ট্রে স্বীকৃত নয়।’

পশ্চিম মেদিনীপুরে খ্রিস্টান পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগে গেরুয়া শিবিরকে নিশানা করেছেন কংগ্রেস নেতা কে সি বেণুগোপাল। চন্দ্রকোনায় এক নারীকে বিবস্ত্র করে ‘শুদ্ধিকরণ’ অনুষ্ঠানে বাধ্য করার অভিযোগে দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন তিনি।

সূত্র : বিবিসি