২০১২ সালের জুলাইয়ে আন্না হাজারের সমর্থনে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীরা
২০১২ সালের জুলাইয়ে আন্না হাজারের সমর্থনে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীরা। সংগৃহীত ছবি

মহাকাশ অবজারভেটরি হিসেবে ১৭২৪ সালে যে যন্তর মন্তর গড়া হয়েছিল, দিল্লির সেই প্রাচীন মানমন্দিরের ওপরেই ২০২৬ সালে সারাবিশ্বের নজর পড়েছে। নেপথ্যে জেন-জি আন্দোলন।

Advertisement

বলা হয়, দিল্লির যন্তর মন্তরে সূর্যের রশ্মি ঘড়ির কাঁটা মেপে চলে। সেখানেই ভারতের কৃষক, নারী, সৈনিক, কুস্তিগীর, ছাত্র ও যুবকরা বছরের পর বছর ধরে কর্মসূচি পালন করে সরকারের কাছে ন্যায়বিচারের দাবি করে আসছেন।

দিল্লির কনট প্লেসের ঔপনিবেশিক আমলের সাদা রংয়ের ভবনগুলো ছাড়িয়ে সূর্য রশ্মি যখন আরো ওপরে উঠে যায়, তখন তার ছায়া যন্তর মন্তরের লাল পাথরের ওপর গিয়ে পড়ে।

ওই সূর্য রশ্মি যদিও স্লোগান দেয় না, রাস্তা অবরোধ করে না, বা পুলিশের কাছে অনুমতিও চায় না। পৃথিবী তার নিজের অক্ষে ঘোরে, আর যন্তর মন্তরের লাল পাথরগুলো সেই গতি মেপে সময়ে রূপান্তরিত করে দেয়ার কাজ করছে বছরের পর বছর।

কিন্তু সম্প্রতি এই ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর থেকে কয়েক পা দূরে, পার্লামেন্ট মার্গ সরণিতে সময়ের অন্য এক হিসাব নিকাশ চলতে থাকে।

অনশন করে, পুলিশি হেফাজতে, সরকারি আশ্বাসে ভর করে, বছরের পর বছর ধরে না হওয়া চাকরির দাবি এবং ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষায় কাটানো এক একটা মানুষের যৌবন কেটে যাচ্ছে এই যন্তর মন্তরে।

অশোকা রোড এবং টলস্টয় মার্গের মাঝের এই সাধারণ ও বাঁকানো রাস্তাটি দিল্লির কাছে গ্রেটার লন্ডনের হাইড পার্কের সমতুল্য হয়ে উঠেছে। এই স্থান এতটাই দৃশ্যমান ও প্রতীকী এবং ক্ষমতার অলিন্দের এতটাই কাছাকাছি যে একে উপেক্ষা করা অসম্ভব।

গত কয়েক মাসে জেন-জি এই পুরোনো বাঁধানো পথে নতুন গতি সঞ্চার করেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে অনলাইনে জন্ম নেয়া এক ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া থেকে জন্ম নেয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’-এর আন্দোলনের ঢেউ এই ঐতিহাসিক ভূখণ্ডেই আছড়ে পড়েছে।

যন্তর মন্তরের ইতিহাসে এই চত্বরের প্রতিটি প্রতিবাদ একটা করে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।

যন্তর মন্তরের দু’টি ইতিহাস যথা, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গণআন্দোলন, আপাতদৃষ্টিতে আলাদা মনে হলেও, এ দু’টি আদতে মানুষের স্বাভাবিক একটি কৌতূহলের দু’টি ভিন্ন বহিঃপ্রকাশ। সেই কৌতুহল হলো, তার চারপাশে ঘটা ঘটনা অনুধাবন করা এবং তার কারণ উপলব্ধি করা।

যন্তর মন্তর শুধু প্রতিবাদের একটি স্থান নয়। এটি স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উন্মুক্ত আর্কাইভ।

নর্মদার অববাহিকা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষরা যেমন এখানে এসেছিলেন, তেমনই খরা ও ঋণে জর্জরিত কৃষক, নারী সুরক্ষার দাবিতে তরুণেরা, পদকজয়ী সৈনিক ও কুস্তিগীর, কর্মচারী, শিক্ষক, চিকিৎসক এবং ছাত্রছাত্রীরাও এখানে হাজির হয়েছেন।

এখানে যেমন প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনগুলো এসেছে, তেমনই নিঃসঙ্গ, একলা মানুষও এসেছেন, যার কাছে হয়ত নিজের দুঃখ-কষ্ট ছাড়া আর কিছুই নেই।

যদি সেখানে ভিড় বাড়ে, তবে বুঝতে হবে যে প্রতিষ্ঠান ও তার জনগণের মধ্যে যোগাযোগের আকাশে কোথাও কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে।

যদি তরুণেরা সেখানে প্রশ্ন নিয়ে বসে, তবে তা শুধু কোনো মন্ত্রী, পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা বা সাংবিধানিক সংস্থার সঙ্কট নয়, বরং তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোথাও একটা ছন্দ পতন ঘটেছে বলেই।

আর যখন একজন ছাত্র সেখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায়?’- সে শুধু সরকারের কাছেই উত্তর চাইছে না। সে রাষ্ট্রব্যবস্থার কাছে তার সময় ফেরত চাইছে।

যন্তর মন্তর কিভাবে একটি আন্দোলন কেন্দ্রে পরিণত হলো?
যন্তর মন্তরের আগে দিল্লিতে আরো বড় একটি প্রতিবাদ মঞ্চ ছিল- রাজপথের (বর্তমানে কর্তব্য পথ) নিকটবর্তী বোট ক্লাবের লন।

সংসদ ভবন, রাষ্ট্রপতি ভবন, নর্থ ও সাউথ ব্লকের কাছাকাছি হওয়ায় ক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার এটিই ছিল অন্যতম সেরা জায়গা।

১৯৮৮ সালে এই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়, যখন কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকাইতের নেতৃত্বে হাজার হাজার কৃষক আন্দোলনকারী এক সপ্তাহের জন্য এলাকাটি ঘিরে ফেলেন।

তারা সেখানে তাঁবু গেড়েছিলেন, রান্না করেছিলেন, গবাদি পশু এনেছিলেন, কাছেই শৌচকর্ম সেরেছিলেন এবং তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। এই প্রতিবাদের ব্যাপকতা সরকারকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত, বোট ক্লাবই ছিল ভারতের গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বরের মঞ্চ।

১৯৯৩ সাল নাগাদ বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর পর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে প্রশাসন নীরবে রাজপথ থেকে বিক্ষোভ সরিয়ে নিতে শুরু করে।

আর ঠিক সেই সময়ে, যন্তর মন্তর একটি মধ্যপন্থা হিসেবে সামনে উঠে আসে। এটি সংসদের কাছাকাছি, কিন্তু খুব বেশি কাছে নয়। সকলের চোখের সামনেই অথচ যার ওপর প্রসাশনের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

কিন্তু যন্তর মন্তর শুধু প্রতিবাদের স্থান বা একটি প্রাচীন ভবন নয়।

লেখক সালমান রুশদি কিছুদিন আগে লিখেছেন, ‘আমার বন্ধু ও ফটোগ্রাফার সাইমন চ্যাপুট যন্তর মন্তরের একটি চমৎকার আলোকচিত্র সিরিজ তৈরি করেছেন। যখন সেগুলো একটি সীমিত সংস্করণের আর্ট বইতে সংকলিত হয়, আমি সেগুলোর সাথেই একটি গল্প লিখেছিলাম। সেই অতি সীমিত সংস্করণটি ছাড়া এই গল্পটি এর আগে আর কোথাও প্রকাশিত হয়নি।’

যন্তর মন্তর কতটা আলাদা, কতটা স্বতন্ত্র?
বিখ্যাত লেখক পল লুন্ডে ‘জয়সিংহ অ্যান্ড দ্য যন্তর মন্তর’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যে সময়ে ইউরোপের জেসুইট মিশনারিরা কোপারনিকাস, টাইকো ব্রাহে এবং গ্যালিলিওর মতো মহান জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধর্মদ্রোহী বলে মনে করতেন, সেই সময়ে সওয়াই জয়সিংহ একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ঘটাচ্ছিলেন।’

যন্তর মন্তরে, যেখানে একসময় ‘সম্রাট জয়প্রকাশ যন্ত্র’টি পৃথিবীর মহাজাগতিক গতির রূপ পরিমাপ করত, সেখানে এখন বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব মাপছে।

জয়প্রকাশ যন্ত্র যেমন আকাশের উল্টো মানচিত্র পৃথিবীতে দেখাতে পারত, তেমনি যন্তর মন্তরের রাস্তাটি দেশের উল্টো গণতান্ত্রিক মানচিত্র তুলে ধরে, যেখানে সংবিধান জনগণকে সর্বোচ্চ বলে ঘোষণা করে, কিন্তু মতামত প্রকাশের জন্য মানুষের বহু প্রতিবন্ধকতা, অনুমতি এবং সময়সীমা অতিক্রম করতে হয়।

কর্নেল ইউনিভার্সিটির কলেজ অফ আর্কিটেকচার, আর্ট অ্যান্ড প্ল্যানিং-এর সহযোগী অধ্যাপক এমেরিটাস ব্যারি পার্লাসের লেখা ‘সেলেস্টিয়াল মিরর : দ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরিজ অফ জয় সিং’ বইটিতে যন্তর মন্তরের সবচেয়ে সুন্দর এবং গভীর দৃশ্যগত বিবরণ রয়েছে।

ব্যারি পার্লাস লিখেছেন, ‘যন্তর মন্তর শুধু একটি পাথরের যন্ত্র নয়। এটি বিশাল জ্যামিতিক আকারের এক সমন্বয় যা স্বর্গকে পৃথিবীতে নামিয়ে আনে। জয় সিং স্থাপত্যকে বিজ্ঞানের একটি যন্ত্রে পরিণত করেছিলেন।’

যন্তর মন্তরের সাথে আন্দোলনের কী সম্পর্ক?
স্থপতি ও ইতিহাসবিদ অনীশা শেখর মুখার্জী ‘যন্তর মন্তর : মহারাজা সওয়াই জয় সিংস ল্যাবরেটরি ইন দিল্লি’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘দিল্লির যন্তর মন্তর একটি ধাঁধাঁ। এর বিশাল চিত্তাকর্ষক স্থাপত্য আজও বিস্ময় জাগায়। প্রথম দর্শনে যা বিমূর্ত ভাস্কর্য বলে মনে হয়, তা আসলে বিজ্ঞানের সেবায় সম্পূর্ণরূপে নিবেদিত এক স্থাপত্য – প্রতিটি কাঠামো দেখলে খালি চোখে সময় এবং মহাজাগতিক বস্তুসমূহের অবস্থান বোঝা যায় কারণ তা পরিমাপ করার জন্য যত্নসহকারে স্থাপত্য নকশা করা হয়েছে।’

এই কারণেই যন্তর মন্তর শুধু দিল্লির একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য বা প্রতিবাদস্থল নয়, এটি ভারতের রাজনৈতিক ক্ষেত্রও বটে। এমন একটি স্থান, যেখানে দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাহীন নাগরিকরা ক্ষমতার দরজায় কড়া নেড়ে নিজের উপস্থিতি জানান দেন।

যন্তর মন্তরের এই প্রতিবাদস্থলে রূপান্তিত হয়ে যাওয়া কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর নকশার অংশ ছিল না। এটি দ্বিতীয় জীবন পেয়েছে ভারতের স্বাধীন হওয়া এবং নয়াদিল্লিতে ক্ষমতায়নের পরেই।

১৯১১ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দিল্লিকে দেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক রাজধানী হিসেবে তৈরি করেছিল, যা কলকাতার রাজনৈতিক অস্থিরতা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং জাতীয়তাবাদী জনতার ভিড় থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে আসে।

ইতিহাস গবেষক হারলিন কাউড়ের গবেষণায়, পার্লামেন্ট স্ট্রিট, বোট ক্লাব, রামলীলা ময়দান এবং যন্তর মন্তর এমন কিছু স্থান, যেগুলোকে জনগণই তাদের উপস্থিতির মাধ্যমে জনসমক্ষে নিয়ে আসে। সরকারের অনুমতি, নিষেধাজ্ঞা, পুলিশি নিয়ন্ত্রণ সেই জায়গাগুলোর গুরুত্বে আরো বেশি করে আলোকপাত করে।

২০১৭ সালে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল পরিবেশগত ও নাগরিক উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে যন্তর মন্তরে প্রতিবাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং প্রায় চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রামলীলা ময়দানকে অবস্থান ধর্মঘটের নতুন আনুষ্ঠানিক স্থান হিসেবে ঘোষণা করে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পুষ্পাঞ্জলি ঝা-র গবেষণা যন্তর মন্তরের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র তুলে ধরে, যা জাতীয় ক্ষেত্রে এই ছোট্ট রাস্তাটির রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে।

পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার নথির ওপর ভিত্তি করে তাদের সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের আগস্টের মধ্যে যন্তর মন্তরে কমপক্ষে ১৩ হাজার ১১৮টি ধর্না এবং পাঁচ হাজার ৪৯১টি বিক্ষোভ, সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

শুধুমাত্র ২০১০ সালের প্রথম আট মাসেই প্রায় দেড় লাখ মানুষ বিভিন্ন বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন এবং আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১২ হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছিল।

এমনটা নয় যে প্রতিদিন নিয়মিত একটি বিশাল আন্দোলন হয়েছিল। এর অর্থ আরো বৃহত্তর, সেটি হলো, প্রায় প্রতিদিনই ভারতের কোনো না কোনো অংশ থেকে একটি ছোট জনগোষ্ঠী তাদের অভিযোগ নিয়ে রাজধানীতে পৌঁছাচ্ছিল।

অনিল সিনহা এটিকে একটি ‘গণতান্ত্রিক পরিসর’ হিসেবে দেখেন, যা রাষ্ট্র থেকে পৃথক হয়েও তার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে – এমন একটি পরিসর যা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত, আত্মীকৃত, রূপান্তরিত এবং বারবার পুনর্নির্মিত হয়েছে।

কোন কোন বিক্ষোভের জন্য যন্তর মন্তর স্মরণীয় হয়ে থাকবে?
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী অঁরি লেফেব্র তার ‘রাইট টু দ্য সিটি’-তে লিখেছেন, ‘শহর কেবল বসবাসের বা অধিকার করার কোনো বস্তু নয়, বরং সেখানে উপস্থিত থাকার, তাকে ব্যবহার করার, জীবনের হারানো অধিকার পুনরুদ্ধার করাও একটি অধিকার।’

ক্ষমতা সংসদ, মন্ত্রণালয়, প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী এবং সরকারি কাঠামোর মাধ্যমে তার উপস্থিতি জানান দেয়। ক্ষমতাহীন নাগরিকরা তাদের শরীর, পোস্টার, স্লোগান এবং রাস্তায় কাটানো সময়ের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতির জানান দেন।

ডিজিটাল জগৎ এই বিনিময়কে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু এটি রাস্তায় সশরীরে উপস্থিত থাকার সম্পূর্ণ বিকল্প নয়।

১৯৯০-এর দশকে, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনে বড় বাঁধের চাকচিক্যময় উন্নয়নের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া গ্রাম, আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাস্তুচ্যুতি এবং অপর্যাপ্ত পুনর্বাসনের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরার জন্য যন্তর মন্তরকে একটি মঞ্চে পরিণত করেছিল জনতা।

মেধা পাটকর এবং তার সহকর্মীরা প্রত্যন্ত নদী উপত্যকার ভূগোলকে সংসদের সামনে তুলে ধরেছিলেন।

নর্মদার তীরের যে মানুষগুলো উন্নয়নের মানচিত্রের দাগের মাঝে পড়ে ভিটেছাড়া হচ্ছিলেন, তারাই রাজধানীর মানচিত্রে নিজেদের জায়গা করে নিলেন।

২০১১ সালে, আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন যন্তর মন্তরকে টেলিভিশন যুগের রাজনৈতিক রাজধানীতে রূপান্তরিত করেছিল। সে বছরের ৫ এপ্রিল শুরু হওয়া এই অনশন আন্দোলনের প্রভাব সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, যার দৃশ্যমান ভাষা ছিল সাদা গান্ধী টুপি, ত্রিবর্ণ পতাকা, মোমবাতি এবং ‘আমি আন্না’ স্লোগান।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে এক তরুণীকে গণধর্ষণ ও হত্যার পর, তরুণ-তরুণীরা ইন্ডিয়া গেট, রাইসিনা হিল এবং যন্তর মন্তরে ভিড় জমিয়েছিল। এটি কোনো একজন নেতার দ্বারা পরিচালিত সমাবেশ ছিল না; এটি ছিল নাগরিকদের ভয়, শোক, অপমান এবং ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ।

২০১৫ সালে সাবেক সৈনিকরা ‘এক পদ, এক পেনশন’ (ওআরওপি)-এর দাবিতে এখানে মাসের পর মাস অবস্থান করেছিলেন, তাদের পদক সরিয়ে রেখে।

২০১৭ সালে তামিলনাড়ু থেকে খরাকবলিত কৃষকেরা যন্তর মন্তরে এসে পৌঁছান এবং দাবি করেন যে তারা অন্য কৃষকদের মাথার খুলি সাথে নিয়ে এসেছেন। তারা অর্ধনগ্ন হয়ে প্রতিবাদ করেন, ঘাস খান, দাঁত দিয়ে ইঁদুর ধরেন এবং নিজেদের দেহকে কৃষি সঙ্কটের এক প্রকাশ্য দলিলে পরিণত করেন।

দীর্ঘস্থায়ী এই বিক্ষোভ নিকটবর্তী বাসিন্দাদের জীবনকেও প্রভাবিত করেছিল। যন্তর মন্তর রোডের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, ক্রমাগত লাউডস্পিকারের ব্যবহার, যান চলাচল অবরোধ, অস্থায়ী কাঠামো, রান্না এবং রাত্রিযাপনের কারণে হওয়া শব্দদূষণ, দূষণ এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনে বিঘ্ন ঘটছে।

২০১৭ সালের অক্টোবরে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ বন্ধ করে রামলীলা ময়দানে স্থানান্তরিত করার নির্দেশ দেয়। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়।

২০১৮ সালের ২৩ জুলাই মজদুর কিষাণ শক্তি সংগঠন বনাম ভারত সরকার মামলায় আদালত শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার এবং বাসিন্দাদের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্যের ওপর জোর দেয়।

গণতান্ত্রিক রাজধানীকে নিষেধাজ্ঞার এক স্থায়ী দুর্গে পরিণত করা যায় না, তবে মনে রাখতে হবে প্রতিবাদের স্বাধীনতাও অনির্দিষ্টকালের জন্য অন্য নাগরিকদের জীবন ধ্বংস করার লাইসেন্স দেয় না।

সূত্র : বিবিসি