
‘আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা / চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।’
ছোটবেলায় মায়ের মুখে এই ছড়া শুনে চাঁদকে কত আপনই না মনে হয়েছে! মায়ের কাছে তার সন্তানই তো চাঁদের মতো। তার ছোট্ট মুখে, ঘুমজড়ানো চোখে, হাসিতে মায়ের পুরো আকাশ।
কিন্তু একদিন যদি সত্যিই মানুষ চাঁদের বুকে ঘর বাঁধে? যদি সেখানে জন্ম নেয় নতুন কোনো শহর, নতুন কোনো সংসার? তখন চাঁদ হয়তো আর শুধু দূরের আকাশে ঝুলে থাকা মামা থাকবে না। হয়ে উঠবে কারো ঘর, কারো স্বপ্ন, কারো সন্তানের পৃথিবী।
চাঁদের বুক থেকে নীল ধরিত্রীকে উঠতে দেখে কোনো মা হয়তো তখন বলবেন—
‘আয় আয় জগৎ মামা টিপ দিয়ে যা / আমার জগতের কপালে টিপ দিয়ে যা।’
কারণ মায়ের কাছে তার সন্তানই তো গোটা জগৎ। সেই জগতকে যদি একদিন চাঁদের বুকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তখন ঘর-বাড়ি আর বিদ্যুতের পাশাপাশি সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠবে পানির প্রশ্ন। চাঁদের মাটিতে জমে থাকা পানি দিয়ে সেই জগত কত দিন টিকবে?
চাঁদে বড় শহর গড়ে তোলার স্বপ্ন এখন আর পুরোপুরি কল্পকাহিনি নয়। তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, সেই স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে পানির অভাব।
ডেইলি গ্যালাক্সি জানায়, চাঁদের মাটির নিচে জমে থাকা বরফের মজুত দিয়ে বড় আকারের স্থায়ী বসতি কত দিন টিকিয়ে রাখা যাবে, তা নিয়ে নতুন করে হিসাব কষছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণাটি সম্প্রতি ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন স্পেস টেকনোলজিজ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটির লেখক সারাহ জোন্স।
চাঁদের মেরু অঞ্চলকে দীর্ঘদিন ধরেই ভবিষ্যৎ মানব অভিযানের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় জায়গা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ সেখানে এমন কিছু গভীর গর্ত রয়েছে, যেখানে প্রায় ৪০০ কোটি বছর ধরে সরাসরি সূর্যের আলো পৌঁছায়নি। এসব জায়গাকে বলা হয় ‘কোল্ড ট্র্যাপ’। সেখানে এত ঠান্ডা যে পানি মহাকাশে উবে যেতে পারে না। ফলে বরফ টিকে আছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, চাঁদ যখন তরুণ ছিল, তখন গ্রহাণুর আঘাতে কিছু পানি সেখানে পৌঁছেছিল। পরে তা স্থায়ীভাবে অন্ধকার এসব অঞ্চলে বরফ হয়ে জমে যায়।
২০১৩ সাল থেকে কয়েকটি মহাকাশ অভিযান এসব এলাকার পানি নিয়ে গবেষণা করেছে। সবচেয়ে আশাবাদী হিসাবে বলা হচ্ছে, চাঁদে সর্বোচ্চ প্রায় ১০০ কোটি টন পানির বরফ থাকতে পারে। এই হিসাবই চাঁদে ভবিষ্যৎ গ্রাম, শহর এমনকি শিল্পকারখানা গড়ে তোলার স্বপ্নকে উসকে দিয়েছে।
জেফ বেজোস পৃথিবীর বাইরে ভারী শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। এলন মাস্ক বলেছেন পৃথিবীর বাইরে ‘নিজে নিজে বেড়ে ওঠা শহর’ তৈরির কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব শহরের মানুষের জন্য পানি থাকবে কত দিন?
গবেষণার উত্তর খুব আশাব্যঞ্জক নয়। চাঁদের মেরু অঞ্চলে দীর্ঘ সময় সূর্যের আলো পাওয়া যায়। তাই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগও রয়েছে। বিজ্ঞানীদের হিসাবে, উজ্জ্বল গর্তগুলোর কিনারে সৌর টাওয়ার বসিয়ে প্রায় ৩ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। চাঁদের মাটিতে সিলিকন থাকায় ভবিষ্যতে সেখানেই সৌর প্যানেল তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।
কিন্তু বিদ্যুৎ থাকলেই জীবন টিকবে না। দরকার পানি।
গবেষণায় দেখা গেছে, ১০০ কোটি টন পানির মজুত ধরেও কোনো বড় শহর পুনর্ব্যবহার ছাড়া মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে পানিশূন্য হয়ে যেতে পারে। আর ব্যবহৃত পানির ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত পুনর্ব্যবহার করা গেলেও ১০ লাখ মানুষের একটি শহরের পানি শেষ হয়ে যেতে পারে এক শতাব্দীর সামান্য বেশি সময়ের মধ্যে।
আরো বড় সমস্যা হলো, চাঁদে আসলে পানির পরিমাণ আশাবাদী হিসাবের চেয়ে প্রায় ৩০ গুণ কম হতে পারে।
হাজার মানুষের একটি গ্রাম কিংবা ১০ হাজার মানুষের একটি শহর অবশ্য অনেক বেশি সময় টিকে থাকতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা এখন পানি সাশ্রয়ী কৃষি, আরো কার্যকর পানি পুনর্ব্যবহার, কাছের গ্রহাণু থেকে পানি আনা এবং চাঁদের আরো গভীরে অনুসন্ধানের কথা ভাবছেন।
এখন পর্যন্ত চাঁদের মাটির মাত্র কয়েক মিটার গভীর পর্যন্ত অনুসন্ধান হয়েছে। তার নিচে আরো পানির ভাণ্ডার লুকিয়ে আছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
চাঁদের বুকে মানুষ ঘর বাঁধবে কি না, সেই স্বপ্ন হয়তো একদিন সত্যি হবে। সেখানে উঠবে শহর, তৈরি হবে সংসার। কোনো মা হয়তো চাঁদের মাটি থেকেই তার সন্তানের মুখে তাকিয়ে বলবেন, ‘এই তো আমার জগত।’ কিন্তু সেই জগতকে বাঁচিয়ে রাখতে যদি পানি না থাকে, তাহলে ঘর থাকবে, শহর থাকবে—থাকবে না শুধু জীবন। তাই চাঁদে বসতি গড়ার স্বপ্নের শেষ হিসাবটা হয়তো বাড়িঘর দিয়ে নয়, একদিন পানির হিসাব দিয়েই করতে হবে।








