
শ্রীলঙ্কা থেকে দক্ষিণ কোরিয়া। খরা, দাবানল, টাইফুন ও বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে বিভিন্ন দেশের সরকার। জলবায়ু পরিকল্পনার সামনে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রূপকথার রাক্ষস-খোক্কসের মতো হাঁউ মাঁউ খাঁউ হুংকার দিয়ে যেন ছুটে আসছে এক ভয়ংকর রাক্ষস। নাম তার এল নিনো।
এল নিনোর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ আবহাওয়া পরিস্থিতির আশঙ্কা করছে। তাই এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকার দ্রুত প্রস্তুতি নিচ্ছে। তীব্র গরম, ভারী বৃষ্টি ও খাদ্যসংকট একসাথে আঘাত হানতে পারে। ফলে অঞ্চলটির কোটি কোটি মানুষ একই সময়ে একাধিক সংকটের মুখে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান (১৮ সেপ্টেম্বর) জানায়, প্রশান্ত মহাসাগরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের অস্বাভাবিক উষ্ণ সমুদ্রের কারণে এল নিনো শক্তিশালী হয়ে উঠছে। মানবসৃষ্ট জলবায়ু সংকটের পাশাপাশি এই আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। চলতি বছরের শেষ দিকে এবং ২০২৭ সালজুড়ে এল নিনো অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে বলেছে, এই অস্বাভাবিক তীব্র আবহাওয়ার কারণে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস চলতি মাসে বলেছেন, এল নিনো ‘আমাদের চোখের সামনেই আরো ভয়ংকর আকার নিচ্ছে’।
চীনে ‘জলবায়ু ঝুঁকির মানচিত্র’
হংকংয়ে ৯ আগস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ দিন হিসেবে রেকর্ড হয়। এর পর কর্মক্ষেত্রের নীতিমালা পরিবর্তন করতে হয়েছে। প্রচণ্ড গরমের সময় কর্মীদের কাজের সময়সূচি বদলানো, ঠাণ্ডারাখার সরঞ্জাম সরবরাহ এবং বিশ্রামের বিরতি দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। কর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ারও সুযোগ রয়েছে।
চীনের মূল ভূখণ্ডও তাল মিলিয়েছে। চরম আবহাওয়া থেকে রক্ষার প্রস্তুতি এবং খরা ও অতিবৃষ্টির মতো বিপরীত পরিস্থিতিতে ফসল রক্ষায় ১০০ দিনের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। বেইজিং আগাম সতর্কতা ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। জুলাইয়ে শহরগুলোকে বন্যা ও তীব্র গরমে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে জাতীয় ‘জলবায়ু ঝুঁকির মানচিত্র’ তৈরির পরিকল্পনা চালু করা হয়েছে।
তাইওয়ান সম্ভাব্য চরম আবহাওয়াকে জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করছে। সেপ্টেম্বরে সেখানে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় টানা তিন দিনের একটি মহড়া হয়। এতে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া, রেল চলাচলে সমস্যা, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিকল হওয়া এবং ব্যাপক হিটস্ট্রোকের পরিস্থিতি অনুশীলন করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে শীতল ও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্থানে পৌঁছে দিতে ‘কুল ম্যাপ’ নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্মও খতিয়ে দেখছে সরকার।
শ্রীলঙ্কায় পানির সংকট
দক্ষিণ এশিয়ায় এল নিনোর প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। ভারতের কিছু এলাকায় সেপ্টেম্বরে মৌসুমি বৃষ্টিপাত প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। এতে ধান, ডাল, তুলা ও ভুট্টার মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলন কমে গেলে খাদ্যের দাম আরো বাড়তে পারে। এমন ঘটনা গরিব ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি বিপদ ডেকে আনবে।
শ্রীলঙ্কায় পরিস্থিতি আরো গুরুতর। বৃষ্টির অভাব ও তীব্র গরমের কারণে দেশটি এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরার মুখে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জলাধার শুকিয়ে গেছে। ফলে এক লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ পানির সংকটে রয়েছেন। ইয়ালা জাতীয় উদ্যানের পর্যটন এলাকা বন্ধ করে দেয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে বন্যপ্রাণীর জন্য পানি যোগানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মুল্লাইথিভু উপহ্রদে মিঠা পানির অভাবে হাজার হাজার মাছ মারা গেছে।
দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র এমন পরিস্থিতির প্রস্তুতি নিচ্ছে, যখন মিঠা পানির উৎসগুলো পুরোপুরি শুকিয়ে যেতে পারে। এক কর্মকর্তা বলেন, পানির উৎস শুকিয়ে গেলে পানি সংগ্রহের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। তখন সমুদ্রের নোনা পানি পরিশোধন করতে হতে পারে। তবে দেশের একমাত্র নুনপরিশোধন কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করে এই ব্যবস্থা চালানো বাস্তবসম্মত নয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খাদ্যসংকট
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এল নিনোর সাথে যোগ হয়েছে আরো কিছু সংকট। ইরান যুদ্ধে দুনিয়া জুড়ে জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় বড় বাধা পড়েছে। এ কারণে সারের দাম চট করে বেড়েছে। একই সময়ে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় মৌসুমি দাবানলের ধোঁয়া শহরগুলোকে আচ্ছন্ন করছে এবং গাছপালার ক্ষতি করছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আঞ্চলিক ধানের ফলন ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমতে পারে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক জলবায়ু ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এলিসা কাউর লুধার বলেন, আগের এল নিনোর সময় নেয়া ব্যবস্থা এবার যথেষ্ট হবে না। খাদ্যনিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই অঞ্চলের মানুষের জীবনধারণের অন্যতম ভিত্তি চাল। খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে সামাজিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় তাপপ্রবাহের সতর্কতা
দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এ যাবৎকালের সবচেয়ে শুষ্ক জুলাই দেখা গেছে। কয়েক সপ্তাহ পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। দুর্বল হয়ে পড়া একটি ঝড়ের কারণে প্রবল বৃষ্টি নামে, যা দেশটির একটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে ভারী বৃষ্টিপাতগুলোর একটি। তীব্র গরমে কৃষকেরা মাটির নিচে আলু ‘সেদ্ধ’ হয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
দেশটির আবহাওয়া সংস্থা ১৮ বছরের মধ্যে প্রথমবার তাপপ্রবাহের সতর্কতা ব্যবস্থা সংস্কার করেছে। তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস অনুভব করলে জরুরি নয় এমন বাইরের কাজ বন্ধের নির্দেশনা দেয়ার জন্য নতুন সর্বোচ্চ সতর্কতা স্তর যুক্ত করা হয়েছে। শরৎকাল নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কোরীয় উপদ্বীপের চারপাশের সমুদ্র এখনো স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ। ফলে উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে এ বছর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক শক্তিশালী ঝড় তৈরি হতে পারে।
জাপানে প্রচণ্ড গরম ও টাইফুনের প্রস্তুতি
এল নিনো ও মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের যোগফলে জাপানে সুপার টাইফুনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগে এল নিনোর সময় জাপানে গ্রীষ্ম কিছুটা ঠান্ডা থাকত। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ায় ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময় দেশটির অনেক এলাকায় রেকর্ড গরম ও আর্দ্রতা দেখা যায়।
চলতি বছরের জুলাইয়ে জাপান প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নিষ্ঠুর গরমের দিন’ বা কোকুশোবি রেকর্ড করেছে। ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার দিন বোঝাতে এপ্রিল মাসে এই শব্দ চালু করা হয়। এখন গ্রীষ্মের গরম কমতে শুরু করলেও সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক টাইফুনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি।
নাগরিকদের সরকারি ভাবে সরিয়ে নেয়ার সতর্কতামূলক ঘোষণা মেনে চলতে বলা হয়েছে। খাদ্য ও পানি মজুত করতে এবং ঝড়ের সময় উড়ে গিয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে এমন ফুলের টব ও আসবাবপত্র নিরাপদ স্থানে রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ভারী বৃষ্টির সময় বন্ধ করার জন্য জাতীয় মহাসড়কের কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ আন্ডারপাসও চিহ্নিত করেছে দেশটির অবকাঠামো মন্ত্রণালয়।







