অ্যান্টেনা-মহাকাশ- মধ্যপ্রাচ্য- সাইবার
২০২৪ সালে মধ্যপ্রাচ্যের অজ্ঞাত স্থানে ট্রেলারে বসানো অ্যান্টেনা কি ইরান যুদ্ধে ব্যবহার হয়েছে? ছবি: টিডব্লিউজেড

ইরানের সাথে যুদ্ধে মহাকাশের ভেতর ও বাইরে অভিযান পরিচালনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্স। একই সাথে এই যুদ্ধে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তার নতুন তথ্যও সামনে এসেছে। 

টিডব্লিউজেড ওয়েব সাইট জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে স্পেস ফোর্সের ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে নতুন তথ্য দিয়েছেন বাহিনীটির শীর্ষ কর্মকর্তা জেনারেল ডগলাস শিয়েস। এতে স্পষ্ট হয়েছে, মহাকাশ ক্রমেই এমন একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠছে, যেখানে সরাসরি সংঘাতও ঘটছে। এর প্রভাব পড়ছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতরে ও বাইরে পরিচালিত সামরিক অভিযানে। ইরান যুদ্ধের মাধ্যমে এই প্রথম মহাকাশ থেকে সরাসরি পৃথিবীতে যুদ্ধ চালানো হলো কিনা সে কথা উল্লেখ করা হয়নি।

মঙ্গলবার এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার সম্মেলনে মূল বক্তব্য দেয়ার সময় শিয়েস ৪২তম ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়ারফেয়ার কমব্যাট ডিটাচমেন্টের এক সদস্যের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। টিডব্লিউজেড সম্মেলনে উপস্থিত ছিল। স্পেস ফোর্সের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এটিই ছিল শিয়েসের প্রথম বড় ধরনের প্রকাশ্য কর্মসূচি।

শিয়েস বলেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরির সময় ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড ও স্পেস কমান্ডে আমাদের সদস্যরা, ইউরোপীয় কমান্ড ও প্যাসিফিক কমান্ডের সহায়তায়, দেখিয়ে দিয়েছেন যে গার্ডিয়ানরা শুধু পাশে থেকে সহায়তা করার জন্য নেই। প্রয়োজনের সময় তারা সরাসরি যুদ্ধে মহাকাশ শক্তি কাজে লাগাচ্ছেন।’

এরপর তিনি ফ্লোরিডার টাম্পার বাসিন্দা স্পেশালিস্ট গ্রের কথা বলেন। মাত্র দুই বছর আগে স্পেস ফোর্সে যোগ দেয়া এই সদস্য মধ্যপ্রাচ্যে সেন্ট্রাল কমান্ডের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন ছিলেন। শিয়েসের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযান শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি একটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের লক্ষ্যবস্তু সংক্রান্ত নির্দেশনা পান। তার দায়িত্ব ছিল অস্ত্র ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করে গুরুত্বপূর্ণ ‘নন-কাইনেটিক ফায়ার’ পরিচালনা করা। অর্থাৎ শত্রুর যোগাযোগ ও ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা অকার্যকর করার মতো অপ্রচলিত আক্রমণ পরিচালনা করা।

শিয়েস বলেন, গ্রে লক্ষ্যবস্তুতে নজর স্থির করে অস্ত্র ব্যবস্থা প্রস্তুত করেন এবং ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক যুদ্ধ’ চালান। তখন তার অবস্থানের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হচ্ছিল এবং ‘অ্যালার্ম রেড’ সাইরেন বাজছিল। তবু তিনি অবস্থান ধরে রেখে মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষা, প্রতিপক্ষের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত করা এবং মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতা কাজে লাগানোর কাজ চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত তার কমান্ডারকে তাকে কনসোল থেকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নিতে হয়।

তবে শিয়েস কোন অস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছিল, তা জানাননি। টিডব্লিউজেডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪২তম ডিটাচমেন্টের আগে প্রকাশিত ছবিতে মধ্যপ্রাচ্যে ট্রেলারে বসানো বহুব্যান্ড অ্যান্টেনার সাথে সদস্যদের কাজ করতে দেখা গেছে। এগুলো অতীতে ‘কাউন্টার কমিউনিকেশনস সিস্টেম’ বা সিসিএসের বিভিন্ন সংস্করণের সাথে যুক্ত ছিল। সিসিএস মূলত ভূমি থেকে পরিচালিত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, যা শত্রুর মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত করার জন্য তৈরি।

৪২তম ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়ারফেয়ার কমব্যাট ডিটাচমেন্ট অন্তত ২০২৪ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করছে। অঞ্চলটিতে স্পেস ফোর্সের প্রধান আঞ্চলিক সদর দপ্তর ইউএস স্পেস ফোর্সেস-সেন্ট্রালের অধীনে রয়েছে এটি। গত বছরের বড়দিনের আগের দিন মোতায়েন মার্কিন সেনাদের সাথে এক সম্মেলন কলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই ইউনিটের ‘অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা কার্যক্রম’-এর কথা উল্লেখ করেছিলেন।

টিডব্লিউজেডকে শিয়েস বলেন, ‘কখনো কখনো আমাদের স্যাটেলাইটের অবস্থানের ভেতরেই থাকতে হয়। সে কারণেই গার্ডিয়ানদের ঝুঁকির মধ্যে যেতে হয়।’

ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের শিক্ষা সম্পর্কে তিনি বলেন, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক যুদ্ধের পাশাপাশি স্যাটেলাইট যোগাযোগও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ ব্যবস্থা, জিপিএস এবং অবস্থান, নেভিগেশন ও সময় নির্ধারণ ব্যবস্থা সচল রাখা জরুরি ছিল। একইভাবে ক্ষেপণাস্ত্রের সতর্কতা ও গতিপথ শনাক্ত করাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন থেকে ইরান পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় সতর্কবার্তা দেয়া সদস্যরা বহু মানুষের জীবন রক্ষা করেছেন বলেও জানান তিনি।

ইরানের হামলা অবশ্য মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর জন্য বড় ধরনের ক্ষতির দিকটিও সামনে এনেছে। অভিযানের শুরুর দিকে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও মিত্রদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। এর মধ্যে বিমান ও রাডারও ছিল। এতে শত শত হতাহতের ঘটনাও ঘটে বলে টিডব্লিউজেড জানিয়েছে।

শিয়েস বলেন, অপারেশন এপিক ফিউরি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বাহিনী শিখছে—কোন ধরনের স্থাপনা ভূগর্ভে রাখা প্রয়োজন, দূরবর্তী অবস্থান থেকে কীভাবে অভিযান পরিচালনা করা যায় এবং মহাকাশ থেকে এসব কাজের কিছু অংশ করা সম্ভব কি না।

তার এই মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভিযানের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের একটি কমান্ড সেন্টার থেকে পরিচালনার সুযোগ বাড়ানোর কাজ করছিল। কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে কিছু কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভূগর্ভে নেয়ার পরিকল্পনাও চলছিল। পরে ইরান যেসব ঘাঁটিতে হামলা চালায়, আল উদেইদ ছিল তার একটি।

ইরানের সাথে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বজুড়ে সামরিক ঘাঁটির নিরাপত্তা এবং শক্ত অবকাঠামোয় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি ঘাঁটিতে ভবিষ্যতে কী ধরনের অভিযান চালানো সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সাথে অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান নতুন করে সাজানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

স্পেস ফোর্সের জন্য এই অভিযান সামনে থেকে পরিচালিত সামরিক অভিযানে তাদের সক্রিয় ভূমিকা দেখানোর সুযোগও তৈরি করেছে। শুধু মাঠে থাকা ইউনিটের নিরাপত্তা নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে বাহিনী পুনর্গঠন, রসদ সরবরাহ এবং ইউএস ট্রান্সপোর্টেশন কমান্ডের সাথে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাও নতুন শিক্ষা হিসেবে সামনে এসেছে।

স্পেস ফোর্সের চিফ মাস্টার সার্জেন্ট জন বেনতিভেনা বলেন, যুদ্ধের পরিবেশে বাহিনী পুনর্গঠন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সরবরাহ ও রসদ পৌঁছে দেয়ার বিষয়টি এমন একটি কাজ, ‘যা আমরা আগে তেমনভাবে করিনি।’

মহাকাশভিত্তিক আগাম সতর্কতা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অস্ত্রের নির্দেশনা এবং প্রায় তাৎক্ষণিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ইতোমধ্যে মার্কিন সামরিক অভিযানের কেন্দ্রীয় অংশ। তবে মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আধিপত্যও ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে চীন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও দীর্ঘপাল্লার লক্ষ্যবস্তু শনাক্তসহ বিভিন্ন সামরিক প্রয়োজনে নতুন স্যাটেলাইট মোতায়েনে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একই সাথে ইরানের মতো অপেক্ষাকৃত ছোট প্রতিপক্ষও মহাকাশ সক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছে।

এর ফলে মহাকাশ আর শুধু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতরে পরিচালিত অভিযানকে সহায়তা করার জায়গা নয়। সেখানেও সরাসরি সংঘাত ঘটতে পারে। গতকাল প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বায়ুমণ্ডলের ভেতরের পাশাপাশি কক্ষপথে থাকা বাহিনী ও সরঞ্জাম ব্যবহার করেও তথাকথিত ‘কাউন্টার-স্পেস’ সক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে।

ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে স্পেশালিস্ট গ্রে ও ৪২তম ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়ারফেয়ার কমব্যাট ডিটাচমেন্টের ভূমিকা নিয়ে জেনারেল শিয়েসের দেয়া নতুন তথ্য তাই শুধু ভবিষ্যতের যুদ্ধের সম্ভাব্য চিত্রই তুলে ধরছে না। স্পেস ফোর্স ইতোমধ্যেই সরাসরি যুদ্ধ অভিযানে সক্রিয় হয়ে উঠেছে তাও তুলে ধরছে।