লেখকদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা
লেখকদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা সংগৃহীত

দেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে আছেন অসংখ্য লেখক। কারো হাতে কবিতার পাণ্ডুলিপি, কারো গল্প-উপন্যাসের খাতা, কারো মস্তিষ্কে ঘুরপাক খায় প্রবন্ধ, গবেষণা কিংবা জীবনঘনিষ্ঠ কোনো গ্রন্থের স্বপ্ন। তারা লিখছেন নীরবে, রাতের নিস্তব্ধ প্রহরে অথবা অবসরের ফাঁকে। তুলে আনছেন মানুষের সুখ-দুঃখ, সামাজিক অসঙ্গতি, অসহায় আর্তনাদ, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। সেসব  পাণ্ডুলিপির বেশির ভাগই আটকে থাকে আলমারির তাকে। মুদ্রিত হয়ে পাঠকের হাতে পৌঁছতে পারে না। কারণ একটাই, প্রকাশনার ব্যয়। সম্প্রতি লেখকের টাকায় বই প্রকাশ সাধারণ নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রকাশকরা নিজ ব্যয়ে প্রকাশ করেন শুধু জনপ্রিয় ও বাজারচলতি লেখকের বই। লেখক জনপ্রিয় না হলে যত ভালোই লিখুন তার বই ছাপা হয় না। বেশির ভাগ লেখকের অর্থ ব্যয়ের সামর্থ্য থাকে না। তাই তাদের পাণ্ডুলিপি পাঠকের হাতে পৌঁছে না। 

একজন লেখকের কাছে একটি বই শুধু মুদ্রিত কাগজের সমষ্টি নয়; এটি তার দীর্ঘ সাধনা, চিন্তার নির্যাস, অনুভবের উত্তরাধিকার। একটি পাণ্ডুলিপির পেছনে থাকে অসংখ্য নির্ঘুম রাত, আত্মসংযম, অধ্যয়ন, প্রত্যাশা এবং নিজের সাথে নিজের নিরন্তর লড়াই। অথচ অর্থনৈতিক বাধা সেই সৃষ্টিকর্ম প্রকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। অনেক প্রতিভাবান লেখকের স্বপ্ন স্তব্ধ হয়ে যায়। 

রাষ্ট্র দেশের ক্রীড়া, শিল্প, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা করে। সাহিত্যও সেই সাংস্কৃতিক পরিসরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। একজন কবি বা লেখকের হাতে যখন একটি নতুন গ্রন্থ জন্ম নেয়, তখন সেখানে ব্যক্তিমানুষের স্বপ্নের পাশাপাশি একটি সময়, একটি সমাজ এবং একটি ভূখণ্ডের কথাও সংরক্ষিত হয়। অতএব অর্থাভাবে সেই গ্রন্থের জন্মরোধ হওয়া নিছক ব্যক্তিগত সঙ্কট নয়; বরং এটি জাতীয় সঙ্কট। 

সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও তার অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে ‘লেখক প্রকাশনা সহায়তা তহবিল’ গঠন করা যেতে পারে। লেখকদের কাছ থেকে পাণ্ডুলিপি আহ্বান করে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য লেখক নির্বাচন করা যেতে পারে। নির্বাচিত লেখকদের বই প্রকাশে নির্দিষ্ট অনুদান দেয়া হলে বহু সুপ্ত প্রতিভা প্রকাশনার আলোয় আসতে পারে। যেমনটা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে চালু আছে। 

সরকার চাইলে প্রতি বছর নির্বাচিত নতুন লেখকদের নির্দিষ্টসংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নিতে পারে। প্রকাশিত বইয়ের একটি অংশ সরকারি গ্রন্থাগার, গণগ্রন্থাগার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ক্রয় করা যেতে পারে। এতে লেখক তার সৃষ্টির স্বীকৃতি পাবেন, পাঠক নতুন বই পাবেন এবং গ্রন্থাগারগুলোও সমৃদ্ধ হবে। 

রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রতিটি পাণ্ডুলিপি ছাপিয়ে দেয়া নয়; দায়িত্ব হলো যোগ্য ও সৃজনশীল লেখকের বই প্রকাশের ন্যায়সঙ্গত সুযোগ তৈরি করা। বই প্রকাশের জন্য লেখককে প্রকাশকের দরজায় দরজায় ঘুরতে হবে এই ধারা বদলানো দরকার। অর্থের অভাবে সম্ভাবনাময় লেখকের পাণ্ডুলিপি যেন চিরতরে হারিয়ে না যায়। তাই রাষ্ট্র এগিয়ে আসুক, পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা নিক।

এম ডি জিয়াবুল
আলীকদম, বান্দরবান।