
হামিদুল ইসলাম সরকার
দেশের বেশির ভাগ উন্নয়ন প্রকল্পের একটি বড় অংশের খরচ যায় পরামর্শকের পেছনে। সেটা কারিগরি বা অন্য যেকোনো প্রকল্পই হোক না কেন। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় দেশের চারটি পৌরসভাকে নিয়ে একটি বিশেষ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। লক্ষ্য জলবায়ু-সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর উন্নয়ন। এই প্রকল্পেরও একই দশা। প্রকল্প ব্যয়ের ৮৭ কোটি ৪০ লাখ টাকার ৬৫.৫১ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা রাখা হয়েছে পরামর্শক খাতে। প্রকল্পের অর্থায়ন করবে জার্মান উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জিআইজেড। কিন্তু মাঠপর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় অবকাঠামো ও সেবা উন্নয়নের চেয়ে পরামর্শক খাতেই বরাদ্দ বড় অংশ ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে প্রস্তাবনা থেকে পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদিত প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় চারটি পৌরসভায় বাস্তবায়ন করা হবে মাত্র ১২টি পাইলট প্রকল্প। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি চিহ্নিত করা, স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা তৈরি এবং পৌরসভার সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও বিপুল পরিমাণ অর্থ পরামর্শক খাতে ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য যখন স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার উন্নয়ন। তখন মোট বরাদ্দের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পরামর্শক খাতে চলে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে ‘ইনোভেশন ফর ক্লাইমেট স্মার্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের তৈরি একনেকের জন্য প্রকল্পের সারসংক্ষেপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পের মোট ব্যয় ৮৭ কোটি ৪০ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর পুরোটাই জার্মান উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জিআইজেডের অনুদান হিসেবে আসার কথা। বাংলাদেশ সরকার ও জিআইজেডের মধ্যে এ বিষয়ে গত বছরের ১০ এপ্রিল সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। তিন বছরে এই পাইলট প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে, অর্থাৎ ২০২৯ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হবে।
৪ পৌরসভায় ১২টি পাইলট প্রকল্প : অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পের তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় দেশের চারটি পৌরসভাকে বেছে নেয়া হয়েছে। এগুলো হলো- চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহীর চারঘাট, গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জ পৌরসভা। এসব পৌরসভায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তার সমাধানে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়তা দেয়া হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় চারটি পৌরসভায় ১২টি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া পৌরসভার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এর মাধ্যমে জলবায়ু-সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় আরো চারটি পৌরসভাকে মাল্টিপ্লায়ার শহর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো হলো- বরগুনা, কুড়িগ্রাম, কুষ্টিয়া ও নাটোর পৌরসভা। মূলত জার্মান উন্নয়ন সহযোগিতার কার্যক্রম উত্তরাঞ্চলে ক্লাস্টার পদ্ধতিতে সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই এসব পৌরসভাকে নির্বাচন করা হয়েছে।
পরামর্শকেই ব্যয়ের বড় অংশ : খরচের তথ্য থেকে দেখা যায়, প্রকল্পটির ব্যয় কাঠামোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক পরামর্শক খাতে বিপুল বরাদ্দ। মোট ৮৭ কোটি ৪০ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে ৬৫ দশমিক ৫১ শতাংশ বা প্রায় ৫৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা এ খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রকল্পের প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ৬৬ টাকাই যাবে পরামর্শক খাতে। বাকি প্রায় ৩৪ টাকা দিয়ে প্রকল্পের অন্যান্য কার্যক্রম, ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, পাইলট প্রকল্প এবং সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এখানে জাতীয় পরামর্শক সেবায় ৪০ কোটি ৬৭ লাখ ৩১ হাজার টাকা। আর আন্তর্জাতিক পরামর্শক সেবায় ১৬ কোটি ৫৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
৩ বছর পিছিয়ে বাস্তবায়নের প্রস্তাব
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নিয়েও পরিবর্তন এসেছে। টিএপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশে বাস্তবায়নকাল পরিবর্তন করে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রকল্পের মূল পরিকল্পনার তুলনায় বাস্তবায়ন শুরু ও শেষের সময়সূচি পিছিয়ে যাচ্ছে। প্রকল্পটি শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, তা শুরু হবে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে। এতে প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রায় দেড় বছরের সময়সূচিগত পরিবর্তন এসেছে।
স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতার ঘাটতিই মূল যুক্তি
প্রকল্পের পটভূমিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে জলবায়ু-সহনশীল নগর উন্নয়নের জন্য জাতীয় পর্যায়ে কৌশলগত নির্দেশনা থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে তার যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্ভাবন, পরিকল্পনা ও সমন্বয় প্রক্রিয়ার ঘাটতি রয়েছে। ফলে চাহিদাভিত্তিক, সাশ্রয়ী ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো এবং মৌলিক সেবার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবনী সমাধান চিহ্নিত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা তৈরি এবং তা বাস্তবায়নের সক্ষমতাও সীমিত। পৌরসভার টাউন লেভেল কো-অর্ডিনেশন কমিটি (টিএলসিসি) এবং বিভিন্ন স্থায়ী কমিটির কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে জলবায়ু-সহনশীল নগর পরিকল্পনা, নাগরিকদের অংশগ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নকার্যক্রমের আওতায় আনার বিষয়ে এসব কমিটির দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। ছোট ও মাঝারি শহরগুলোর নিজস্ব উদ্যোগে জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো বাস্তবায়নের মতো পর্যাপ্ত অর্থায়ন নেই। এ অবস্থায় স্থানীয় পর্যায়ে উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহিত করা এবং পৌরসভার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোই প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়নি : বিধান থাকলেও প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পর্কে সার-সংক্ষেপে ‘প্রযোজ্য নয়’ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রকল্প এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কয়েকটি মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিপ্রবণতা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং যৌথ প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা। পৌরসভাগুলো চূড়ান্ত করার আগে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) মাধ্যমে নগর নির্বাচন সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে। সেই সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রকল্প এলাকার পৌরসভাগুলো নির্বাচন করা হয়েছে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ রয়েছে। প্রকল্পটি একটি উন্মুক্ত কর্মসূচি হিসেবে পরিচালিত হবে। এর আওতায় পৌরসভাগুলোর দায়িত্বে বিভিন্ন উপপ্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন : পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চারটি পৌরসভার জলবায়ু-সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়বে। ভবিষ্যতে এই অভিজ্ঞতা দেশের অন্যান্য পৌরসভায় সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। তবে প্রকল্পটির সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বরাদ্দের বিপরীতে মাঠপর্যায়ে কী পরিমাণ কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব হচ্ছে তার ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ৮৭ কোটি টাকার প্রকল্পে যেখানে প্রায় ৫৭ কোটি টাকাই পরামর্শক খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা, সেখানে পরামর্শসেবার ফলাফল, ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং ১২টি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিক কী ধরনের সুবিধা পাবেন- সেসব প্রশ্নের জবাবও প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে সাথে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
সরকারি-বেসরকারি বিশ্লেষকদের মতামত:
পরিকল্পনা কমিশন সংশ্লিষ্ট ও জলবায়ু বিশ্লেষকদের মতে, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে- চারটি পৌরসভায় মাত্র ১২টি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এত বিপুল অর্থ পরামর্শক খাতে ব্যয়ের প্রয়োজন কতটা? পরামর্শকদের কাজের পরিধি, জনবল, পরামর্শসেবার মেয়াদ এবং প্রত্যাশিত ফলাফলের সাথে এই ব্যয়ের সামঞ্জস্য কতটা, তা প্রকল্পের বিস্তারিত ব্যয় বিভাজন ও কার্যপরিধি বিশ্লেষণ ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, নগর পরিকল্পনা, জলবায়ু ঝুঁকি নিরূপণ, প্রযুক্তিগত নকশা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো কাজে পরামর্শক নিয়োগের প্রয়োজন থাকতে পারে। তবে সেই ব্যয়ের বিপরীতে মাঠপর্যায়ে কী পরিমাণ দৃশ্যমান উন্নয়ন হবে, সেটিই হওয়া উচিত প্রকল্প মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা ছোট ও মাঝারি শহরগুলোর জন্য পানি নিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর সবুজায়ন এবং নাগরিক সেবার উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থ কতটা সরাসরি কাজে লাগবে, তা নিয়েও বিস্তারিত মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








