
বিশেষ সংবাদদাতা
বাজেট ঘাটতি মেটাতে নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই নেয়া হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়ার পরিবর্তে সরকার নিট ৯ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল। ফলে সরকারি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে এক বছরে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের গতকাল প্রকাশিত ‘মাসিক সরকারি অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রতিবেদন, আগস্ট ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৯৯০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অন্যদিকে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সরকার নিট ঋণ নিয়েছে পাঁচ হাজার ৯২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে দুই মাসে সরকারের মোট নিট অভ্যন্তরীণ ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৯১৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের অভ্যন্তরীণ ঋণ লক্ষ্যমাত্রার ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নিট ৬১৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা ঋণ পরিশোধ করেছিল। ওই সময়ে ব্যাংক খাত থেকে নিট ৯ হাজার ৭৯২ কোটি ৮০ লাখ টাকা পরিশোধের পাশাপাশি ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ৯ হাজার ১৭৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিল সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আগস্ট ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৭৫ শতাংশ (বছরওয়ারি)। আগের বছরের একই সময়ে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে প্রবৃদ্ধি কমেছে ১.৬০ শতাংশ পয়েন্ট। একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৩২.৪৫ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে তা ৪.৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এ ব্যবধান অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহের ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে।
সরকারি ঋণ গ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় কর্মসংস্থান, শিল্প সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে সরকারি ঋণ গ্রহণই বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমার একমাত্র কারণ নাও হতে পারে। তবে এ হার ক্রমেই কমছে। পরবর্তী মাস সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরো কমে ৪.১৭ শতাংশে নেমেছে।
একই সাথে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ব্যয়, ঋণ পরিশোধের চাপ এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক খাত ও সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্যের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তাই সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ সম্প্রসারণ এবং ব্যাংকবহির্ভূত অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়ানো এখন অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের এই প্রবণতা অর্থনীতির জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়লে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ওপর সম্ভাব্য চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য যখন বেসরকারি খাতে ঋণের প্রয়োজন, তখন ব্যাংকগুলোর অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ হলে ঋণ বিতরণের সক্ষমতা ও আগ্রহ প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ব্যাংকনির্ভরতা বাড়ছে
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারের মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি এবং ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যাংকবহির্ভূত ঋণের মধ্যে জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে নিট আট হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে।
কিন্তু অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের চিত্রে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের ঋণনির্ভরতা বেশি দেখা যাচ্ছে। জুলাই-আগস্টে ব্যাংক খাত থেকে নেয়া নিট ঋণ বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করেছে। অন্যদিকে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, আগস্ট শেষে সরকারের ব্যাংক খাত থেকে নেয়া নিট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৯৪ হাজার ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আগের বছরের আগস্ট শেষে এ স্থিতি ছিল পাঁচ লাখ ৩৬ হাজার ২৩৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের স্থিতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়েছে।
তবে জুলাই-আগস্টের সামগ্রিক চিত্রের বিপরীতে আগস্ট মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকার নিট ঋণ গ্রহণ না করে বরং ঋণ পরিশোধ করেছে। ওই মাসে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকার ১৬ হাজার ৪৪ কোটি ১০ লাখ টাকা ঋণ নিলেও পরিশোধ করেছে ১৭ হাজার ৬২৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ফলে আগস্টে ব্যাংক খাতে সরকারের নিট ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫৮৪ কোটি ২০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে আগস্টে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সরকার নিট এক হাজার ৮৩৬ কোটি ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। এ উৎস থেকে মোট ঋণ গ্রহণ ছিল ১১ হাজার ১৮৬ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ জুলাই মাসে ব্যাংক খাত থেকে নেয়া ঋণের কারণে দুই মাসের সামগ্রিক হিসাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাছে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে।
সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ ও অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতি
সরকারের ব্যাংকবহির্ভূত ঋণের অন্যতম উৎস জাতীয় সঞ্চয়পত্র। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৪৬৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল এক হাজার ৫৭২ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টে জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ১৮ হাজার ৫৭৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার। একই সময়ে মূলধন পরিশোধ হয়েছে ১৬ হাজার ১১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ফলে নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৪৬৩ কোটি ১০ লাখ টাকা।
এ ক্ষেত্রে পরিবার সঞ্চয়পত্র থেকে নিট দুই হাজার ৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র থেকে ৬৭৪ কোটি ১০ লাখ টাকা এসেছে। বিপরীতে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র থেকে নিট ৬১৮ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে সরকারের মোট নিট অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৭৬ হাজার ৫২১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। জুন শেষে এ পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৫৬ হাজার ৬০২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ দুই মাসে ঋণের স্থিতি বেড়েছে প্রায় ১৯ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণের স্থিতি ছয় লাখ ৯৪ হাজার ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত উৎসে চার লাখ ৮২ হাজার ৫০৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগও বেড়েছে। জুলাই-আগস্টে তফসিলি ব্যাংকগুলোর কাছে সরকারের ট্রেজারি বিলের স্থিতি বেড়েছে ১২ হাজার ৯৫২ কোটি ১০ লাখ টাকা। একই সময়ে ট্রেজারি বন্ডের স্থিতি বেড়েছে ১০ হাজার ১৯৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নের জন্য সরকার বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট সুকুক (বিজিআইএস) চালু করেছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ইজারা, ইস্তিসনা ও সালাম পদ্ধতিতে মোট ১১টি সুকুক বন্ড ইস্যু করা হয়েছে। আগস্ট ২০২৬ শেষে এসব সুকুকের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এদিকে ইসলামী ব্যাংক ও প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখা ও উইন্ডোগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট বন্ড (বিজিআইআইবি) ব্যবহৃত হচ্ছে। জুলাই-আগস্ট সময়ে এ তহবিলে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ কমেছে এক হাজার ৯৪৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। বিপরীতে এ তহবিল থেকে তাদের ঋণ গ্রহণ বেড়েছে তিন হাজার ১২০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে সেই ঋণের বড় অংশ এসেছে সরকারি সিকিউরিটিজের মাধ্যমে। তবে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








