প্রতিশ্রুতি ভেঙে ইরানে ফের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের

  নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন শুরু হওয়ার ঠিক আগে ইরানের হরমুজ প্রণালীর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে কোনও হামলা চালানো হবে না বলে এর আগে ঘোষণা দিলেও, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে মার্কিন প্রশাসন তাদের অবস্থান বদল করে এ পদক্ষেপ নিয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা এ হামলাকে ‘আত্মরক্ষামূলক’ সামরিক হামলা বলেই অভিহিত করছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথমে এ হামলার খবর প্রকাশ করেছে। সেখানে এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, এটি কোনো পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ বা বড় সামরিক অভিযান নয়, বরং ইরানের যুদ্ধ সক্ষমতা সীমিত করার একটি তাৎক্ষণিক কৌশলগত পদক্ষেপ। তবে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই এ হামলা তাৎপর্যপূর্ণ। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট  ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের সাথে সমঝোতা চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা দিচ্ছেন, ঠিক সে সময়েই এ হামলার খবর প্রকাশ্যে এলো।
মার্কিন ভোটারদের কাছে ইরান যুদ্ধ এবং এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি রিপাবলিকান পার্টির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছিল। তাই ট্রাম্প নির্বাচন পর্যন্ত কোনো হামলা না করার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু এ হামলার মধ্য দিয়ে তার সে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়েছে। ইরানের সংবাদমাধ্যম ইরনা সোমবার কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটার খবর দিয়েছে। কেশম দ্বীপের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, আকাশ দু’টি বিমানকে চক্কর কাটতে দেখেছেন তারা। যদিও এ হামলার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু জানায়নি পেন্টাগন। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর দাবি, ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ইরানে সীমিত মাত্রার একাধিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদেরকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, বৃহত্তর সামরিক অভিযান ফের শুরু করার কোনো ইঙ্গিত যাতে না যায়, সে কারণেই হামলাগুলোর পরিসর ছোট রাখা হয়েছে এবং বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছে। হরমুজ প্রণালীর প্রবেশদ্বারে অবস্থিত কেশম দ্বীপে ইরানের একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, একটি নৌঘাঁটি এবং একটি প্রধান পানি শোধন (লবণাক্ততা দূরীকরণ) প্ল্যান্ট রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে এ দ্বীপটি দখল করা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, হামলার সময় কেশম দ্বীপ ছাড়াও বন্দর আব্বাস ও হেঙ্গাম দ্বীপের কাছাকাছি প্রবল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন নির্বাচনের ঠিক আগে ট্রাম্প প্রশাসনের এ আকস্মিক সামরিক পদক্ষেপ পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
কেন বারবার হামলার লক্ষ্য কেশম দ্বীপ?
এর প্রধান কারণ দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হরমুজ প্রণালীর মুখে রয়েছে কেশম দ্বীপ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের বড় একটি অংশ এ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। কেশম দ্বীপে ইরানের একটি বড় ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, নৌঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় সামরিক অবকাঠামো রয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। এসব স্থাপনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী জাহাজের ওপর নজরদারি এবং সামরিক প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা রয়েছে ইরানের।
গত জুলাইয়েও কেশম দ্বীপে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) দাবি ছিল, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ড সেন্টার, ড্রোন স্থাপনা, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
ওই অভিযানে দ্বীপে তিনজন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছিল ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। এ ছাড়া যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে দ্বীপটির আশপাশের সামরিক ও নৌ-অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
হরমুজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই
কেশম দ্বীপকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ঠেকানো। ইরান এ নৌপথকে নিজেদের কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়ার ঘটনাগুলো নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলো ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়ার সক্ষমতা কমানোর পাশাপাশি মার্কিন সামরিক সম্পদকে নিরাপদ রাখার উদ্দেশ্যে চালানো হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকেরা জানিয়েছে, কেশম দ্বীপের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে পারলে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নজরদারি ও সামরিক তৎপরতা ব্যাহত করা সম্ভব হতে পারে। 
তবে এ ধরনের হামলা সংঘাত আরও বাড়িয়ে দেয়ার ঝুঁঁকিও তৈরি করছে।
হামলার কঠোর জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো সামরিক আগ্রাসন চালালে আগের চেয়েও আরো কঠোর ও বিস্তৃত জবাব দেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তেহরানের ভাষ্য, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে সংঘাত শুধু পশ্চিম এশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ছড়িয়ে পড়তে পারে আরো বিস্তৃত অঞ্চলে। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সি এ তথ্য জানিয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক অভিযান চালালে আগের তুলনায় আরো কঠোর ও ব্যাপক হামলার মুখে পড়বে। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে সংঘাতের ভৌগোলিক পরিসর পশ্চিম এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, শত্রুপক্ষের সব ধরনের স্থাপনা ও সম্পদকে লক্ষ্যবস্তু করতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হালনাগাদ করছে। আকরামিনিয়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে ইরানের হামলার আওতায় আসতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনা, সামরিক সরঞ্জাম, সেনাসদস্য ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা। এসব লক্ষ্যবস্তু ইরানের হামলার আওতার মধ্যে বিশ্বের যেখানেই থাকুক না কেন, সেগুলোতে আঘাত হানা হতে পারে। এ দিকে ইরানের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে স্থলভাগে নতুন যুদ্ধফ্রন্ট তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন এ সামরিক মুখপাত্র। তার অভিযোগ, ইরানের পশ্চিম সীমান্তসংলগ্ন উত্তর ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে অবস্থানরত সরকারবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করছিল শত্রুপক্ষ। এসব গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান চালানোর পরিকল্পনা ছিল। তবে ইরানের সামরিক ইউনিট মোতায়েন এবং ওই গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে আগাম অভিযান চালানোর মাধ্যমে সে পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন আকরামিনিয়া।
ইরানে মার্কিন হামলা নিয়ে রাশিয়ার কড়া সতর্কবার্তা
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। একই সাথে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে মস্কো বলেছে, সামরিক অভিযান, ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানির মাধ্যমে ইরানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংকল্প দুর্বল করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি ইরানের কেশম দ্বীপে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা আরো বেড়েছে। সোমবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক খবরে এসব তথ্য জানানো হয়। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেন, গত কয়েক মাসের ঘটনাবলি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানি জনগণের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আকাক্সক্ষা দমন করা সম্ভব নয়। যারা নতুন করে হামলার হুমকি দিচ্ছে কিংবা সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাদের অতীতের ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। সঙ্কট সমাধানে সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জাখারোভা। তিনি বলেন, সংঘাতের সাথে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা এবং তা বাস্তবায়নে মধ্যস্থতাকারীদের সহযোগিতা করতে রাশিয়া প্রস্তুত। এ দিকে, বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন রুশ এ মুখপাত্র। তিনি আরো বলেন, হরমুজ প্রণালী ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইরানের বৈধ স্বার্থের প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। একই সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌচলাচলের স্বার্থে সব দেশের জন্য এ নৌপথ নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখাও নিশ্চিত করতে হবে।