
আরফাত বিপ্লব চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে পরীক্ষক নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও বৈষম্যের অভিযোগে এবার ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধানরা। জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা থাকার পরও বিদ্যালয়ের সিনিয়র প্রধান শিক্ষকদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র শিক্ষকদের প্রধান পরীক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন একাধিক প্রধান শিক্ষক। শুধু তাই নয়, পতিত স্বৈরাচার সরকারের শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাহবুব হাসানের বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পছন্দের শিক্ষকদের প্রধান পরীক্ষক করার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন বঞ্চিত প্রতিষ্ঠান প্রধানরা। তাদের দাবি, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে প্রধান পরীক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতাকে পাশ কাটিয়ে অর্থ ও প্রভাবের খেলা চলছে।
ক্ষুব্ধ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধানদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এ অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। বরং বোর্ড চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে একাধিকবার বিষয়টি জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যার কারণে গতকাল প্রধান পরীক্ষক নিয়োগে বৈষম্য ও অনিয়মের প্রতিবাদে শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
স্মারকলিপিতে ২০১৮ সালের পর থেকে প্রধান পরীক্ষক নিয়োগে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বঞ্চিত করার অভিযোগ তুলে এর লিখিত ব্যাখ্যা দাবি করা হয়েছে। একই সাথে অতীতের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত, নিয়োগের অভিন্ন নীতিমালা প্রকাশ এবং জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রধান পরীক্ষক নিয়োগের দাবি জানানো হয়েছে।
ক্ষুব্ধ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রশ্ন, বছরের পর বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর শিক্ষককে প্রধান পরীক্ষকের দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হচ্ছে কেন? আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্তের কথা বলা হলেও সেই সিদ্ধান্তের লিখিত কপি কোথায়? কোনো প্রজ্ঞাপন বা বিধিগত নির্দেশনা ছাড়া প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নিয়োগের বাইরে রাখার যৌক্তিকতা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই বছরের পর বছর নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
স্মারকলিপিতে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা উল্লেখ করেন, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাহবুব হাসানের সময়ে প্রধান পরীক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের ঘটনা ঘটেছে। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সিনিয়র প্রধান শিক্ষকদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র শিক্ষকদের প্রধান পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার অভিযোগও তুলেছেন তারা।
তাদের দাবি, প্রধান পরীক্ষক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাডেমিক দায়িত্বে যেখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতা বিবেচনায় নেয়ার কথা, সেখানে এসব মানদণ্ড উপেক্ষা করে বিশেষ সুবিধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি জ্যেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধানদের তুলনামূলক কনিষ্ঠ শিক্ষকদের অধীনে সাধারণ পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। এটি শুধু পেশাগত মর্যাদার অবমাননা নয়, নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ক্ষুব্ধ প্রতিষ্ঠান প্রধানদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষা প্রশাসনে অনিয়ম ও বৈষম্য দূর হবে- এমন প্রত্যাশা ছিল সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে প্রধান পরীক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বোর্ড চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে বারবার অভিযোগ জানানো হলেও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
তাদের দাবি, শুধু ভবিষ্যতের নিয়োগ প্রক্রিয়া নয়, ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রধান পরীক্ষক নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করতে হবে। কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে কারা নিয়োগ পেয়েছেন, জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কেন বাদ দেয়া হয়েছে এবং নিয়োগে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা বের করতে হবে।
প্রধান পরীক্ষক নিয়োগে মহানগর এলাকার প্রতিষ্ঠান কিংবা সেখানে বসবাসকারী শিক্ষকদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হয় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্মারকলিপিদাতারা। তাদের দাবি, নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা অন্য কোনো বিশেষ বিবেচনা কাজ করে কি না, তা স্পষ্ট করতে হবে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও প্রকাশ্য নীতিমালা না থাকায় বৈষম্যের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
স্মারকলিপিতে প্রধান পরীক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন, আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের কথিত সিদ্ধান্তের লিখিত অনুলিপি প্রকাশ এবং অতীতের নিয়োগ প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রধান পরীক্ষক নির্বাচনে যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দক্ষতাকে বাধ্যতামূলক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধানেরা আশা করছেন, শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ প্রশাসনিকভাবেই এ বৈষম্যের অবসান ঘটাবে। স্মারকলিপিতে রাউজান, ফটিকছড়ি, চন্দনাইশ, হাটহাজারীসহ চট্টগ্রাম দক্ষিণ ও উত্তর জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা স্বাক্ষর করেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








