
আশরাফুল ইসলাম
বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে ও দেশীয় কোম্পানিগুলোর মূলধন সংগ্রহের সুযোগ সম্প্রসারিত করতে অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য অগ্রাধিকার শেয়ারে বিনিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করল বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নির্দেশনায় দেশের উৎপাদন ও সেবা খাতের আবাসিক কোম্পানিগুলো বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অনুকূলে প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যু করতে পারবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এসব শেয়ারের বিপরীতে লভ্যাংশ ও অবমুক্তকরণের অর্থ বিদেশে পাঠাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন হবে না। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ বিভাগ (এইআইডি) থেকে এ বিষয়ে এক সার্কুলার জারি করা হয়েছে। সার্কুলারটি অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশের উৎপাদনশীল ও সেবা খাতে পরিচালিত যে কোনো আবাসিক কোম্পানি কোম্পানি আইন-১৯৯৪, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিধিবিধান এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সংঘস্মারক ও সংঘবিধি অনুসরণ করে অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের অনুকূলে প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যু করতে পারবে। তবে এ ধরনের বিনিয়োগের অর্থ অবশ্যই বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় বাংলাদেশে আসতে হবে। প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যুর ক্ষেত্রে কোম্পানি ও বিদেশী বিনিয়োগকারীর মধ্যে একটি সাবস্ক্রিপশন চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। চুক্তিতে শেয়ারের সংখ্যা, অভিহিত মূল্য, ইস্যু মূল্য, লভ্যাংশের হার, মেয়াদ, অবমুক্তকরণ এবং সাধারণ শেয়ারে রূপান্তরের শর্তাবলি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
৫ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশে অনুমোদন লাগবে না
বাংলাদেশ ব্যাংক জারি করা সার্কুলারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অগ্রাধিকার শেয়ারের লভ্যাংশের হারের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনসংক্রান্ত বিধান সহজ করা। শেয়ারের অভিহিত মূল্যের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ নির্ধারণ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন হবে না। তবে এর বেশি লভ্যাংশ নির্ধারণ করা হলে যথাযথ যৌক্তিকতাসহ মনোনীত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান বা অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক বিনিয়োগ বিভাগের অনুমোদন নিতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ব্যবস্থা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের শর্ত সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সহজ করতে পারে। একই সাথে কোম্পানিগুলোর জন্য বিদেশী মূলধন সংগ্রহের একটি বিকল্প পথ তৈরি হবে।
রিপোর্টিং ও নথিপত্র সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার বলা হয়েছে, শেয়ার ইস্যুর ১৪ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট এডি ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের এফইআইডিতে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। শেয়ারগুলো অভিহিত মূল্যে ইস্যু করতে হবে। ফলে সাধারণভাবে শেয়ার ইস্যু ও অবমুক্তকরণের ক্ষেত্রে কোম্পানির মূল্যায়নের প্রয়োজন হবে না। তবে প্রেফারেন্স শেয়ার সাধারণ শেয়ারে রূপান্তরের সুবিধাসহ ইস্যু করা হলে সাধারণ শেয়ারের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
লভ্যাংশ ও মূলধন ফেরত পাঠানো সহজ
নতুন নির্দেশনায় বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রাখা হয়েছে। সার্কুলারের শর্ত মেনে ইস্যু করা প্রেফারেন্স শেয়ারের বিপরীতে লভ্যাংশ এবং অবমুক্তকরণের অর্থ বিদেশে পাঠাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন লাগবে না। তবে প্রযোজ্য বৈদেশিক মুদ্রা আইন, কর কর্তন ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত যথাযথভাবে পালন করতে হবে। মূল বিনিয়োগের অর্থ যে এডি ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশে এসেছে, লভ্যাংশ ও অবমুক্তকরণের অর্থও সেই ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠাতে হবে। একইভাবে বিনিয়োগের অর্থ যে দেশ থেকে বাংলাদেশে এসেছে, প্রত্যাবাসনের অর্থও সেই দেশে বিনিয়োগকারীর অনুকূলে পাঠাতে হবে। প্রতিটি অবমুক্তকরণ কিস্তির অর্থ বিদেশে পাঠানোর ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট এডি ব্যাংককে এফইআইডিতে পরবর্তী প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।
ব্যাংকের ওপর বাড়ছে তদারকির দায়িত্ব
নির্দেশনায় এডি ব্যাংকগুলোর দায়িত্বও স্পষ্ট করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে বছরভিত্তিক লভ্যাংশ ও অবমুক্তকরণের অর্থ প্রত্যাবাসনের হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে। উৎসে কর কর্তন এবং প্রত্যাবাসনযোগ্য অর্থের পরিমাণের সমর্থনে নিরীক্ষকের প্রত্যয়নপত্র রাখতে হবে। দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কাগজপত্রও সংরক্ষণ করতে হবে। এ ছাড়া এডি ব্যাংক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যাংকের অনাপত্তিপত্র নিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সব নথি নতুন ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, প্রেফারেন্স শেয়ার বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সাধারণ শেয়ারের তুলনায় এতে লভ্যাংশ ও মূলধন ফেরত পাওয়ার শর্ত আগে থেকেই নির্ধারণ করা সম্ভব। ফলে যেসব বিদেশী বিনিয়োগকারী সরাসরি সাধারণ শেয়ারে বিনিয়োগে আগ্রহী নন, তাদের জন্যও এটি একটি বিকল্প হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার কিছু প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে এবং অর্থ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদন ও সেবা খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এ সুবিধার কার্যকারিতা নির্ভর করবে নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়ন, ব্যাংকগুলোর দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, নতুন নির্দেশনার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে, দেশীয় কোম্পানিগুলোর মূলধন সংগ্রহের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে এবং বাংলাদেশের শিল্প ও সেবা খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








