বৈষম্য সত্ত্বেও অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত হতে চান হিজড়ারা

আব্দুল কাইয়ুম 

Advertisement

সামাজিক বঞ্চনা ও প্রচলিত পেশার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে আর্থিক স্বাবলম্বিতার নতুন পথ সৃষ্টি করছেন হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। কেউ হস্তশিল্প ও পোশাক তৈরি করছেন, কেউ খাবারের দোকান চালাচ্ছেন, আবার কেউ তৈরী পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করে নিজের এবং অন্যের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছেন। তবে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও কাজের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) জটিলতা, মূলধনের অভাব, সামাজিক বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চাকরির আবেদন, ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ গ্রহণ, ব্যবসার নিবন্ধন এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে পরিচয়পত্রসংক্রান্ত জটিলতায় অনেকেই পিছিয়ে পড়ছেন। ফলে প্রশিক্ষণ গ্রহণ বা ব্যবসা শুরু করলেও সেটিকে টেকসই আয়ের উৎসে পরিণত করা কঠিন হয়ে হয়ে উঠছে।
এমন প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করেই নিজেকে একজন হস্তশিল্প উদ্যোক্তা ও ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন টঙ্গীর আরোভি। শুরুতে লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে সামাজিক অবহেলা ও অর্থসঙ্কটে পড়তে হয়েছে তাকে। পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকায় খুচরা দোকান থেকে অল্প পরিমাণ কাপড় কিনে প্রতিবেশীদের সামনে বসে সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। তার কাজের মান ও নকশায় আকৃষ্ট হয়ে স্থানীয় মানুষ পোশাক ও নকশিকাঁথা তৈরির কাজ দিতে শুরু করেন।
করোনা মহামারীর সময় জীবিকার প্রয়োজনে সুপারশপে কাজ করলেও উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ছাড়েননি আরোভি। পরে ইউএনডিপির ‘আনন্দমেলা’ প্ল্যাটফর্মে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় নিজের তৈরি পোশাক প্রদর্শনের সুযোগ পান। নিজের ব্যবসার পাশাপাশি কমিউনিটির অন্য সদস্যদের দক্ষতা উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছেন তিনি। তার নেতৃত্বে ফোরটিএফের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের আওতায় ১৪০ জন হিজড়া সদস্যকে বিউটিশিয়ান প্রশিক্ষণ এবং শক্তি ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আরো ১০০ জনকে ব্যাগ তৈরি ও সেলাই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
আরোভির মতে, শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে উদ্যোক্তাদের পক্ষে স্বাবলম্বী হওয়া কঠিন। ব্যবসা পরিচালনার জন্য অর্থায়ন, উৎপাদিত পণ্যের বাজার এবং নিয়মিত সহযোগিতা প্রয়োজন। তার দাবি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অনুদান ও সরকারি পর্যায়ে পণ্য ক্রয়ের সুযোগ বাড়াতে হবে। 
একইভাবে প্রতিকূলতা কাটিয়ে উদ্যোক্তা হয়েছেন কনা চৌধুরী। ফরিদপুরের একটি শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠা কনা ঢাকার নতুন বাজার ও ভাটারা এলাকার একটি বায়িং হাউজে চাকরি করতেন। করোনা মহামারীতে চাকরি হারানোর পর পরিচিত এক হিজড়া উদ্যোক্তার দোকানে কাজ শিখে ২০২৩ সালে হাতিরঝিল এলাকায় নিজের ফাস্টফুডের দোকান চালু করেন। বর্তমানে তার ব্যবসায় আরো দু’জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। 
তবে ফুটপাথে দোকান হওয়ায় উচ্ছেদ অভিযানের সময় ব্যবসা বন্ধ রাখতে হয়। এতে আয় অনিয়মিত হয়ে পড়ে এবং ব্যবসা পরিচালনায় আর্থিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়। কনা চান, হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা যেন নিরাপদ ও স্থায়ী পরিবেশে কাজ করে সম্মানের সাথে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ‘প্রিয়া আপা’ নামে পরিচিত প্রিয়া খানও স্বাবলম্বিতার একটি উদাহরণ। দীর্ঘদিন শাহবাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহের পর ২০১৬ সাল থেকে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে শুরু করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শুভাকাক্সক্ষীদের সহযোগিতায় টিএসসিতে একটি চায়ের দোকান চালু করেন। নিজের ব্যবসার পাশাপাশি নদী নামে হিজড়া জনগোষ্ঠীর একজন সদস্য এবং সাকিব নামে আরেকজনকে কাজের সুযোগ দিয়েছেন তিনি। রাজধানীর গোড়ানে সিন্থিয়া ভূঁইয়ার উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘ভূঁইয়া ফ্যাশন’ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য মূলধারার কর্মসংস্থানের একটি উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটিতে পোশাক তৈরি, কাটিং, সেলাই, ব্লক-বুটিক ও মান নিয়ন্ত্রণের মতো কাজে কমিউনিটির সদস্যদের যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, হিজড়া জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম বড় বাধা জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত জটিলতা। অনেকের আগের নামের সাথে বর্তমান নামের অসামঞ্জস্য, লিঙ্গ পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, স্থায়ী ঠিকানা এবং প্রয়োজনীয় পারিবারিক নথিপত্রের অভাবে এনআইডি পাওয়া বা সংশোধন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই জটিলতার প্রভাব পড়ে চাকরি, ব্যাংকিং ও সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে। প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র ছাড়া অনেকেই ব্যাংক হিসাব খুলতে, ঋণের আবেদন করতে কিংবা আনুষ্ঠানিক চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অংশ নিতে সমস্যায় পড়েন। অন্য দিকে সামাজিক বৈষম্যের কারণে দোকানভাড়া, ব্যবসার জায়গা কিংবা মেলায় স্টল বরাদ্দ পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য শুধু প্রাথমিক পুঁজি নয়, নিয়মিত চলতি মূলধন, বাজারসংযোগ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগও প্রয়োজন। এসব সুবিধা না থাকায় অনেকে ব্যবসা শুরু করলেও তা দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনা করতে পারছেন না।
হিজড়া ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ব্যবসায়িক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনভিত্তিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বন্ধু সোস্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (বন্ধু)। এ ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি হিজড়া, তরুণ ও নারীসহ ২৬ জন উদ্যোক্তাকে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য প্রত্যেককে সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রণোদনা দেয়া হয়। সহায়তাপ্রাপ্ত উদ্যোক্তারা ফ্যাশন, খাদ্য, বিউটি সার্ভিস, কৃষি, পরিবেশবান্ধব পণ্য, হস্তশিল্প, খুচরা ব্যবসা ও সৃজনশীল সেবাসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন।
তবে শুধু আর্থিক সহায়তা বা প্রশিক্ষণ দিয়ে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এসব উদ্যোক্তার জন্য ব্যাংকিং সুবিধা, নিয়মিত বাজারসংযোগ, ব্যবসা পরিচালনায় পরামর্শ এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা প্রয়োজন। একই সাথে চাকরিপ্রত্যাশী হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যদের দক্ষতা অনুযায়ী নিয়োগের সুযোগ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
সমাজসেবা অধিদফতরের হিজড়া জনগোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির পরিচালক মোহাম্মদ শাহ জাহান জানান, সরকার হিজড়া জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি এবং পেশাগত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশে ১২ হাজার ৬২৯ জন হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্য রয়েছেন। তবে গত তিন বছরে সংশ্লিষ্ট সুবিধা গ্রহণে আবেদন করেছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার জন।
অন্য দিকে সমাজসেবা অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক এম এম মাহমুদউল্লাহ জানান, অধিদফতরের ভাতা ও অন্যান্য সেবা অনলাইন এবং এনআইডি যাচাইয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় পরিচয়পত্রবিহীন ব্যক্তিরা আবেদন করতে সমস্যায় পড়ছেন। বিশেষ করে আগের নাম ও বর্তমান নামের অসামঞ্জস্য, স্থায়ী ঠিকানা এবং মা-বাবার তথ্যসংক্রান্ত জটিলতা অনেকের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ আরো কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি জানান, হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য এক হাজার ২২৯ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে ভাতা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের একটি বিশেষ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। জেলা পর্যায়ে পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে এবং প্রশিক্ষণ শেষে পাঁচ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি পরবর্তী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি কর্মসূচি থাকলেও সেগুলোর সুবিধা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। একই সাথে প্রশিক্ষণ শেষে কতজন চাকরি পেয়েছেন, কতজন ব্যবসা শুরু করেছেন এবং কতজন নিয়মিত আয়ের সাথে যুক্ত হয়েছেন, সে তথ্যও গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করা দরকার।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বন্ধুর সাম্প্রতিক উদ্যোক্তা প্রণোদনা প্রদান অনুষ্ঠানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কেবল সামাজিক স্বীকৃতি দেয়াই যথেষ্ট নয়; প্রকৃত অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রতিষ্ঠান, সুযোগ-সুবিধা এবং সরাসরি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের প্রস্তাবিত ‘রেইনবো নেশন’ গড়ার আকাক্সক্ষা তখনই সার্থক হবে, যখন সব পরিচয়ের মানুষ বাস্তবে স্বীকৃতি ও সহায়তা পাবে। এজন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাধা দূর করতে সুনির্দিষ্ট নীতি ও কৌশল গ্রহণের ওপর জোর দেন তিনি। 
প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্যদের উদ্যোক্তা হওয়ার অদম্য সাহসের প্রশংসা করে ইউএন উইমেন বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ নবনীতা সিনহা বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও জাতিসঙ্ঘের সংস্থাগুলোকে একসাথে এগিয়ে এসে একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির ওপর জোর দিতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা সফলভাবে সম্প্রসারণ করতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশিক্ষণকে স্থানীয় শ্রমবাজার, শিল্প ও সেবা খাতের বাস্তব চাহিদার সাথে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষানবিসি, সরাসরি নিয়োগ, ব্যবসায়িক মেন্টরশিপ ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে হিজড়া উদ্যোক্তাদের জন্য বৈষম্যহীন সেবা, উপযুক্ত অর্থায়ন এবং আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।
হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা ইতোমধ্যে নিজেদের উদ্যোগ, দক্ষতা ও পরিশ্রম দিয়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছেন। এখন তাদের এই প্রচেষ্টাকে টেকসই করতে প্রয়োজন পরিচয়পত্রসংক্রান্ত জটিলতার সমাধান, কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ, সহজলভ্য অর্থায়ন এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় সহায়তা। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাত ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে আরো বিস্তৃত ও স্থায়ী করতে।