
শামছুল ইসলাম
স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত পরিমল সরকার। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২০ ব্যাচের এই কর্মকর্তা আওয়ামী শাসনামলে নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছেন। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর অর্ন্তবর্তী সরকারের সময়ে হওয়া পদোন্নতি থেকে বাদ পড়েন এই কর্মকর্তা। তাই এবার পদোন্নতি থেকে কোনোভাবেই বাদ পড়তে চান না এই কর্মকর্তা। নিজের পদোন্নতি নিশ্চিত করতে তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছ থেকে আধা সরকারি পত্র নিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
গত ১৩ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহকে লেখা আধা সরকারি পত্রে তিনি বলেন, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা পরিমল সরকার (পরিচিতি নম্বর ৬৭৭৭), যুগ্ম সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ আমার নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা। ২০০১ সাল থেকে তিনি সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে আসছেন। আমার মন্ত্রণালয়ে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে তথা সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নিষ্ঠা, দক্ষতা ও সততার সাথে কাজ করছেন। তার মতো একজন সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে সরকারের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেয়া প্রয়োজন।
অতএব, সরকারের নীতি বাস্তবায়ন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব পরিমল সরকারকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি প্রদানের জন্য আপনার আন্তরিক উদ্যোগ ও সহযোগিতা কামনা করছি।
গত ১৭ আগস্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই আধা সরকারি পত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ লিখেছেন, ‘মাননীয় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী অনুগ্রহ করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি।’
১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী তার চাকরি-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে প্রভাব খাটাতে পারেন না। সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ৩০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোন সরকারি কর্মচারী তাহার চাকরি-সংক্রান্ত কোন দাবির সমর্থনে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সরকার বা কোনো সরকারি কর্মচারীর ওপর রাজনৈতিক বা অন্য কোনো বহিঃপ্রভাব খাটাইতে বা খাটাইবার চেষ্টা করিতে পারিবেন না।’ একই আইনে তদবির করার জন্য সংসদ সদস্যদের কাছে যাওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। আইনটির ২০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো ব্যাপারে তাহার পক্ষে হস্তক্ষেপ করার জন্য সংসদ সদস্য বা অন্য কোনো বেসরকারি ব্যক্তিকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনুরোধ জানাইতে পারিবেন না।’
১৯৫৮ সালের ২৭ ফেব্রেুয়ারি জারি করা এক স্মারকেও কোনো সরকারি কর্মচারী তার চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্য কোনো মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের কাছে তদবির করতে পারবেন না বলে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
জনপ্রশাসন সূত্র জানায়, জনপ্রশাসনে পদোন্নতি ও মর্যদাপূর্ণ পদগুলোতে পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্য কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অব্যাহত এ ঘটনায় জনসেবাকে মুখ্য না মেনে তদবিরেই ভরসা রাখছেন। যে কারণে তারা নিজেদের পদোন্নতি এবং পদায়নে প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। অনেকটা নিরুপায় হয়ে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরাও বিধি লংঘন করে তাদের পক্ষে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কাছে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিচ্ছেন; তদবিরের মাধ্যমে পদোন্নতি ও পদায়ন পাওয়ায় জনসেবায় প্রাধান্য না দিয়ে তদবিরকারীদের খুশি করতেই ব্যস্ত থাকছেন। তাই কর্মচারীদের পক্ষে তদবির আইনত নিষিদ্ধ হলেও মানছেন না তদবিরকারীরা।
অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে তদবিরে এগিয়ে আছেন আওয়ামী সুবিধাভোগী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। শেখ হাসিনার আস্থাভাজন অর্থসচিব ড. মো: খায়েরুজ্জামান মজুমদার সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের সদস্য হওয়ায় পদোন্নতির জন্য জোর তদবির চালাচ্ছেন তার মন্ত্রণালয়ের আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা। নিজেদের পদোন্নতির জন্য কিছুটা অনিশ্চিত থাকলেও সম্প্রতি ড. মো: খায়েরুজ্জামান মজুমদার এর চুক্তির মেয়াদ বাড়ায় তারা কিছুটা নির্ভার রয়েছেন। এসকল কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন তারিকুল ইসলাম খান, আবুল বাশার, রওনক জাহান, দীর্ঘদিন মন্ত্রীপরিষদে পদায়ন থাকা উর্মি তামান্না, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদায়ন থাকা মো: এনামুল হক।
পদোন্নতির জন্য জোর তদবির চালাচ্ছেন আওয়ামী সুবিধাভোগী প্যারিসে পদায়ন থাকা এবং সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে সড়ক মন্ত্রণালয় থেকে বদলী করে দেওয়া দিলারা বেগম, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) থাকাকালে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগে বদলি হওয়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, শেখ হাসিনার শাসনামলে এনবিআর ও বিএমইটি-তে কাজ করা মোহাম্মাদ মিজানুর রহমান ভূইয়া, এ কে এম শওকত আলম মজুমদার, শেখ হাসিনার সময়ে লিবিয়ার কাউন্সিলর (শ্রম) দায়িত্ব পালন করা শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব গাজী মোহাম্মাদ আসাদুজ্জামান কবির, আওয়ামী শাসনামলে বিদ্যুৎ বিভাগে দায়িত্ব পালন করা মাহফুজা আখতার, প্রশাসন ক্যাডারের অফিসার হয়েও দীর্ঘদিন পররাস্ট্র মন্ত্রণালয়ে পোস্টিং থাকা মিজ আয়েশা হক, আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এর সাংস্কৃতি বিষয়ক কমিটির অন্যতম সদস্য এবং বিটিভির মা ও শিশু প্রকল্পের পিডি থাকাকালীন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা রিয়াসাত আল ওয়াসিফ, ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত থাকা মো: শফিউল আলম, শেখ হাসিনার সাবেক মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস-এর একান্ত সচিব বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের পরিচালক মো: ওসমান গনি, রাজউকের পরিচালক থাকাকালে দুর্নীতি ও অস্বাভাবিক সম্পদের অভিযোগ ওঠা বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের যুগ্মসচিব কাজী হাসান, আওয়ামী ঘরানার খাদ্য অধিদফতরের আইন উপদেষ্টা তনিমা তাসমিন, বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মাহে আলম।
জেলা প্রশাসক ছিলেন ৩০ কর্মকর্তা : এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হয়ে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন ৩০ কর্মকর্তা। এর মধ্যে ২০১৮ সালের রাতের ভোটের রিটানিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনজন। এসব কর্মকর্তা হলেন, সিলেটের সাবেক ডিসি এম কাজী এমাদুল ইসলাম, ঢাকার জেলা প্রশাসক মো: শহীদুল ইসলাম, ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম।
এ ছাড়াও শেখ হাসিনার শাসনামলে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তারা হলেন, গাইবান্ধার সাবেক জেলা প্রশাসক মো: আবদুল মতিন, পাবনা ও বরগুনার সাবেক জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ, ময়মনসিংহ ও জামালপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ এনামুল হক, দিনাজপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম, নওগাঁর সাবেক জেলা প্রশাসক হারুন অর রশীদ, কক্সবাজার ও বাগেরহাটের সাবেক জেলা প্রশাসক মামুনুর রশীদ, পঞ্চগড়ের সাবেক জেলা প্রশাসক ড. সাবিনা ইয়াসমিন, টাঙ্গাইল ও মেহেরপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক ড. আতাউল গনি, আওয়ামী মন্ত্রী ডা. দীপু মনির একান্ত সচিব ও পিরোজপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক আবু আলী মো: সাজ্জাদ হোসেন, খাগড়াছড়ির সাবেক জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস, ঝালকাঠির সাবেক জেলা প্রশাসক জোহর আলী, গোপালগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা, সিরাজগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহম্মদ, কুমিল্লা ও হবিগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাবেক জেলা প্রশাসক হায়াত উদ দৌলা খান, রাজবাড়ীর সাবেক জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম, সাতক্ষীরার সাবেক জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল, লালমনিরহাটের সাবেক জেলা প্রশাসক আবু জাফর, বরগুনা ও নারায়ণগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ, ফরিদপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক অতুল সরকার, খুলনা ও মুন্সীগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক মনিরুজ্জামান তালুকদার, নড়াইলের সাবেক জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা, রংপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক আসিব আহসান।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তারা হলেন, পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক একান্ত সচিন মোহাম্মদ এনামুল হক, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক একান্ত সচিব আহমদ কবীর, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক একান্ত সচিব আবু আলী মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক একান্ত সচিব জাহিদুল ইসলাম, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক একান্ত সচিব মোহাম্মদ কামরুল হাসান।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








