
বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেছেন, শ্রমিক অসন্তোষ হলে সমাধানের চেয়ে অসন্তোষের কার্যকারণটা খুঁজে বের করা জরুরি। সমস্যার প্রকৃতি হচ্ছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বাজার দর, মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাপন ব্যয় আর শ্রমিকদের আয়ে ফারাকটা কোনোভাবেই নিরসন হচ্ছে না।
তিনি বলেছেন, স্থায়ী মজুরি কমিশন গঠন করে শ্রমিক অসন্তোষের সমাধান করা না হলে এ ধরনের অসন্তোষ বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। পৃথিবীর অন্তত ৯০টি দেশে স্থায়ী কমিশন শ্রমিকদের স্থিতিশীল পরিবেশ কাজের নিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, চাকরি নিয়ে শ্রমিকরা নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে থাকেন, কখনো ব্লাক লিস্টিংয়ের ঝুঁকি, কখনো কাজ হারানোর ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। সরকারের যেকোনো একটা ঘোষণা শ্রমিকদের ওপর প্রভাব ফেলে, যেমন পে-স্কেলের ঘোষণার পর জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। একইভাবে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির সাথে জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে। সবকিছুর দাম বাড়লে শেষ আঘাতটা স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের ওপর গিয়ে পড়ে। ফলে এ অসন্তোষ থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। পুরনো পথে হেঁটে নতুন সমস্যার সমাধান করা যাবে না। আগের সরকারের আমলে বারবার বলা হয়েছে এটা বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র, এটা গার্মেন্ট খাত ধংস করার ষড়যন্ত্র, বারবার শুনেছি গার্মেন্ট খাতকে অস্থিতিশীল করে কোনো পক্ষ লাভ নিতে চায়। তার প্রতিক্রিয়ায় দমন, পীড়ন, জেল, জুলুম, হুলিয়া, নির্যাতন এবং শেষ পর্যন্ত কিছু দাবি মেনে নেয়া।
নয়া দিগন্ত : কিছু দাবি মেনে নেয়ার মানে তাদের দাবি যৌক্তিক, তাহলে বিষয়টি একেবারে সুরাহা হয় না কেন?
রাজেকুজ্জামান রতন : গার্মেন্ট শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ৪৮ হাজার মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে মামলাগুলো দেয়া হয়েছিল, তার মানে এগুলো যৌক্তিক ছিল না। একটা স্থায়ী মজুরি কমিশন না হলে বারবার এ ধরনের অসন্তোষ এড়ানো যাবে না। এ ধরনের কমিশনের একটা রিসার্চ উইং থাকবে, তারা শ্রমিকদের উৎপাদিত শক্তির নিরিখে তারা কতটা ভ্যালু অ্যাডিশন করে, আন্তর্জাতিক বাজারে পরিস্থিতিটা কি, মালিকদের মুনাফা ও শ্রমিকদের মজুরি-এসব প্রতিনিয়ত যাচাই করে স্থায়ী মজুরি কমিশন গার্মেন্ট খাত দেখভাল করবে। বিশ্বের ৯০টি দেশে প্রতি বছর এভাবেই মজুরি রি-শিডিউল করা হয়। গার্মেন্টের ওপর নির্ভরশীল কম্বোডিয়াতেও এভাবে মজুরি নির্ধারণ করা হয়। যদি শ্রমিকরা এটুকু ভরসা পায় বাজার দরের সাথে সঙ্গতি রেখে প্রতি বছর তাদের মজুরি রি-শিডিউল করা হবে, দ্বিতীয়ত, তাদেরকে আন্দোলনে যেতে হবে না; বরং আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব, যাতে তারা কোনো উসকানির শিকার না হয়।
নয়া দিগন্ত : এবারে উসকানিটা কিভাবে শুরু হলো?
রাজেকুজ্জামান রতন : প্রথম উসকানি হচ্ছে অনেকগুলো কারখানায় নিয়মিত তারা মাসিক মজুরি পায় না, আইন অনুযায়ী প্রত্যেক মাসের মজুরি পরের মাসের সাত কর্মদিবসের মধ্যে দেয়ার কথা, প্রথম আন্দোলনে গার্মেন্ট শ্রমিকরা নামল বকেয়া মজুরির দাবিতে, সরকার আইন করল প্রতি তিন বছর পর পর মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করা হবে কিন্তু গার্মেন্ট মালিকদের একাংশ বলতে শুরু করলেন এটা সম্ভব না। শ্রমিকরা তখন আতঙ্কিত হয়ে মনে করলেন তাহলে বোধহয় মজুরি বোর্ড আর হচ্ছে না। মজুরি নির্ধারণ কত হবে সে আলোচনার আগেই একটা আকাক্সক্ষা ছিল ন্যূনতম মজুরির একটা মাপকাঠি থাকা দরকার, এরই মধ্যে সরকার পে-স্কেল ঘোষণা করল, শ্রমিকরা বললেন, আমরা তো উৎপাদনের সাথে জড়িত শ্রমশক্তি, সরকার ঘোষিত পে-স্কেলের সর্বনিম্ন যে মজুরি তার চেয়েও কি আমাদের বেতন কম হবে? অর্থাৎ সরকারের পে-স্কেল ঘোষণা, বকেয়া মজুরি ও মালিক পক্ষের তিন বছরের মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠনে অনিচ্ছা এ তিন ধরনের অনিশ্চয়তা গার্মেন্ট শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনার খোরাক হিসেবে কাজ করেছে। তবে বাইরের উসকানিকে বড় করে দেখলে শ্রমিকদের ভিতরের অসন্তোষটা দেখতে পারব না। এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে বলছেন, আওয়ামী লীগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঠিক একইভাবে কথা বলেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একই কথা বলা হয়েছে। আবার মালিকরা সবসময় বলছেন, তাদের পক্ষে সম্ভব না মজুরি দেয়া; বরং তারা বলতে পারতেন আলোচনার কথা। বলতে পারতেন আমরা বিনিয়োগ করেছি পুঁজি, আপনার বিনিয়োগ করেছেন শ্রমশক্তি।
নয়া দিগন্ত : অনেক দিন ধরেই তো গার্মেন্ট খাতে একটা স্থিতিশীল পরিবেশ কিভাবে ধরে রাখা যায় তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
রাজেকুজ্জামান রতন : অনেক দিন ধরেই তো সোশ্যাল ডায়ালগ হবে, কালেক্টিভ বার্গেনিং হবে, সেগুলো কোথায়? সরকার পরিস্থিতি উন্নতির কথা বলছে, মালিকরা নানা ধরনের ট্রেনিং নিচ্ছেন কিভাবে তারা পরিবেশ আরো উন্নত করবেন। কর্মক্ষেত্রে পরিবেশ উন্নত তো শুধু ফায়ার সেফটি বা বিল্ডিং সেফটি না, তাদের তো কাজের নিরাপত্তা দরকার এবং যে মজুরি পাবেন তাতে জীবনযাপনের সেফটি থাকবে কি না? বিল্ডিং সেফটি হলে সেখানে শ্রমিক কাজ করলে তাদের জীবনে উন্নয়ন হচ্ছে কি না? সে কারণে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করে দিয়েছে এখন এ বোর্ড বসে শ্রমিকদের দাবি বিশ্লেষণ করে, দুই পক্ষের কথা শুনে একটা সেটেলমেন্টে যাওয়া খুবই জরুরি। একই সাথে পুলিশের অতি উৎসাহী দমনপীড়ন নীতিটা পরিহার করা দরকার। একই সাথে শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে তারা ঠিক বুঝতে পারছে না কোথা থেকে এ অসন্তোষটা হচ্ছে, তাদেরও ঐক্যবদ্ধভাবে বলতে হবে, আন্দোলন করতে চাই; কিন্তু আন্দোলন মানে নৈরাজ্য নয়। সুনির্দিষ্ট দাবির ভিত্তিতে আন্দোলন হওয়া প্রয়োজন কিন্তু উসকানিমূলক কার্যকলাপ শ্রমিকদের আন্দোলনকে অকার্যকর করে দিচ্ছে কি না সে দিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। এতে মূল ফোকাসটা সরে যাচ্ছে ভাঙচুরে, মূল ফোকাসটা আর মজুরিতে থাকছে না।
নয়া দিগন্ত : ভারত, শ্রীলঙ্কার মতো দেশে তো গার্মেন্ট খাতে মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি ওরা কিভাবে পারছে?
রাজেকুজ্জামান রতন : গার্মেন্ট মালিকদের এটা অনুধাবন করতে হবে। তাদের সম্প্রীতি ও সম্পদ বৃদ্ধিতে কোনো ঘাটতি নেই। অ্যাটিচিউড অব দি গভর্নমেন্ট, সরকারের সবসময় মালিকদের প্রশয় দেয়ার যে নীতি, মালিকদের রক্ষা করাই সরকারের যেন প্রধান কাজ হয়ে যায়, খেয়াল করে দেখুন শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির প্রভাব কিন্তু গোটা সমাজেই পড়ে, বাজার থেকে শ্রমিক যখন জিনিসপত্র কেনে তার প্রভাব তো গোটা অর্থনীতিতেই পড়ে।
নয়া দিগন্ত : গার্মেন্টকর্মীদের দিকে ভালো করে তাকালে অধিকাংশই তো রুগ্ন মনে হয়।
রাজেকুজ্জামান রতন : তাতো বটেই। যেসব নারী শ্রমিকের বয়স পঁয়ত্রিশ ক্রস করে গেছে তাদের চেহারার মধ্যে কেমন একটা বিমর্ষতার ছাপ, মোটা কারণ কার্বহাইড্রেট ছাড়া অন্য কিছু খুব একটা খেতে পারে না। মানে সুস্থ নয়। আর যারা ইয়াং তাদের মধ্যে একটা অস্থিরতা কারণ তারা জানে না তাদের চাকরিটা আসলে কতদিন থাকবে, সবসময় একটা অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে তারা থাকে। শরীর ও মনে একটা আস্থার অভাব। পুষ্টি পেতে হলে তো সে পরিমাণ টাকা লাগবে। তাদের বাসায় গেলে তারা কোথায় ঘুমায় দেখবেন, প্রচণ্ড গরমে আমরা যখন হাঁসফাঁস করি তখন তাদের থাকার পরিবেশটা দেখলে...
নয়া দিগন্ত : প্রধান রফতানি আয়ের খাতে একটা স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তো সবাই মিলে বসা দরকার।
রাজেকুজ্জামান রতন : সে জন্য শ্রম সংস্কার কমিশন বলেছিল, মজুরি নির্ধারণে যদি একটা স্থায়ী কমিশন থাকে, নিয়মিত গবেষণা করে দেখবে, কী পরিমাণ শ্রমশক্তি দিয়ে কী পরিমাণ মজুরি শ্রমিক পেতে পারে, মজুরি কম দেয়ার জন্যে এ কমিশন নয়, উদাহরণ দিতে পারি, প্রকাশনা শিল্প বা হাসপাতালের সাথে জড়িত যারা আছেন তারা কি প্রপার মজুরি পান, আয়া বা বুয়া, তারা তা না পেলে বাধ্য হয় রোগীদের জিম্মি করতে, পরিবহন খাতেও দেখেন কোনো নিয়োগপত্র নেই, পরিচয়পত্র নেই, নির্মাণশ্রমিক বলুন, এমন কোনো খাত নেই যেখানে সে যে শ্রমশক্তি দেয় সে অনুযায়ী সে মজুরি পায়, সবখাতেই লামসাম, তোমাকে আমি করুণা করে মজুরি দিলাম।
নয়া দিগন্ত : ঘনবসতির দেশ, শ্রমঘন শিল্পের কোনো বিকল্প নাই তাহলে মজুরি যথাযথ না করে উন্নয়ন কিভাবে নিশ্চিত করা যায়
রাজেকুজ্জামান রতন : সবসময় আমরা বারুদের স্তূপের মধ্যেই থাকি। যেকোনো অসন্তোষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তার উত্তেজনা বাড়তে থাকে। সরকার আশ্বস্ত করুক মজুরি বোর্ড যথাযথভাবে কাজ করবে, বকেয়া মজুরি অবিলম্বে পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে, মজুরি বকেয়া রেখে শ্রমিকদের অশান্ত করার জন্য মালিকদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে এবং পুলিশের দমনে অতিউৎসাহ বন্ধ করতে হবে যেন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে না পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








