বিএলডিসি ফ্যানে সাশ্রয় হবে ৯ হাজার কোটি টাকা
  • পিক আওয়ারে ২,৫৯০ মেগাওয়াট চাহিদা কমবে
  •  মাত্র ১.৪ শতাংশ পরিবারে আছে শক্তিসাশ্রয়ী ফ্যান

দেশের সব সাধারণ সিলিং ফ্যান শক্তিসাশ্রয়ী ব্রাশলেস ডিরেক্ট কারেন্ট (বিএলডিসি) ফ্যানে রূপান্তর করা গেলে গ্রীষ্মকালীন সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় দুই হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট কমানো সম্ভব। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
‘ঐড়ঁংবযড়ষফ ংঢ়ধপব পড়ড়ষরহম রহ ইধহমষধফবংয: জড়ষব ড়ভ বহবৎমু-বভভরপরবহঃ ভধহং’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন আইইইএফএর দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রধান এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম। ২৬টি জেলার ৪৩৫টি পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে এটি প্রকাশ করা হয়।
গৃহস্থালি কুলিংয়ে বিদ্যুতের চাপ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গৃহস্থালিতে বাতাস ঠাণ্ডা রাখার কাজে ব্যবহৃত ফ্যানগুলো একাই গ্রীষ্মকালীন বিদ্যুৎচাহিদায় পাঁচ হাজার ২১২ মেগাওয়াট পর্যন্ত যোগ করে। গরমের দিনে রাত ৯টার দিকে বিদ্যুতের ব্যবহার যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে, তখন এসব ফ্যানের ভূমিকা বড়। চলতি বছরের ২৭ আগস্ট রাতে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎচাহিদা ১৯ হাজার ২৭ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর পেছনেও এর বড় অবদান ছিল।
সাধারণ ফ্যান চালাতে ৭০ ওয়াট বা তার বেশি বিদ্যুৎ লাগে। সেখানে আধুনিক বিএলডিসি ফ্যান চলে মাত্র ৩৫ ওয়াটে। অথচ পর্যাপ্ত সচেতনতা ও বাজারজাতকরণের অভাবে দেশের মাত্র ১.৪ শতাংশ পরিবারের কাছে এই শক্তিসাশ্রয়ী ফ্যান রয়েছে।
৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি সাশ্রয়
আইইইএফএর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অপরিকল্পিতভাবে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চেয়ে চাহিদামুখী ও শক্তিসাশ্রয়ী উদ্যোগকে প্রাধান্য দেয়া অনেক বেশি লাভজনক। বিএলডিসি ফ্যানের ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে চার বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অতিরিক্ত বিনিয়োগ এড়ানো যাবে।
এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ছয় হাজার ৯১৩ গিগাওয়াট-আওয়ার বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় আট হাজার ৯,৮৭ কোটি টাকা (০.৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে প্রায় আট কোটি ৬০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ রোধ করা সম্ভব হবে।
সচেতনতার ঘাটতি, বাধা উচ্চ দাম
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ বিল কমাতে মানুষের আগ্রহ প্রবল হলেও শক্তিসাশ্রয়ী ফ্যান সম্পর্কে ধারণা কম। জরিপে অংশ নেয়া পরিবারের প্রায় ৭৫ শতাংশ জানে না, বাজারে এ ধরনের ফ্যান পাওয়া যায়। তবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সুফল জানার পর ৯৬ শতাংশ গ্রাহক এগুলো ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
মূলত উচ্চ প্রাথমিক খরচই সাধারণ মানুষের এই পরিবর্তনের পথে প্রধান বাধা। শফিকুল আলম গতকাল সোমবার নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজারে সাধারণ মানের একটি ফ্যানের দাম প্রায় দুই হাজার টাকা। আর একটি বিএলডিসি ফ্যানের দাম পড়ে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার ৩০০ টাকা। নি¤œ আয়ের পরিবারের (মাসিক আয় ২৫ হাজার টাকার নিচে, যারা মোট পরিবারের প্রায় ৪০ শতাংশ) ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা ছাড়া এই বিনিয়োগ তুলে আনতে ৭.৭ থেকে ৯.৬ বছর লেগে যায়। তবে সরকারি উদ্যোগে পাইকারি ক্রয় এবং কার্বন রাজস্ব যুক্ত করা গেলে ব্যয় ও পে-ব্যাক পিরিয়ড কমিয়ে ৪.৮ বছরে নামিয়ে আনা সম্ভব।
সাত দফা সুপারিশ
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ওপর থেকে লোডশেডিং ও বাড়তি চাপ কমাতে নীতিনির্ধারকদের জন্য সাতটি সুপারিশ করেছে আইইইএফএ:
১. জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়ন: শক্তি-সাশ্রয়ী গৃহস্থালি ফ্যানের জন্য জাতীয় কর্মসূচি নেয়া এবং বাস্তবায়নে ‘সুপার এনার্জি সার্ভিস কোম্পানি (এসকো)’ গঠন করা।
২. সচেতনতা বৃদ্ধি : শক্তি-সাশ্রয়ী ফ্যানের আর্থিক ও পরিবেশগত সুফল নিয়ে দেশব্যাপী প্রচার চালানো।
৩. মান ও লেবেলিং চূড়ান্তকরণ: টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) মাধ্যমে ফ্যানের এনার্জি স্ট্যান্ডার্ড ও লেবেলিং চূড়ান্ত করা, যাতে ভোক্তারা সহজে ভালো পণ্য চিনতে পারেন।
৪. ব্যয় হ্রাস কৌশল: পাইকারি ক্রয়ের মাধ্যমে নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য বিএলডিসি ফ্যানের দাম নাগালের মধ্যে আনা এবং কার্বন আয়ের অর্থ এতে পুনর্ব্যবহার করা।
৫. অর্থায়ন ব্যবস্থা : বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির সহায়তায় ‘অন-বিল ফাইন্যান্সিং’-এর মতো সহজ কিস্তি চালু করা।
৬. কার্যকর বাস্তবায়ন: প্রস্তাবিত সুপার এসকোর মাধ্যমে পুরো কর্মসূচি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা।
৭. মান নিয়ন্ত্রণ: পণ্যের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা যাচাইয়ে শক্তিশালী মনিটরিং ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল কাঠামো তৈরি করা।

Advertisement