
পুঁজিবাজারের দরপতন থামছে না। প্রতিদিনই এর মাত্রা বেড়ে চলেছে। আর এর ফলে ফাঁকা হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের পকেট। গতকাল একদিনেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বাজার মূলধনের ৬ হাজার ৩৬ কোটি টাকা হারিয়ে বসে। সকালে ৬ লাখ ৭৪ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে লেনদেন শুরু করা বাজারটির মূলধন গতকাল লেনদেন শেষে ৬ লাখ ৬৮ হাজার ১১১ কোটি টাকায় নেমে আসে। অর্থাৎ মাত্র একদিনেই বিনিয়োগকারীদের পকেট থেকে এ পরিমাণ মূলধন হাওয়া হয়ে গেল। আর প্রতিদিনই এভাবে মূলধন হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। হতাশায় ভেঙে পড়া বিনিয়োগকারীদের এখন ত্রাহী অবস্থা। অথচ সংশ্লিষ্টদের নেয়া নানা উদ্যোগ বাজার পরিস্থিতির কোনো উন্নতি ঘটাতে পারছে না। পতনের চক্র থেকে বের হতে পারছে না পুঁজিবাজার।
রোববার দেশের দুই পুঁজিবাজার যে পরিমাণ সূচক হারায় গতকাল সোমবার তা আরো বৃদ্ধি পায়। গত সপ্তাহের শুরু থেকে হিসাব করলে মোট সাতটি কর্মদিবসের ছয়টিতেই দুই পুঁজিবাজারের সব সূচকের অবনতি ঘটে। আর এভাবেই প্রতিদিন সর্বস্বান্ত হয়ে চলেছেন পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা। কালেভদ্রে সূচকের নামমাত্র উন্নতি ঘটলেও তা টেকসই হচ্ছে না। ফের পতনের আবর্তে ফিরে যাচ্ছে বাজার। দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও বৈশি^ক অস্থিরতা পুঁজিবাজারকে সামনের দিনগুলোতে কোন দিকে নিয়ে যায় তা নিয়ে চরম আতঙ্কের মধ্যে বিনিয়োগকারীরা।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৫১ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট হারায়। ৫ হাজার ৩৮৫ দশমিক ১৪ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিন শেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৩৩৩ দশমিক ৫৭ পয়েন্টে। এর আগে রোববার ৩২ দশমিক ২৮ পয়েন্ট সূচক হারায় ডিএসই। এ নিয়ে গত দু’দিনে ৮৩ পয়েন্টের বেশি হারাল সূচকটি। সোমবার ডিএসই’র দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই-শরিয়াহ সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২৬ দশমিক ২৮ ও ৮ দমমিক ১১ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ১০৫ দশমিক ০১ পয়েন্ট হারায়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিনএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১৪৭ দশমিক ৬১ ও ৬১ দশমিক ০৮ পয়েন্ট।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা সাম্প্রতিক সময়ের পুঁজিবাজার আচরণে খুবই হতাশ। এর মধ্যে গতকাল প্রধান পুঁজিবাজারটি যেভাবে মূলধন হারাল তা খুবই অপ্রত্যাশিত বলে মনে করেন তারা। তারা মনে করেন সূচকের অবনতির বিচারে এ বেশি পরিমাণ মূলধন হারানো অনেকটা উদ্বেগের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে সার্বিক পুঁজিবাজার পরিস্থিতির জন্য তারা দেশের চলমান অর্থনৈতিক অবস্থার পাশাপাশি বৈশি^ক নানা অস্থিরতাকেও দায়ী করেন।
চলমান পুঁজিবাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিএসই) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, একদিকে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি তৈরী পোশাক শিল্প এ মুহূর্তে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পার করছে। অন্য দিকে বড় ধরনের যুদ্ধাশঙ্কাসহ বৈশি^ক নানা অস্থিরতায় আমাদের অর্থনীতির অন্য চালিকাশক্তি রেমিট্যান্সকেও হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই চলছে অস্থিরতা। ওখান থেকেই আমাদের রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ আসে। সব মিলিয়ে কোথাও ভালো কোনো বার্তা নেই।
দিনের বাজার আচরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এত কিছুর পরও পুঁজিবাজারের এত বেশি পতনের কারণ দেখি না। এর কারণ হিসাবে তিনি মনে করেন, বাজারে এ মুহূর্তে বড় বিনিয়োগকারী নেই বললেই চলে। তাই ডিবিএর পক্ষ থেকে বড় বিনিয়োগকারীদের বাজার টানতে মূলধনী মুনাফার ওপর ২০৩০ সাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ কর রেয়াত চাওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রী দেশে ফিরলে এর একটা সুরাহা হতে পারে। এটি সুরাহা হলে বাজারে বড় বিনিয়োগকারীরা ফিরে আসতে পারেন।
বাজার পরিস্থিতি উত্তরণে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি আজ মঙ্গলবার ডিএসইর লিডিং ব্রোকার্সদের সাথে মতবিনিময় করার কথাও উল্লেখ করেন যেখানে পুরো বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার মতামত গ্রহণ করে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে। এই সময় পর্যন্ত তিনি বিনিয়োগকারীদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেন যাতে কেউ আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি না করে বরং ভালো সময়ের অপেক্ষা করেন।
গতকাল দুই পুঁজিবাজারের সব খাতেই বড় ধরনের দরপতনের ঘটনা ঘটে। বেশ কয়েকটি খাতে শতভাগ কোম্পানিই দরপতনের শিকার হয়। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি ছিল মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি নিয়ে গড়া ডিএসই-৩০ সূচকের অধীনে থাকা কোম্পানিগুলো। গতকাল এ সূচকটির অধীনে থাকা কোম্পানির সবটিরই বড় দরপতন ঘটে। বাজার মূলধনের এত বড় অবনতির কারণও সূচকটির বড় অবনতি। গ্রামীণফোন, ব্র্যাক ব্যাংক, রবি অজিয়াটা ও পূবালী ব্যাংকের মতো বড় মূলধনের কোম্পানিগুলো গতকাল বড় ধরনের দর পতন ঘটায় একদিনে এত বেশি পরিমাণে মূলধন হারাল ডিএসই।
ডিএসইতে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে টেক্সটাইল খাতের কোম্পানি ইভিন্স টেক্সটাইলস। ১৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়। ১৪ কোটি ২৯ লাখ টাকায় ১৫ লাখ ১০ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল একই খাতের মতিন স্পিনিং মিলস। লেনদেনে ডিএসইর শীর্ষ ১০ সিকিউরিটিজের অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে পিএফআই ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এনভয় টেক্সটাইলস, ব্র্যাক ব্যাংক, প্রাইম ফিন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, নাহি অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট, সায়হাম টেক্সটাইলস, এমএল ডাইং ও প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








