
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের প্রধান রফতানি আয়ের খাত তৈরী পোশাকশিল্পে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিকদের সহিংস আন্দোলন রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর ও আশুলিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। রোববার মিরপুরে শ্রমিকদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং মেট্রোরেলের কয়েকটি স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক প্রায় ছয় ঘণ্টা অবরোধের পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। শ্রমিক অসন্তোষ অব্যাহত থাকায় গতকাল ঢাকা, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় অন্তত ৩০০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া ও গাজীপুর শিল্প পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন।
এ দিকে শ্রমিকদের এই আন্দোলনে আত্মগোপনে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ শতাধিক নেতাকর্মীরা ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের ভাষ্য, বিভিন্ন জেলা থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ নেতাকর্মীরা এই আন্দোলনে শামিল হয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা। আন্দোলন থেকে গ্রেফতার ১১ জনকে আটক করে ডিবি পুলিশ।
অপর দিকে শ্রমিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আজ সোমবার থেকে কারখানা বন্ধ রাখতে মালিকরা বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
শ্রমিকদের বর্তমান দাবির কেন্দ্রে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি। বর্তমানে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকেরা তা বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন। অর্থাৎ প্রস্তাবিত মজুরি বর্তমান ন্যূনতম মজুরির দ্বিগুণেরও বেশি। অন্য দিকে মালিকপক্ষের জন্য একবারে এত বড় মজুরি বৃদ্ধি বাস্তবায়নের প্রশ্নে উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের ন্যায্য দাম আদায়ের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী রোববার সচিবালয়ে এ ঘোষণা দেন। তবে শ্রমিকদের তাৎক্ষণিক দাবি- মালিকদের সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মূল্যনীতি এবং সরকারের নীতিগত অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় না হলে এই বোর্ডের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
মিরপুরে সংঘর্ষ,গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ
রোববার সকালেও মিরপুরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সকাল ৯টার দিকে কয়েকশ’ শ্রমিক মিরপুর-১০ গোলচত্বরসহ আশপাশের কয়েকটি সড়ক অবরোধ করেন। মিরপুর-১০, ১১, ১২ ও ১৪ নম্বর এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। পুলিশ শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করলে বেলা ১১টার পর দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। একপর্যায়ে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়।
নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে মেট্রোরেলের মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশনে কয়েক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল ও যাত্রী ওঠানামা বন্ধ রাখতে হয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে স্টেশনগুলো খুলে দেয়া হয়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার অবরোধের পর শ্রমিকেরা সড়ক ছাড়লে মিরপুরে যান চলাচলও স্বাভাবিক হয়।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবরোধের কারণে দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে। পুলিশ ও শ্রমিকদের সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরে শ্রমিকেরা সড়ক ছেড়ে কাজে ফেরায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। আশুলিয়ার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। গতকাল দুপুরে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নেমে আসেন। নরসিংহপুর এলাকায় আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, আগের দিন বন্ধ থাকা অন্তত ৩০টি কারখানায় রোববার সকালে উৎপাদন শুরু হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় রোববার অর্ধশতাধিক কারখানা কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। একই সময়ে তিনটি কারখানায় শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রাখেন।
এ ছাড়া রোববার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডে শ্রমিকরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ ও অবরোধ শুরু করেন। পরে বিকেল ৫টার দিকে পুলিশ এসে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়।
পুলিশ জানায়, বেলা সাড়ে ৩টার দিকে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডে এ কে এইচ নামে একটি তৈরী পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করেন। পরে আশপাশের আরো কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা এসে যোগ দেন। এতে সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বিকেল ৫টার দিকে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।
ডিবি মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রাকিব খাঁন আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করছেন গার্মেন্ট শ্রমিকরা। তবে গতকাল শনিবার থেকে তারা বেশ সহিংস হয়ে উঠেছেন। আজো পুলিশের সাথে সংঘর্ষ ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। মূলত সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নাশকাতার চেষ্টা করছে। শ্রমিকদের আন্দোলনের মাঝে থেকে ১১ জনকে আটক করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, মিরপুর ১০ ও এর আশপাশে এলাকায় অভিযানে আটকরা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃনমূল নেতা। মিরপুরের পলাতক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লা মূলত এই নাশকতার সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন। আলিফই মূলত ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে এসব নেতাকর্মীকে ঢাকায় এনেছেন। প্রায় শতাধিক নেতাকর্মী এখানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের শনাক্ত করে আটক অভিযান চলমান।
ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন
শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে রোববার সরকার তৈরী পোশাক শ্রমিকদের জন্য ছয় সদস্যের নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে বোর্ডের সদস্যদের নিয়োগ দেয়া হয়। শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী এই বোর্ড পোশাক শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের কাজ করবে।
বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। নিরপেক্ষ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। সাধারণ মালিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আয়ুব এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। পোশাকশিল্পের মালিক পক্ষের প্রতিনিধি বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন এবং শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।
শ্রমমন্ত্রী শ্রমিকদের রাস্তায় আন্দোলন না করে কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, মজুরি বোর্ড গঠনের মাধ্যমে শ্রমিকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি পূরণ হয়েছে। বোর্ড দ্রুত বৈঠকে বসে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করবে। তবে বোর্ড গঠনের ঘোষণার পরও শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত থাকা থেকে বোঝা যায়, শুধু বোর্ড গঠনই তাৎক্ষণিক অসন্তোষ নিরসনের জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না।
প্রধানমন্ত্রীর জরুরি বৈঠক
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, পুলিশের সাথে সংঘর্ষ ও বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সাথে জরুরি বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং বিএনপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কারখানা বন্ধ : বিজিএমইএ
পোশাকশিল্প এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আজ সোমবার থেকে কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হবেন মালিকরা। রোববার সন্ধ্যায় এ কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। দিনভর শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অন্তত ৩০০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
মজুরি নিয়ে মালিক-শ্রমিকের ব্যবধান
পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হয়েছিল ২০২৩ সালে। ওই বছরের ডিসেম্বরে কার্যকর হওয়া কাঠামোয় সর্বনি¤œ মজুরি ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। তখনকার তুলনায় বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়, খাদ্যপণ্যের মূল্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, পরিবহন ও সন্তানদের শিক্ষা ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। শ্রমিকদের বক্তব্য, নির্ধারিত মজুরিতে একটি পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই ৩০ হাজার টাকার দাবি শুধু আয় বাড়ানোর আন্দোলন নয় বরং জীবনধারণের ব্যয়ের সাথে মজুরির সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার দাবি।
বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা হলে মাসিক মজুরি বাড়বে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা। শতকরা হিসাবে বৃদ্ধি ১৪০ শতাংশ। অর্থাৎ শ্রমিকদের দাবি বাস্তবায়ন করতে হলে মালিকদের শ্রমব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে। এই ব্যবধানই মজুরি আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে।
অন্য দিকে মালিকদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের দর, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ও বিদ্যুতের সঙ্কট, ব্যাংকঋণের সুদ, কাঁচামাল আমদানি এবং ডলারের বিনিময়মূল্যের চাপের মধ্যে একবারে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি বাস্তবায়ন সহজ নয়। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু কারখানার ওপর ছেড়ে দিলেও সমস্যার সমাধান হবে না। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা যে দামে পোশাক কেনেন, সেই দামের মধ্যে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির অংশ কতটা রয়েছে, সেটিও আলোচনায় আনতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








