ঢাকাগামী লঞ্চ না থামায় দুর্ভোগে চর মণ্ডলের মানুষ
ঢাকাগামী লঞ্চ না থামায় দুর্ভোগে চর মণ্ডলের মানুষ।

রফিকুল হায়দার ফরহাদ চর মণ্ডল, পটুয়াখালী থেকে ফিরে

Advertisement

দুপুর ঠিক একটা। চর মোন্তাজ ঘাট থেকে ঢাকাগামী লঞ্চ ছেড়ে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন সময় ৫-৬ কিলোমিটার দূরের চর মণ্ডল থেকে মোটরসাইকেলে এক যাত্রী ঘাটে পৌঁছান। স্থানীয়দের ইশারায় সারেং দুই মিনিট অপেক্ষা করায় লঞ্চে উঠতে পারেন ওই যাত্রী। কিন্তু প্রতিদিন সবার ভাগ্যে এমন সুযোগ জোটে না। কারণ, চর মণ্ডলে লঞ্চঘাট থাকলেও সেখানে থামে না ঢাকাগামী কোনো লঞ্চ।
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চর মোন্তাজ ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ড চর মণ্ডল। প্রায় আট কিলোমিটার আয়তনের নদীবেষ্টিত এই চরে বসবাস করেন সাড়ে চার হাজার মানুষ। ভোটার প্রায় দুই হাজার ৭০০। দক্ষিণে চর মোন্তাজ, উত্তরে চরবিষ্টিন, পশ্চিমে দাঁড়চিড়া নদী এবং পূর্বে মায়াচরের নদী। চারপাশে নদীঘেরা এই জনপদের মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা নৌযান। চর মণ্ডল ঘাটে গলাচিপা থেকে আণ্ডারচর পর্যন্ত চলাচলকারী ছোট লঞ্চ দিনে তিনবার থামে। কিন্তু ঢাকাগামী বড় লঞ্চগুলো থামে চর মোন্তাজ ঘাটে। ফলে চর মণ্ডল ও আশপাশের এলাকার মানুষকে ঢাকা যেতে হলে বাড়তি পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে যেতে হয়। এ জন্য জনপ্রতি প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দা আসাদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ সুমন জানান, চর মণ্ডলে ঢাকাগামী লঞ্চ থামানোর জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারা বহুবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনো উদ্যোগই সফল হয়নি। গত বছর চর মোন্তাজ থেকে ঢাকায় ফেরার পথে এক লঞ্চচালককে বলতে শুনেছেন, স্থানীয় এক বিএনপি নেতা ফোন করে চর মণ্ডলে লঞ্চ থামানোর অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া তার পক্ষে সেখানে লঞ্চ থামানো সম্ভব নয়।
চিকিৎসায় ভরসা ৪ ঘণ্টার নৌপথ
চর মণ্ডলের মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ চিকিৎসাসেবা নিয়ে। অসুস্থ হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের যেতে হয় গলাচিপা উপজেলা সদরে। ট্রলারে যেতে সময় লাগে প্রায় চার ঘণ্টা। এ জন্য ভাড়া গুনতে হয় চার-পাঁচ হাজার টাকা। জরুরি প্রয়োজনে স্পিডবোট ব্যবহার করলে খরচ বেড়ে দাঁড়ায় আট থেকে ১০ হাজার টাকায়। স্থানীয় তরুণ মোহাম্মদ সুমন বলেন, ছোট লঞ্চে গলাচিপা যেতে জনপ্রতি ভাড়া লাগে ১৫০ টাকা। সময় লাগে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা। কিন্তু লঞ্চ মিস করলে এবং মাছ ধরার ট্রলার ভাড়া করার মতো টাকা জোগাড় করতে না পারলে পরদিনের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকে না।
আসাদুল ইসলাম বলেন, চর মণ্ডল ও চরবিষ্টিনের মানুষের জন্য ঢাকাগামী লঞ্চটি এখানে থামানো অত্যন্ত জরুরি। এতে দুই এলাকার মানুষই উপকৃত হবেন। বর্তমানে বড় লঞ্চ ধরতে চর মোন্তাজ যেতে হয়। সেখানে পৌঁছাতেই জনপ্রতি প্রায় ৫০০ টাকা খরচ হয়। অথচ চর মণ্ডলে লঞ্চ থামলে চরবিষ্টিনের মানুষও মাত্র ২০০ টাকার মতো খরচে লঞ্চে উঠতে পারতেন।
বিদ্যালয় দূরে, ঝরে পড়ছে শিশু
চর মণ্ডলে রয়েছে মাত্র একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেটিও চর মণ্ডল বাজার থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে। দীর্ঘ পথ হেঁটে স্কুলে যাতায়াত করতে হয় শিশুদের। দূরত্বের কারণে অনেক শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। তাদের কেউ কেউ নদী ও সাগরে মাছ ধরার কাজে যুক্ত হচ্ছে, কেউ পরিবারের উপার্জনে সহায়তা করছে। তবে স্থানীয় উদ্যোগে একটি নতুন মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে আরবি শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি ও গণিতও পড়ানো হয়।
বর্ষায় কাঁচা রাস্তায় দুর্ভোগ
পুরো চরে পাকা সড়ক নেই। চর মোন্তাজ বাজার থেকে চর মণ্ডল বাজার পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সড়ক পাকা করা হয়েছে। বাকি এলাকার রাস্তাগুলো মাটির। শুষ্ক মৌসুমে চলাচল কিছুটা সহজ হলেও বর্ষায় এসব রাস্তায় যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে অসুস্থ রোগীকে নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
মাছ ও তরমুজই আয়ের ভরসা
চরের মানুষের প্রধান জীবিকা সাগরে মাছ ধরা, ধান ও তরমুজ চাষ। তবে এবার সাগরে মাছের পরিমাণ কম। তরমুজ চাষেও আগের মতো লাভ হচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা আসাদুল ইসলাম জানান, চর থেকে তরমুজ ঢাকায় পাঠানোর পর ভালো দাম না পেলে কৃষকদের উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কৃষি ও মৎস্যনির্ভর এই জনপদের মানুষের আয়ও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
সৌন্দর্যে মুগ্ধতা; কিন্তু দেখা নেই পর্যটকের
নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চর মণ্ডলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করবে। লঞ্চঘাটের পূর্ব-দক্ষিণ পাশে বয়ে গেছে চরটিকে বিভক্ত করা একটি খাল। খালের দুই পাশে বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর। দক্ষিণে নদীর অর্ধচন্দ্রাকৃতির বাঁক, উত্তরে উপকূলীয় বন। বনের সামনের সমতল সবুজ মাঠে সারা দিন বিচরণ করে মহিষ, গরু ও ছাগল। তাদের সাথে সাদা বকের উপস্থিতি পুরো প্রান্তরকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে।
উপকূলীয় বনে রয়েছে- শিয়াল, সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী। পাখিরও নিরাপদ আশ্রয়স্থল এই বন। অথচ পর্যটকদের তেমন আনাগোনা নেই এখানে। ভ্রমণপিপাসুরা সাধারণত চর মোন্তাজ থেকে দক্ষিণে সোনার চর, চর হেয়ার, চর তুফানিয়া ও শিপচরে ঘুরতে যান। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগব্যবস্থা, চিকিৎসা ও শিক্ষার সীমাবদ্ধতায় সম্ভাবনাময় চর মণ্ডল রয়ে গেছে অনেকটা আড়ালে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অন্তত ঢাকাগামী লঞ্চের নিয়মিত যাত্রাবিরতির ব্যবস্থা হলে বদলাতে পারে- এই জনপদের মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ।