ঘরের মাঠেও অসহায় : দায় নেবে কে

জসিম উদ্দিন রানা 
বাংলাদেশের ক্রিকেটে ব্যর্থতার পর আলোচনা হয়, আত্মসমালোচনার কথাও শোনা যায়। কিন্তু সেই আলোচনা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরের ম্যাচে কতটা পরিবর্তন আসে, সেটিই বড় প্রশ্ন। প্রতিটি পরাজয়ের পর নতুন অজুহাত দাঁড় করানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিপক্ষকে সমীহ করানোর মতো সামর্থ্য বাংলাদেশের আছে। কিন্তু সামর্থ্য আর বাস্তব পারফরম্যান্স এক জিনিস নয়। শুধু অতীতের কিছু সাফল্যের গল্প শুনিয়ে বর্তমানের ব্যর্থতা আড়াল করা যাবে না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে এই হার তাই নিছক একটি ম্যাচের পরাজয় নয়; এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সতর্কবার্তা। 
ঘরের মাঠে খেলা, পরিচিত উইকেট, দর্শকদের সমর্থন- সবই ছিল স্বাগতিকদের পক্ষে। অথচ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে ৮ উইকেটের হার যেন আবারো বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের দৈন্যদশা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো। প্রথম ইনিংসে সামান্য এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত এমন অসহায় আত্মসমর্পণ! প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই বাংলাদেশ মূলত হাঁটছে কোন পথে? 
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ২৭২ রান। জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৪৫ রানে গুটিয়ে গেলে ২৭ রানের লিড পায় স্বাগতিকরা। তখন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সামনে। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে সেই সুযোগকে রীতিমতো বিসর্জন দিয়েছে ব্যাটাররা। মাত্র ১৪২ রানে অলআউট হয়ে ক্যারিবীয়দের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড় করায় মাত্র ১৭০ রানের। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩৫.১ ওভারেই ২ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। ৮ উইকেটের জয় নিয়ে দুই টেস্টের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় সফরকারীরা। 
সবচেয়ে হতাশার জায়গা ব্যাটিং। প্রথম ইনিংসে সাদমান ইসলামের ১০৫ রানের দুর্দান্ত ইনিংস ছাড়া উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার মতো ব্যাটসম্যান কোথায়? টেস্ট ক্রিকেটে শুধু একজনের ব্যাটে ভর করে ম্যাচ জেতা যায় না। একের পর এক ব্যাটসম্যানের ব্যর্থতা বুঝিয়ে দিয়েছে, উইকেটে টিকে থাকার মানসিকতা এবং প্রতিপক্ষের বোলিং সামাল দেয়ার দক্ষতায় কতটা ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশের। 
আরেকটি বিষয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা। জোমেল ওয়ারিকান দুই ইনিংস মিলিয়ে নিয়েছেন ৯ উইকেট। অধিনায়ক রোস্টন চেজ দ্বিতীয় ইনিংসে একাই শিকার করেছেন ৫ উইকেট। অথচ ঘরের মাঠে স্পিনবান্ধব উইকেটের সুবিধা নেয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের। প্রতিপক্ষের স্পিনাররা যদি বাংলাদেশের ব্যাটিংকে এভাবে নাস্তানাবুদ করতে পারেন, তাহলে নিজেদের স্পিন-সামর্থ্য নিয়ে গর্ব করার জায়গাটিই বা কোথায়? 
সমালোচনা শুধু ব্যাটসম্যানদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। দল নির্বাচন, কৌশল নির্ধারণ, উইকেটের চরিত্র বুঝতে পারা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা সাজানোর দায়িত্বও টিম ম্যানেজমেন্টের। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয়ের পর দলের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে- সেটিই স্বাভাবিক।  
ডারউইনে আগস্টে ঐতিহাসিক ৯ উইকেটের জয়ের পর টেস্টে কোনো জয় নেই বাংলাদেশের। নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে বাংলাদেশ এরপর তিন টেস্ট খেলেও জিততে পারেনি। যার মধ্যে রয়েছে মিরপুরে গতকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে ভরাডুবি। ক্যারিবীয়দের কাছে স্রেফ উড়ে গেছে শান্ত-তাইজুল-মিরাজ-তৌহিদদের দল। 
ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হেসেখেলে হারানোর পর ম্যাকাইতে দেড় দিনে হারে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার কাছে ইনিংস ও ৫১ রানে হেরে যাওয়া বাংলাদেশ আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়েও জিততে পারেনি। আলোকস্বল্পতা, বৃষ্টির বাগড়ায় অনেক ওভার খেলা নষ্ট হলেও উইন্ডিজরা ৮ উইকেটে জিতে গেছে চার দিনেই। 
হঠাৎ কেন টেস্টে এমন ছন্দপতন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৮ উইকেটে হারের পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শান্তর কাছে জিজ্ঞেস করা হয়। অধিনায়ক বলেন, ‘আমি মনে করি, ড্রেসিংরুমের পরিবেশ এবং আমাদের প্রস্তুতি- দুটোই ভালো ছিল। খেলোয়াড়রা দলের জন্য ভালো করতে সত্যিই চেয়েছিল। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, এটি আমাদের জন্য একটি খারাপ দিন ছিল। কারণ আগেই বলেছি যে তিনটি বিভাগেই আমরা ভালো করতে পারিনি। বিশেষ করে ফিল্ডিংয়েও।’ 
ব্যাটিং ব্যর্থতার পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও ব্যর্থ বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে চার ক্যাচ মিস করেছে স্বাগতিকরা। মুমিনুল হক একাই দুই ক্যাচ মিস করে এমন অবস্থা বানিয়েছেন যে ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছেন। শরীফুল ইসলাম কট অ্যান্ড বোল্ডের সুযোগ হাতছাড়া করেন জন ক্যাম্পবেলের। ক্যাম্পবেলকে জীবন দিয়েছেন নাঈম হাসানও। দু’বার জীবন পেয়ে ফিফটি করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাঁ হাতি এই ওপেনার। 
দ্বিতীয় ইনিংসেও বাংলাদেশ ক্যাচ মিস করেছে। যদিও স্কোরবোর্ডে পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকায় সেটি তেমন একটা নজরে আসেনি। ১৭০ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩৫.১ ওভারে মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায়। ৮ উইকেটে হারের পর শান্ত বলেন, ‘আমার মতে এটি হতাশাজনক পারফরম্যান্স। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং- তিনটি বিভাগেই নিজেদের সেরাটা দিতে পারিনি। বিষয়গুলো অবশ্যই দুশ্চিন্তার কারণ।’ 
প্রথম ইনিংসে ২৭ রানের লিড পেয়েও সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪২ রানে গুটিয়ে যায় স্বাগতিকরা। টেলএন্ডার ব্যাটার নাঈম হাসানের ৫২ রানই সর্বোচ্চ। হৃদয়, তানজিদ এবার ডাক মেরেছেন। তা ছাড়া শান্ত দুই ইনিংস মিলে করেন ২৯ রান। হারের ব্যাখ্যায় বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, আসলেই দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং যথেষ্ট বাজে হয়েছে। ক্রিকেটে মাঝে মধ্যে এমনটি হতেই পারে। 
ভবিষ্যতে অন্তত অজুহাত নয়, মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে জবাব চায় ভক্তরা।

Advertisement