ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষের আশা ট্রাম্পের

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে বলে তিনি মনে করছেন। তবে এই সঙ্ঘাত কীভাবে অবসান হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। কানসাস সিটির বেতারকেন্দ্র কেসিএমওকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন নিশ্চয়তা চায় যাতে ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর আগে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে, নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন করে কোনো হামলা চালাবে না। রয়টার্স লিখেছে, এমন এক সময়ে ট্রাম্প এই মন্তব্য করলেন, যখন একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে  ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে তীব্র দরকষাকষির মধ্যেই কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা আবার তেহরানে ফিরে গেছেন।
এ দিকে শুক্রবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার আবারো দাবি করেছেন, ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে এবং হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণাঞ্চলীয় বাণিজ্যিক নৌপথ ‘সম্পূর্ণ নিরাপদ ও উন্মুক্ত’ রয়েছে। 
তবে মার্কিন সামরিক কমান্ডারের দাবির ঠিক উল্টো দাবি করেছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত কয়েক দিনে ওই দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথে অন্তত ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ সামুদ্রিক মাইনের কবলে পড়েছে। অন্য দিকে ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীও ওই এলাকায় একটি জাহাজে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। 
জানা গেছে, ইরানের শাসনকাঠামোর প্রভাবশালী ব্যক্তি মোহসেন রেজাইয়ের কাছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের পাঠানো এক চিঠির এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি তেহরান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করার জন্য ওই চিঠি পাঠাননি ভাইস প্রেসিডেন্ট। বরং ওই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ইরানে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছানো।
যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে শুক্রবার কানসাস সিটির রেডিও স্টেশন ‘কেসিএমও’-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন ট্রাম্প। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এটা খুব দ্রুতই মিটে যাবে।’
তবে যুদ্ধের অবসানে মূল শর্তের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তারা (ইরান) যে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না, আমাদের সেই নিশ্চয়তা পেতে হবে।’
কূটনৈতিক সমঝোতার উদ্যোগ ও কাতারের মধ্যস্থতা
যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছে কাতার। কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানে পৌঁছে প্রায় ১২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বৈঠক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমন্বয় করেই এ আলোচনা চলছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো একটি চিঠি ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন কাতারের দূতরা। ভ্যান্সের এই প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সরাসরি আলোচনার কথা রয়েছে। এ ছাড়া সম্ভাব্য সমঝোতার প্রাথমিক কাঠামোয় তেহরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ পারস্পরিক সম্মতিতে তৃতীয় কোনো দেশে সরিয়ে নেয়া, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমানো এবং চুক্তি হওয়ার সাত দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নে নিশ্চয়তাদাতা পক্ষ হিসেবে চীনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে এবং সরাসরি আলোচনা ইস্তাম্বুলের পরিবর্তে কাতারের রাজধানী দোহায় আয়োজনের কথা বলা হয়েছে।
সমঝোতার পথে প্রধান বাধা ও দুই পক্ষের শর্ত
সমঝোতার পথে এখনো বড় ধরনের অনমনীয়তা ও পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান যেন তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ পুরোপুরি ছেড়ে দেয়। অন্য দিকে তেহরানের স্পষ্ট দাবি- যুক্তরাষ্ট্রকে আগে দেশটির বন্দরগুলোতে আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে, সামরিক হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ বা অর্থ ফিরিয়ে দিতে হবে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নৌ অবরোধের অবসান, হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা এবং জব্দ করা তেহরানের সম্পদ ফেরত দেয়াসহ সাতটি শর্ত পূরণ না হলে কোনো সমঝোতা বা অগ্রগতি সম্ভব নয়। এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন যে ইরান আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী, তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সঙ্কট আলোচনার ক্ষেত্রে বড় বাধা। ট্রাম্পের দাবি, ইরান তাদের সেনা ও পুলিশ সদস্যদের বেতন পর্যন্ত দিতে পারছে না এবং দেশটি গভীর সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে।
সামরিক প্রস্তুতি ও গোয়েন্দা তৎপরতা
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি ইরানে নতুন করে হামলার সামরিক প্রস্তুতির খবরও পাওয়া যাচ্ছে। আলজাজিরার খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ইরানে নতুন করে হামলার সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্পকে অবহিত করেছেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে যৌথ হামলার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে ইরানের নেতৃত্ব, জ্বালানি অবকাঠামো এবং পারমাণবিক স্থাপনা নিশানা করা হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে বড় ধরনের হামলার নির্দেশ দেয়ার সম্ভাবনা কম থাকলেও নির্বাচন শেষ হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে।
আইআরজিসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর হুংকার
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যদি আবারো অঞ্চলে কোনো সামরিক অভিযান চালায়, তবে তার বড় ধরনের পাল্টা আঘাত হানবে তেহরান- এমনটাই সতর্ক করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। আইআরজিসির মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া এক্সে দেয়া পোস্টে জানান, ট্রাম্প বা ইসরাইল নতুন কোনো দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নিলে যুদ্ধের আগুন আরো বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে এবং সঙ্ঘাতের সমাপ্তি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। অন্য দিকে ইরানে নতুন করে হামলা চালানো হলে ইউরোপকে চড়া মূল্য দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসের ইউরোপের জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে করা অভিযোগের জবাবে আরাকচি বলেন, ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্রবাহিনী এমন আঘাত হানবে যার কাছে ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ইউরোর ক্ষতিও কিচ্ছু নয়। তিনি স্পষ্ট করেন যে রেডলাইন বা চূড়ান্ত সীমার ধারণা এখন অতীত।
হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপে উন্নত ইলেকট্রনিক যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করে একটি মার্কিন এমকিউএম-১৭০ সিরিজের ড্রোন ভূপাতিত ও অক্ষত অবস্থায় জব্দ করার দাবি করেছে আইআরজিসি। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন।
ইসরাইলি সেনার গুপ্তবৃত্তির অভিযোগ
ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময়ে ইরানের গোয়েন্দাদের কাছে সংবেদনশীল সামরিক তথ্য সরবরাহ করার অভিযোগে এক ইসরাইলি সেনার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। ‘শিন বেত’, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রায় এক বছর ধরে ইরানি গোয়েন্দাদের সাথে যোগাযোগ রেখে নিজের ইউনিটের কার্যক্রম, অভিযানের প্রস্তুতি, সামরিক ঘাঁটির অবস্থান এবং বিমানবন্দরে থাকা মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানের ছবি পাচার করেছেন ওই সেনা।