
মনিরুল ইসলাম রোহান
ডিসেম্বরকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। মাসটিকে ঘিরে অতি উৎসাহী মনোভাবও দেখা যাচ্ছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে। ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা দেশে ফিরছেন- এমনটি ধরে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াসহ অনলাইন ও অফলাইনে তাদের তৎপরতাও এখন চোখে পড়ার মতো। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল, সমাবেশের চেষ্টা, আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে হোটেল-রেস্টুরেন্টে বৈঠক এবং পেশাজীবী সংগঠনের আড়ালে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে উপস্থিতির মাত্রা রাজনীতিতে একটা নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, প্রবাসে অবস্থানরত নেতাদের দেশে ফেরার আহ্বান এবং দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে সক্রিয় হওয়ার আলোচনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের এই অতিরিক্ত তৎপরতার উদ্দেশ্য কী? এটি কি কেবল দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা, নাকি রাজনৈতিক মাঠে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার পরিকল্পিত উদ্যোগ? গত জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সাথে নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। তবে তিনি দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ বা বিস্তারিত পরিকল্পনা না জানালেও বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পেয়েছে।
ডিসেম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ডিসেম্বরকে আওয়ামী লীগের জন্য কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রথমত, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির সাংগঠনিক অস্তিত্ব ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত, আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আশাবাদ তৈরি করা। তৃতীয়ত, রাজনৈতিকভাবে দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশী-বিদেশী মহলে আলোচনা তৈরি করা। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাও এই রাজনৈতিক আলোচনাকে আরো সামনে নিয়ে এসেছে। তবে দেশে ফেরার ঘোষণা আর বাস্তবে দেশে ফিরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা এক বিষয় নয় বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। তাদের পর্যালোচনায় দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আইনি সীমাবদ্ধতা এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাংগঠনিক অস্তিত্ব জানান দেয়ার চেষ্টা?
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দলীয় কার্যালয় খোলা, স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীদের যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং অনলাইনে সাংগঠনিক যোগাযোগের বেশকিছু তথ্য উঠে এসেছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু নেতাকর্মীর সক্রিয়তা আর কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত রাজনৈতিক কর্মসূচি এক নয় বলে রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন। দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বাস্তবে কতটা সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সরকারের কঠোর অবস্থান, বাড়ছে সতর্কতা
ডিসেম্বর ঘিরে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য তৎপরতা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সতর্ক অবস্থানের কথা জানিয়েছে। গত ৭ অক্টোবর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান মো: শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো বেআইনি বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের চেষ্টা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্য দিকে ২৯ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আওয়ামী লীগ ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরবে না এবং যারা দেশে ফিরবে, তাদের আইন অনুযায়ী হেফাজতে নেয়া হবে। সরকারের এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, ডিসেম্বরকে ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে।
শেখ হাসিনার ঘোষণা : রাজনৈতিক মনোবল নাকি প্রত্যাবর্তনের বার্তা?
শেখ হাসিনার ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ঘোষণা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের কাছে এটি হতে পারে নেতৃত্বের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। একই সাথে দলটির সমর্থকদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ এখনো রাজনৈতিকভাবে হারিয়ে যায়নি। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে দলের নেতাকর্মীদের জন্য বাস্তব পরিস্থিতি কতটা পরিবর্তিত হবে? তার বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া, গ্রেফতারের আশঙ্কা এবং দলীয় কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা, সবমিলিয়ে বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সাথে বিচারিক ও সাংবিধানিক প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
আওয়ামী লীগের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ
বর্তমান পরিস্থিতিতে দলটির সামনে অন্তত তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, সাংগঠনিক পুনর্গঠন : নেতৃত্বের বড় একটি অংশ দেশের বাইরে বা আত্মগোপনে থাকায় তৃণমূলের সাথে কেন্দ্রের যোগাযোগ কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা : ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন এবং সে সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় বিতর্ক তৈরি করেছে। এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি, দায় স্বীকার এবং রাজনৈতিক জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তৃতীয়ত, আইনি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা : দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণে প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ সীমিত। ফলে ডিসেম্বর ঘিরে ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনি বাধা বড় বিষয়।
অতি উৎসাহের পেছনে কী রাজনৈতিক হিসাব?
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে আওয়ামী লীগের ডিসেম্বরকেন্দ্রিক তৎপরতার কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে। এক. নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখা। দুই. রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আবারো আওয়ামী লীগকে নিয়ে আসা। তিন. দলটির সাংগঠনিক সক্ষমতা ও জনসমর্থন সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করা। চার. আন্তর্জাতিক মহলে দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখা।
শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বর কী বার্তা দিতে পারে?
ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জন্য শুধু দেশে ফেরার ঘোষণার মাস নয়; বরং দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং নেতৃত্বের বাস্তব অবস্থান যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হয়ে উঠতে পারে- এমনটি মনে করছেন কেউ কেউ। যদিও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন কেবল নেতার দেশে ফেরার ওপর নির্ভর করে না। এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এর সাথে যুক্ত থাকে জনগণের আস্থা, আইনের শাসন, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ। আওয়ামী লীগের ডিসেম্বরকেন্দ্রিক তৎপরতা শেষ পর্যন্ত বাস্তব রাজনৈতিক উদ্যোগে রূপ নেবে- নাকি এটি দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার একটি প্রচারমূলক অবস্থান হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। অবশ্য ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নজিরবিহীন পতনের পর ভারতে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ কি ডিসেম্বরে মাঠে ফিরতে পারবে? এমন প্রশ্নও রয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
বিশেষজ্ঞ মত
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এ দেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শেষ হয়ে গেছে। দুই বছরের মাথায় হঠাৎ ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে মূলত তিনি তার নেতাকর্মীদের মনোবল একটু উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন। এ দিকে শেখ হাসিনার কথার ফাঁদে পড়ে তার দলের নেতাকর্মীরা অতি উৎসাহী মনোভাব দেখাতে গিয়ে মিছিল-মিটিং করছেন, প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রমের স্বপ্ন দেখছেন, গোপনে মিলিত হয়ে বৈঠক করছেন। আর এসব অপরাধে পুলিশ তাদের অনেককেই গ্রেফতার করে জেলে ভরছে। এসব নেতাকর্মী শেখ হাসিনার আসল চরিত্র সম্পর্কে কিছুই জানে না। তাদের বোঝা উচিত, বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে তাদের নেত্রী ভারতে পালিয়ে গেছেন, সেখানে তিনি ও তার পরিবারের অনেকেই আরাম আয়েশে জীবন যাপন করছেন। এক প্রশ্নের জবাবে ড. মাসুম বলেন, আওয়ামী লীগ রাজনীতি থেকে অনেকটা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, তাদের অপকর্মের পাল্লা এত ভারী যে, মানুষ তাদের শুধু ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখেই না, রাজনীতিতেও তাদের দেখতে চায় না। এ রকম ডিসেম্বর সামনে আমরা অনেক দেখতে পাবো; কিন্তু এই অবস্থা থেকে আওয়ামী লীগের উত্তরণের কোনো পথ আপাতত দেখছি না।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








