
- ফ্রান্স ভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত করেছে
- নজরদারির পরামর্শ
- খামারিদের জন্য ৫ পরামর্শ
গবাদিপশুর রোগ হিসেবে পরিচিত শামন্ডা ভাইরাস (ঝযধসড়হফধ ারৎঁং) প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরে শনাক্ত হয়েছে। ফ্রান্সে গুরুতর অসুস্থ ও অত্যন্ত দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার এক ব্যক্তির শরীরে সংক্রমণ নিশ্চিত করেছে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। ওই ব্যক্তি অক্টোবরের শুরুতে মারা যান। ভাইরাসটি তার মৃত্যুর কারণ ছিল কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে গবাদিপশুর অস্বাভাবিক রোগ ও প্রজননজনিত সমস্যা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি পরীক্ষাগারভিত্তিক রোগ শনাক্তকরণ এবং ওয়ান হেলথ পদ্ধতিতে নজরদারি জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মেডিসিন বিভাগের প্রাণী কল্যাণ ও আচরণ ল্যাবরেটরির অধ্যাপক ড. এম আরিফুল ইসলাম। তার মতে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত শামন্ডা ভাইরাস শনাক্তের নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন নেই। তবে পর্যাপ্ত নজরদারি ছাড়া ভাইরাসটির অনুপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ফ্রান্সের ঘটনা
গত ২২ অক্টোবর ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ মানবদেহে শামন্ডা ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণের কথা প্রকাশ করে। আক্রান্ত ব্যক্তি লিওঁর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। একাধিক জৈবিক নমুনা পরীক্ষায় ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। ৭ অক্টোবর কর্তৃপক্ষ সংক্রমণের বিষয়ে জানতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউরোপীয় রোগপ্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করছে।
অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ব ফ্রান্সে কিউলিকয়েডিস নামে ক্ষুদ্র রক্তচোষা মিজের (এক ধরনের ক্ষুদ্র পোকা বা মাছি) কামড়ে ওই ব্যক্তি আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। তবে সংক্রমণের প্রকৃত উৎস এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত নয়। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
ভাইরাসটি কী, কতটা ক্ষতিকর
শামন্ডা ভাইরাস চবৎরনঁহুধারৎরফধব পরিবারের ঙৎঃযড়নঁহুধারৎঁং গণের এবং ঝরসনঁ ংবৎড়মৎড়ঁঢ়-এর অন্তর্ভুক্ত। ১৯৬৫ সালে নাইজেরিয়ায় গরুর শরীরে প্রথম এটি শনাক্ত হয়। পরে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল ও জাপানে প্রাণীর মধ্যে এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপে প্রথমবারের মতো গবাদিপশুর মধ্যে ভাইরাসটির সংক্রমণ শনাক্ত হয়। জুন থেকে প্রাণীর মধ্যে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলেও জুলাইয়ের শেষ দিকে ভাইরাসটি শনাক্ত করা হয়। পরে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, লিচেনস্টাইন, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে প্রাণীর মধ্যে সংক্রমণের খবর মেলে।
ভাইরাসটি প্রধানত গরুকে আক্রান্ত করে। আক্রান্ত গবাদিপশুর জ্বর, ডায়রিয়া, অবসন্নতা, ক্ষুধামন্দা ও দুধ উৎপাদন কমে যেতে পারে। গর্ভপাত, মৃত বাছুর জন্ম এবং ভ্রƒণের জন্মগত বিকৃতির ঘটনাও ঘটতে পারে। তবে এসব লক্ষণ অন্য রোগেও দেখা যায়। তাই শুধু উপসর্গ দেখে শনাক্ত করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন পরীক্ষাগারভিত্তিক রোগ নির্ণয়। ভাইরাসটি সাধারণত সংক্রমিত মিজের কামড়ে প্রাণী থেকে প্রাণীতে ছড়ায়। গর্ভাবস্থায় আক্রান্ত মা প্রাণী থেকে ভ্রƒণেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। তবে সরাসরি প্রাণী থেকে প্রাণীতে সংক্রমণের প্রমাণ মেলেনি।
মানুষের জন্য কতটা ঝুঁকি
মানুষের শরীরে প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হলেও এখনই ব্যাপক জনস্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম বলেন, একটি মানব সংক্রমণ শনাক্ত হওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে একে বড় জনস্বাস্থ্য সঙ্কট বলা ঠিক হবে না। মানুষের শরীরে ভাইরাসটি কী রোগ সৃষ্টি করতে পারে, কতটা সংক্রমণক্ষম এবং কারা বেশি ঝুঁকিতে, এ বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
তিনি বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তির রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল ছিল। তাই একজন রোগীর ঘটনা থেকে সুস্থ মানুষের ঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। একই ংবৎড়মৎড়ঁঢ়-এর অন্য ভাইরাসের অভিজ্ঞতাকেও শামন্ডার মানবঝুঁকির সরাসরি প্রমাণ ধরা যাবে না।
ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও ডব্লিউএইচওর প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো শনাক্ত জনস্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। তবে সংক্রমণপথ ও মানুষের শরীরে এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে।
দেশে নজরদারি কেন জরুরি
অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে শামন্ডা ভাইরাস শনাক্তের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রকাশিত বা সরকারি প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিবেদন না থাকা মানেই ভাইরাসটির অনুপস্থিতি নয়। নিয়মিত নজরদারি, কিউলিকয়েডিস প্রজাতি শনাক্তকরণ ও উপযুক্ত পরীক্ষা সীমিত থাকলে কোনো সংক্রমণ অচিহ্নিত থেকে যেতে পারে। গবেষণার প্রয়োজনে গর্ভপাত, মৃত বা বিকৃত বাছুর জন্ম কিংবা হঠাৎ দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার ঘটনায় ঝরসনঁ ংবৎড়মৎড়ঁঢ়-এর ভাইরাসের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। তবে শুধু লক্ষণ দেখে শামন্ডায় আক্রান্ত হওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
খামারিদের জন্য পাঁচ পরামর্শ
বাহক পতঙ্গের সংস্পর্শ কমাতে খামারিদের পাঁচটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছেন এই বিশেষজ্ঞ। প্রথমত, গোয়ালঘর ও আশপাশের ভেজা, কাদাযুক্ত স্থান পরিষ্কার রাখতে হবে। জমে থাকা পানি, ভেজা গোবর, পচা ঘাস ও খাদ্যের অবশিষ্টাংশ যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ঘরে মিজের প্রবেশ কমাতে উপযুক্ত জাল, পরিচ্ছন্ন আবাসন ও পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।
তৃতীয়ত, গর্ভপাত, মৃত বা বিকৃত বাছুর জন্ম, জ্বর, ডায়রিয়া কিংবা দুধ উৎপাদন হঠাৎ কমে যাওয়ার ঘটনা তারিখসহ নথিবদ্ধ করে দ্রুত প্রাণিচিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনে নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠাতে হবে। চতুর্থত, কাজের সময় শরীর ঢাকা পোশাক ও রিপেলেন্ট (পোকা ও মাছি নিরোধক) ব্যবহার করতে হবে। পঞ্চমত, গুজবে কান না দিয়ে অস্বাভাবিক রোগ বা প্রজননজনিত সমস্যার কথা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতর ও প্রাণিচিকিৎসককে জানাতে হবে।
ওয়ান হেলথ পদ্ধতিতে সমন্বিত নজরদারির তাগিদ
অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো প্রাণিসম্পদ অধিদফতর, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার ও জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে ওয়ান হেলথ পদ্ধতিতে নজরদারি জোরদার করা। একই সাথে গবাদিপশুর অস্বাভাবিক রোগের তথ্য সংগ্রহ, কিউলিকয়েডিসের প্রজাতি ও বিস্তৃতি নিয়ে গবেষণা এবং পরীক্ষাগার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তার মতে, একটি মানব সংক্রমণ মানেই ব্যাপক সংক্রমণ নয়। তাই আতঙ্কিত না হয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুতি নেয়া জরুরি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








