
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন অপরিহার্য বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নির্বাচন কমিশন থেকে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কোনো প্রতিষ্ঠানই শুধু সাংবিধানিক স্বীকৃতি কিংবা আইনগত কাঠামোর কারণে কার্যকর হয়ে ওঠে না। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
গতকাল শনিবার সেন্টার ফর স্ট্রাটেজি অ্যান্ড পিস স্টাডিজের (সিএসপিএস) উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। ‘প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পরীক্ষা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন সাবেক সচিব ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত সংস্কার কমিশনের অন্যতম সদস্য ড. মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুব। সেমিনারে অংশ গ্রহণ করেন, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক নর্থ সাউথ বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, গবেষক শাহ আবদুল হালিম, সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন, সাবেক সচিব খন্দকার রাশেদুল হক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল অব আশরাফ আল দীন, মেজর (অব:) ড. মুহাম্মদ ইউনুস, কর্নেল অব জাকারিয়া, আজিজুল হক প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন, সিএসপিএস-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মিজানুর রহমান।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো- গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল থাকলে নির্বাচন, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ক্ষমতাসীনদের প্রভাবের ঝুঁঁকিতে পড়ে। তাই রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকারকে কার্যকর আইন, নিরপেক্ষ নিয়োগব্যবস্থা এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। গণভোটে সংস্কারের পক্ষে জনসমর্থন, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য এবং নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি সরকারের ওপর এ ক্ষেত্রে বাড়তি দায়িত্ব তৈরি করেছে।
প্রবন্ধে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও ন্যায়পালের পাশাপাশি পিএসসি, সিএজি এবং দুদকের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, মেধাভিত্তিক জনপ্রশাসন, সরকারি অর্থের সুরক্ষা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
প্রবন্ধে বলা হয়, সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। তবে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের বিধান গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নিয়োগপ্রক্রিয়াকে নির্বাহী বিভাগের একক প্রভাবমুক্ত করা প্রয়োজন। এ জন্য স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠন, যোগ্য প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সেমিনারে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা শুধু আইনি কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক, তার ওপরও নির্ভর করে। অতীতের নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা দূর করতে কমিশনের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা জরুরি।
এতে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কতার কথা বলা হয়েছে। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে এ ব্যবস্থার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ২০০৭ সালের রাজনৈতিক সঙ্কট দেখিয়েছে, নির্দলীয় সরকারের বিধান থাকলেই সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত হয় না। সরকারপ্রধান বা প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের পদ্ধতি, সাংবিধানিক সীমারেখা এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের নিয়ম স্পষ্ট না হলে নতুন সঙ্কট তৈরি হতে পারে।
প্রবন্ধে বহুপক্ষীয় বাছাই কমিটির মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচন, রাজনৈতিক ঐকমত্যের চেষ্টা এবং ঐকমত্য না হলে বিকল্প সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তবে এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে সংবিধান সংশোধন, আদালতের রায় ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক অনিয়ম ও নাগরিকের প্রতি অন্যায়ের অভিযোগ তদন্তে ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মূল প্রবন্ধে বলা হয়, সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান থাকলেও স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময়েও প্রতিষ্ঠানটি কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
১৯৮০ সালে ন্যায়পাল আইন প্রণয়ন এবং ২০০২ সালে তা কার্যকরের প্রজ্ঞাপন জারির পরও ন্যায়পাল নিয়োগ না হওয়াকে প্রশাসনিক জবাবদিহির ঘাটতির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রস্তাবিত সংস্কারে বহুপক্ষীয় বাছাই কমিটি, যোগ্যতা যাচাই এবং স্বাধীনভাবে অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
প্রবন্ধে আরো বলা হয়, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও ন্যায়পাল নিয়োগের অঙ্গীকার রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে অজুহাত করে বিষয়টি অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
আলোচনায় সরকারি কর্ম কমিশন, মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। পিএসসির ক্ষেত্রে মেধাভিত্তিক নিয়োগ, বিসিএস পরীক্ষার সময়মতো আয়োজন ও ফল প্রকাশ, নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে বহুপক্ষীয় বাছাইব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন সংস্কারের প্রস্তাব অনুযায়ী, চাকরির ধরন ও বিশেষায়িত দক্ষতার ভিত্তিতে সার্ভিস কাঠামো পুনর্বিবেচনা এবং নিয়োগ-পদোন্নতিতে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সিএজির ক্ষেত্রে শুধু নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি নয়, নিরীক্ষায় চিহ্নিত অনিয়ম ও অর্থের অপচয়ের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। এ জন্য নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা, পারফরম্যান্স অডিট, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহি এবং সংসদীয় নজরদারি জোরদার করার প্রস্তাব রয়েছে।
অন্য দিকে, দুদকের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, নির্দিষ্ট মেয়াদ, নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত তদন্ত এবং আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। দুদককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। তবে এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
প্রবন্ধে বলা হয়, শুধু প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন করলেই সংস্কার সম্পন্ন হবে না। যোগ্যতার মানদণ্ড, অপসারণের সুস্পষ্ট বিধান, স্বার্থের সংঘাত প্রতিরোধ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
বাস্তবায়নে সরকারের করণীয় প্রসঙ্গে বলা হয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত অঙ্গীকারকে কার্যকর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় রূপ দেয়ার ওপর। এ ক্ষেত্রে সরকারের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে।
প্রথমত, সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশের কোনগুলোতে রাজনৈতিক ঐকমত্য রয়েছে, কোনগুলোতে মতপার্থক্য আছে এবং কোনগুলোর জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন- তা স্পষ্ট করে একটি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রকাশ করা।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রক্রিয়া, যোগ্যতার মানদণ্ড, মেয়াদ, অপসারণের বিধান ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া।
তৃতীয়ত, সংস্কার বাস্তবায়নের পর্যায়ভিত্তিক সময়সীমা নির্ধারণ করে সংসদ ও জনগণের কাছে অগ্রগতির প্রতিবেদন প্রকাশ করা। এতে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে ব্যবধান পরিমাপ করা সম্ভব হবে।
চতুর্থত, নিরীক্ষা, দুর্নীতির তদন্ত, প্রশাসনিক অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় জনবল, অর্থ ও কারিগরি সক্ষমতা দেয়া।
পঞ্চমত, সংস্কার বাস্তবায়নে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখা এবং রাজনৈতিক সুবিধার পরিবর্তে নাগরিকের ভোটাধিকার, সরকারি অর্থের সুরক্ষা ও আইনের শাসনকে অগ্রাধিকার দেয়া।
প্রবন্ধের মূল বক্তব্য হলো, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কোনো রাজনৈতিক দলের বিজয় বা পরাজয়ের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের অধিকার সুরক্ষার প্রশ্ন। ক্ষমতাসীনদের সদিচ্ছা যাচাইয়ের মাপকাঠি তাদের ঘোষণায় নয়, বরং কতটা স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে, তার মধ্যেই নিহিত।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে হলে রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তবায়নে রূপ দিতে হবে। অন্যথায় পুরনো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নতুন কাঠামোর মধ্যেও টিকে থাকার আশঙ্কা থেকে যাবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








