
- সম্ভাবনাময় বাজার থাকলেও রফতানির সুযোগ পাচ্ছেন না অধিকাংশ ব্যবসায়ী
- বৈদেশিক মুদ্রা ও কর্মসংস্থান হারানোর শঙ্কা
বাংলাদেশের কাঁকড়া ও কুচিয়া রফতানিতে ১৫-১৬ জন ব্যবসায়ীর একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, মৎস্য অধিদফতর সবার কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করছে না, সবাইকে রফতানির সনদও দিচ্ছে না। শুধু সিন্ডিকেটভুক্ত ব্যবসায়ীদের নমুনা নেয়া হচ্ছে এবং তারাই রফতানির সনদ পাচ্ছেন।
তাদের অভিযোগ, বৈধ লাইসেন্স থাকার পরও সিন্ডিকেটের বাইরের ব্যবসায়ীরা বারবার অধিদফতরে গিয়ে খালি হাতে ফিরছেন। এতে কিছু প্রতিষ্ঠান প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ কেউ অন্যের লাইসেন্সে সামান্য পণ্য পাঠিয়ে টিকে আছেন।
কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ, মৎস্য অধিদফতরের কিছু কর্মকর্তার সহযোগিতায় ওই গোষ্ঠী রফতানি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছে।
এ বিষয়ে জানতে মৎস্য অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো: খালেদ কনকের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ব্যবসায়ীরা জানান, চীনসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে কাঁকড়া ও কুচিয়ার চাহিদা বেশি। কিন্তু অধিকাংশ রফতানিকারক সুযোগ না পাওয়ায় বাজারের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমছে এবং শ্রমিক, সংগ্রহকারী ও পরিবহনকর্মীদের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়ছে।
বি সি ফুডের স্বত্বাধিকারী প্রবীর জানান, তিন-চার মাস আগ পর্যন্ত তিনি লাইসেন্সধারী অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাঁকড়া ও কুচিয়া রফতানি করেছেন। তার দাবি, এখন অধিদফতর সেই প্রতিষ্ঠানের নমুনাও নিচ্ছে না।
তিনি বলেন, এই খাতের পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন একটি সিন্ডিকেটের হাতে। ক্ষমতা দেখিয়ে একটি গোষ্ঠী ব্যবসা করছে, আর বাকিরা বঞ্চিত হচ্ছে। সিন্ডিকেটের বাইরে থাকলে অধিদফতর নমুনা নিচ্ছে না। নিজস্ব লাইসেন্সধারীরাও একই সমস্যায় পড়েছেন।
বিশ^াস ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী গোপাল জানান, দুই-তিন মাস আগে তিনি রফতানি করেছেন। কিন্তু নতুন করে শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা নেয়া ও সনদ দেয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, মৎস্য অধিদফতরে গেলে তারা বলে, আপাতত নমুনা নেয়া যাবে না। কোনো অভিযোগ থাকলে মন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করতে বলে। আমরা মৎস্য ভবন থেকে খালি হাতে ফিরে আসি। আমাদের কেউ কেউ মন্ত্রীর কাছে গিয়েও সমাধান পাননি। তিনি বলেন, এই খাতে অনেক সম্ভাবনা আছে। কিন্তু একটি গোষ্ঠীর কারণে আমরা ব্যবসা করতে পারছি না।
৩০০ সদস্যের সংগঠনে রফতানি করছেন হাতেগোনা কয়েকজন
বাংলাদেশ লাইভ অ্যান্ড চিল ফুড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের এক সাবেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ছয়-সাত মাস ধরে বহু ব্যবসায়ী রফতানি করতে পারছেন না। তার ভাষ্য, সংগঠনের সদস্য ৩০০-এর বেশি। এদের প্রায় ৮৫ জনের চীনে কাঁকড়া ও কুচিয়া পাঠানোর অনুমোদন আছে। অথচ রফতানি করছেন মাত্র ১৫ থেকে ১৬ জন।
তিনি অভিযোগ করেন, সিন্ডিকেটের বাইরে যারা আছেন, তারা সবাই খারাপ অবস্থায় আছেন। বিভিন্ন জনকে আগের সরকারের দোসর ট্যাগ দিয়ে এই ব্যবসা থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। তার দাবি, সিন্ডিকেট এত শক্তিশালী যে বঞ্চিত ব্যবসায়ীরাও ভয়ে কথা বলছেন না।
নমুনা সংগ্রহের প্রক্রিয়া
ব্যবসায়ীদের মতে, রফতানির প্রথম ধাপ নমুনা অনুমোদন। মৎস্য অধিদফতরের পরিদর্শক নমুনা পরীক্ষা করে কোডিং করেন। এরপর অনুমোদন ও সনদের প্রক্রিয়া শেষে পণ্য পাঠানো হয়। সরকারি তথ্যে বলা আছে, চীনে মৎস্য ও মৎস্যপণ্য রফতানিতে পরিদর্শন, নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যকরত্ব সনদ প্রদানের নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে।
রিজু ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী উত্তম জানান, প্রতিটি নমুনার জন্য ৫০ হাজার টাকার পে-অর্ডার দিতে হয়। অর্থ খরচ ও সব প্রস্তুতির পরও নমুনা না নেয়া হলে ব্যবসায়ীরা শূন্য হাতে থাকেন বলে তার অভিযোগ।
উত্তম জানান, তার নিজস্ব লাইসেন্স আছে। স্বাভাবিক অবস্থায় মাসে পাঁচ টন পণ্য পাঠানোর সক্ষমতা থাকলেও এখন অন্যের লাইসেন্সে মাত্র ২০০-৩০০ কেজি পাঠাতে পারছেন বলে জানান।
এসএনআর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহীন জানান, তিনি অন্যের মাধ্যমে সামান্য পণ্য পাঠিয়ে ব্যবসা ধরে রেখেছেন। তিনি বলেন, অনেকেই পাঠাতে পারছেন না। সবার নমুনা নেয়া হচ্ছে না। ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, রফতানি বন্ধ থাকলেও গুদাম, কর্মচারী, পণ্য সংগ্রহ ও পরিবহনের খরচ চালিয়ে যেতে হয়। অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক নেতার ভাষ্য, যারা পণ্য পাঠাতে পারছেন না, তাদের দেউলিয়া হতে বেশি সময় লাগবে না। অনেকে ১৫-২০ বছর ধরে এ খাতে আছেন। অভিজ্ঞতা, বিনিয়োগ ও বাজার-যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা এখন বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, কাঁকড়া মূলত খুলনা, সাতক্ষীরা ও চট্টগ্রামের চকরিয়া থেকে সংগ্রহ করা হয়। কুচিয়া আসে রাজবাড়ী, নেত্রকোনা, সিলেট ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে।
তাদের দাবি, রফতানির প্রায় ৯৯ শতাংশই চীনে যায়। থাইল্যান্ড, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরেও কিছু চাহিদা আছে। একটি বাজারে এমন নির্ভরতা বড় সুযোগ হলেও ক্রেতা, মূল্য ও বাণিজ্যিক শর্তের ক্ষেত্রে ঝুঁকিও তৈরি করে। একজন ব্যবসায়ীর দাবি, যথাযথ সরকারি সহায়তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত হলে এই খাত থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
অভিযোগের বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু সাংবাদিকদের বলেন, মন্ত্রণালয় এ ধরনের অভিযোগ খতিয়ে দেখবে। তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ থাকলে আমরা তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেব। যারা এমন বাধার মুখে পড়ছেন, তারা সরাসরি আমার সাথে দেখা করুন। যাদের নমুনা নেয়া হচ্ছে না বা সনদ দেয়া হচ্ছে না, সেসব অভিযোগ আমি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








